মঙ্গলবার ২১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ৬ ডিসেম্বর, ২০২২ মঙ্গলবার

মৃণ্ময়ী রূপী চিন্ময়ী মায়ের আগমনী বার্তা

অনলাইন ডেস্ক : শরতের শিশিরভেজা ঘাসে অরুণরাঙা চরণ ফেলে জগৎ জননী, মাতৃশক্তি দেবী দুর্গার মর্তে আবাহনের প্রারম্ভই হলো মহালয়া। কাশফুলের দোলায় সবুজ ঘাসের ওপর শিউলি ফুলের গালিচায় চোখ পড়লেই ভেসে ওঠে জগৎ জননীর আগমনীর বার্তা। আর তাই প্রত্যেক সনাতন ধর্মাবলম্বীর কাছে ধ্যানমগ্না মৃণ্ময়ী মায়ের চিন্ময়ী রূপকে আরাধনার মধ্য দিয়ে এই তৃষিত পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রাণের নতুন স্পন্দন জেগে ওঠে মহালয়ার শুরুতেই।

প্রতিটি সনাতন বাঙালির মনে যেন এক চিরচেনা সুর গেয়ে ওঠে- ‘বিশ্ব আজিকে ধ্যানমগ্না উদ্ভাসিত আশা, তাপিত তৃষিত ধরায় জাগবে, প্রাণের নতুন ভাষা। মৃণ্ময়ী মা আবির্ভূতা অসুরবিনাশিনী।’ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের দরাজ কণ্ঠে চণ্ডিপাঠ, ঢাকের বাদ্য, শিউলিভেজা ভোরে মাতৃবন্দনায় আত্মনিয়োগকৃত মন আর বাংলার প্রকৃতি যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে এক শুভ আনন্দবার্তা চারদিকে ছড়িয়ে দেয় মহালয়ার ভোরে। মহালয়া মানেই যে মাতৃপক্ষের সূচনা। বাংলা ভাষার ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘মহালয়’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত উৎস মহৎ এবং আলয়। কিংবা মহত্ত্বের আলয়ও বলা যেতে পারে। সুতরাং এই মহতী আলোয় মৃণ্ময়ী মা দশভুজা অসুর বিনাশিনী, দুর্গতিনাশিনী দুর্গাকে এই মর্তে আহ্বানের শুভারম্ভ সূচনা হয় মহালয় থেকেই।

শাস্ত্রমতে, পিতৃপক্ষের শেষক্ষণ ও মাতৃপক্ষের সূচনাকালের সময়কেই মহালয়া বলা হয়। মহালয়া হলো পিতৃপক্ষ এবং দেবীপক্ষের মহাসন্ধিক্ষণ। মহালয়ার অর্থ হলো মহৎ আলোয় পিতৃপুরুষদের প্রতি ‘তর্পণ’ পূর্বক শ্রদ্ধা নিবেদন। সনাতন ধর্ম অনুযায়ী, এই দিনে প্রয়াত আত্মাদের মর্ত্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়, প্রয়াত আত্মার যে সমাবেশ হয় তাকেই মহালয়া বলা হয়ে থাকে। বিশ্বাস করা হয় যে, পিতৃপক্ষে শ্রাদ্ধ শান্তি ও তর্পণ করলে পূর্বপুরুষরা খুশি হন এবং আশীর্বাদ করেন। তাদের কৃপায় জীবনের অনেক বাধা দূর হয়। মহালয়ায় পূর্ণ তিথিতে পিতৃপক্ষের শেষে পিতৃপুরুষদের প্রতি তর্পণের মাধ্যমে তাদের সম্মান, সৌজন্য এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের দিন। শুধু নিজের বংশের নয়, অন্যদের প্রতিও এই দিনে তর্পণের দ্বারা শ্রদ্ধা, বিনম্রতা জানানো হয়, তিলাঞ্জলি অর্পণ করে এই প্রার্থনা করা হয়, ‘আমার পিতা এবং পিতৃপুরুষদের, আমার মাতা এবং মাতৃপুরুষদের, আর যারা আমার আত্মীয়-অনাত্মীয়, বন্ধু-অবন্ধু, যারা আমার জন্ম-জন্মান্তরের পূর্বজ, তাদের সবার প্রতি আমার বিনীত শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। সবাই শান্তি এবং মুক্তি লাভ করুক, এই প্রার্থনা করছি।’ আবার সনাতন ধর্মে কোনো শুভ অনুষ্ঠান শুরু করার পূর্বে তর্পণ প্রদানের মধ্য দিয়ে পূর্বপুরুষদের শ্রদ্ধা জানানোর রীতি প্রচলিত রয়েছে।

শাস্ত্রের নিয়মানুসারে, অকালে কোনো পূজা করলে ইস্ট দেবতা ও প্রয়াত পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তর্পণ করতে হয়। শ্রী রামচন্দ্র দেবী দুর্গার অকাল বোধন করেছিলেন। আর নিয়ম মেনে তাকেও পূজার আগে করতে হয়েছিল তর্পণ। কথিত আছে রামচন্দ্র মহালয়ার দিন পিতৃ তর্পণ করেছিলেন। আর সেই থেকেই শুরু হয় এই রীতির। মহাভারত অনুসারে স্বর্গে বসবাস করার সময় কর্ণের আত্মাকে খাবার হিসেবে শুধু সোনা ও রতœ দেয়া হয়। কারণ দাতা হিসেবে তিনি কখনো পিতৃপুরুষকে জল-খাবার দেননি, সবাইকে সোনা-রত দান করেছেন। আসলে কর্ণ প্রথমে তার পিতৃ পরিচয় জানতেন না। যুদ্ধের আগের রাতে কুন্তীর থেকে সে জানতে পারে সব সত্যি।

এরপরই ভুল সংশোধন করতে তর্পণের পরামর্শ আসে। পুরাণ অনুসারে, অসুরদের অত্যাচারে যখন দেবতারা অতিষ্ঠ, তখন ত্রিশক্তি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর নারীশক্তির সৃষ্টি করেন যিনি মহামায়ারূপী দেবী দুর্গা এবং তিনি সব অশুভ শক্তি তথা অসুর বিনাশ করেন। তাই বিশ্বাস করা হয় মহালয়ার শুভলগ্নে সব অশুভ শক্তির বিনাশ করে শুভশক্তির বিজয় শুরু হয়। পিতৃপক্ষের শেষ দেবীপক্ষে দেবী দুর্গা মহাশক্তি মহামায়া শ্রী আদি আদ্যাশক্তির কেন্দ্রীভূত চিৎ-শক্তির আরাধনা করা হয়। এই দেবী হলেন সত্ত্ব-রজো-তমো, এই ত্রিগুণের অধিষ্ঠাত্রী এবং ত্রিগুণাত্মিকা। তিনি ত্রিগুণে বিরাজিতা আবার ত্রিগুণাতীতা। তার বাহন সিংহ হলো রজোগুণের প্রতীক, অসুর হলো তমোগুণের প্রতীক। দেবী মহামায়ার নবরূপ নবপত্রিকার অধিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আরাধনা করা হয় নবদুর্গাকে, যিনি একইসঙ্গে পার্বতী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুশ্মাণ্ড, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী এবং সিদ্ধিদাত্রী। মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদ থেকে মহানবমী তিথি পর্যন্ত দেবী আরাধিতা হন এই নবরূপে। এই নবপত্রিকায় থাকে ধান, কচু, মানকচু, হলুদ, বেল, ডালিম, অশোক, জয়ন্তী (জয়ত্রী) এবং কলা। এই নয়টি গাছের পাতা দিয়ে তৈরি নারীমূর্তি তথা মাতৃরূপ। মহালয়ার দিন দেবী মায়ের চোখ আঁকা হয়। তার পর মহাষষ্ঠীতে হয় বোধন।

তাইতো দিকে দিকে শোনা যায়, ‘বাজলো তোমার আলোর বেনু, মাতলো রে ভুবন।’ প্রকৃতপক্ষে মাতৃশক্তির আরাধনার মাধ্যমে যুগে যুগে আমাদের সমাজে, সংসারে প্রতিটি নারীকে এক শ্রদ্ধার স্থানে প্রতিষ্ঠিত করার এক শিক্ষা সনাতন ধর্ম দান করে। সেই বোধের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মান থেকেই স্বামী বিবেকানন্দ শুরু করেছিলেন ‘কুমারীপূজা’। আসলে নিত্যদিনের সংসারে-সমাজে প্রতিটি নারীর মধ্যেই তো দেবী দশপ্রহরণধারিণী মা দুর্গা বিরাজিতা মা রূপে, ভগিনী রূপে, স্ত্রী রূপে, কন্যা রূপে, সহকারিণী রূপে। তাই মহালয়ার শুভলগ্নে এই ধরাধামেও মাতৃরূপী, কন্যারূপী, জায়ারূপী সব নারীর প্রতি অসম্মানের অবসান হোক। মহালয়ার এই সময় এই হোক আমাদের প্রত্যাশা। মহালয়ার পুণ্য প্রভাতে সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা। জগতের সব প্রাণীর মঙ্গল হোক, শুভ হোক, পুণ্য হোক।

লেখক : সুমনা গুপ্তা সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Categories: ধর্ম ও নৈতিকতা

Leave A Reply

Your email address will not be published.