মঙ্গলবার ২১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ৬ ডিসেম্বর, ২০২২ মঙ্গলবার

নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলে রবীন্দ্র-সংবর্ধনা-

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহুবারই নারায়ণগঞ্জ এসেছেন। নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়েই তাঁকে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে হয়েছে। কারণ এ বঙ্গে প্রবেশ করতে হলে নদীপথে গোয়ালন্দ থেকে নারাযনগঞ্জ এসে নারায়ণগঞ্জ থেকে রেল বা গাড়িতে করে অন্যান্য জায়গায় যেতে হতো। ১৮৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ-ময়মনসিংহ রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে এ রুটটিই বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নারাযণগঞ্জ হাই স্কুলে রবীন্দ্রনাথকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। সে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাসন দিয়েছিলেন রবীন্দ্র-জীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় ‘রবীন্দ্র বর্ষপঞ্জী’তে উল্লেখ করেছেন, ‘১৯২৬ সালে ৬৫ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ নারায়ণগঞ্জে এক ভাষণ দিয়েছিলেন।’ তখন কলকাতা থেকে ঢাকা যেতে প্রথমেই গোয়ালন্দ থেকে স্টীমারে নারায়ণগঞ্জ আসতে হতো। গোয়ালন্দ থেকে নারায়ণগঞ্জ জলপথের দূরত্ব ১০০ মাইল।

রবীন্দ্রনাথ বহুবার ঢাকায় এসেছেন এবং যতবারই ঢাকায় এসেছেন এ নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়েই গিয়েছেন। গোপাল চন্দ্র রায় ‘ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে উলে­খ করেছেন, ১৯২৬ সালে আগরতলা থেকে চাঁদপুর হয়ে স্টীমারে কবি নারায়ণগঞ্জে এসে পৌঁছান। তিনি লিখেছেন, ‘২৭ শে ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা নাগাদ তিনি নারায়ণগঞ্জ এসে পৌঁছান, স্থানীয় ছাত্র সংস্থা স্টীমার ঘাটে কবিকে এবং তাঁর দলের সকলকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। ছাত্ররা এখান থেকে শোভাযাত্রাসহ পরে কবিকে নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলে নিয়ে যান। সেখানে ঐ স্কুল প্রাঙ্গণে এক সভায় কবিকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।’ বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ভূইয়া ইকবাল—এর ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্র সংবর্ধনা’তে কবিকে নারায়ণগঞ্জের সংবর্ধনাতে প্রদানকৃত মানপত্রটি পূর্ণাঙ্গ তুলে ধরা হয়। এ সংবর্ধনাপত্রটি ছিল নিম্নরূপ:‘বিশ্ববরেণ্য কবিসম্রাট শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রাথ ঠাকুর মহাশয়ের শ্রীশ্রীচরণকমলেষু। দেব, পূব্বর্বঙ্গের তোরণ-দ্বারে-পুণ্যসলিলা শীতলক্ষ্যার পবিত্র তীরে- হে কবি! তোমাকে তোমার প্রত্যাবত্তর্ন-পথে স্বাগতম অভিনন্দন এর সুযোগ পাইয়া আমরা আপনাদিগকে কৃতার্থ মনে করিতেছি। ছাত্র আমরা- তোমার শিষ্যানুশিষ্যের যোগ্য নহি! তোমার চরণ-রেণু স্পর্শ করিবার অধিকার লাভের স্পর্দ্ধাও আমাদের নাই- কিন্তু সব্বর্জনপ্রিয় তুমি- দয়া করিয়া আমাদের ছাত্রসঙ্ঘের ন্যায় দীনতম-ক্ষুদ্রতম প্রতিষ্ঠানের কথাও বিস্মৃত হও নাই- সে আনন্দে সে-গব্বের্ আমরা স্নেহ-পুলকিত-হৃদয়ে আমাদের দীন আয়োজন- আমাদের বন-ফুলমালা তোমার শ্রীচরণসরোজে অর্পণ করিতে সাহসী হইয়াছি। হে কবি! তুমি তাহা গ্রহণ করিয়া সার্থক কর- কৃতার্থ কর- আমাদিগকে ধন্য কর।

আমাদের এ বাংলাদেশ- দেশে দেশে শুধু অন্নই বিতরণ করে না- দেশকে সুজলা সুফলা ও শস্যশ্যামলা করিয়াই শুধু নদীর শুভ্র-রজতধারা তাহার গতিপথে অগ্রসর হয় না- তাহার কল প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানের পবিত্র আলোকধারাও লহরে লহরে দিগ্দিগন্তে ব্যাপ্ত করিয়া দিয়া আপনাকে মহিমান্বিত করিয়াছে- সে লুপ্তধারা- ধূজ্জর্টির জটানিষ্যন্দী পবিত্রধারার ন্যায় তুমিই আবার বিশ্বভারতীর শান্তিনিকেতন হইতে প্রবাহিত করিয়া সমস্ত বিশ্ববাসীকে ভারতের বাণী নূতন করিয়া প্রচার করিতেছ। নালন্দা নাই- তক্ষশীলা নাই- বিক্রম শীলা নাই! তাহাতে দুঃখ কি? তোমার বিশ্ব-ভারতী- অতীত ও বত্তর্মানকে জাগ্রত করিয়াছে। আমরা তোমার সেই আদর্শ হৃদয়ে গ্রহণ করিয়া- লক্ষ্য পথে চলিতে পারি- আমাদিগকে সে আশীর্বাদ কর। পল্লীর লুপ্তগৌরব প্রতিষ্ঠা- দেশকে অন্তরের সহিত ভালোবাসার- শিক্ষার প্রদীপ হাতে করিয়া কেমন করিয়া আমরা মানুষ হইব? কেমন করিয়া প্রকৃত জ্ঞানের সন্ধান পাইব? কথায় নহে কাজে- শুধু নয় দীক্ষায়- প্রকৃত কর্মী রূপে দীনভাবে ও দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করিতে পারি- তোমার চরণে উপদেশ-ভিক্ষু আমরা সে আবেদন নিবেদন করিতেছি। আমাদের এই নারায়ণগঞ্জ-বন্দর অতি প্রাচীন বন্দর- অতি প্রাচীন ইতিহাসেও ইহার নাম আছে। দুর্ভাগ্য আমাদের এখানে বাণীর সেবক নাই বলিলেও চলে। এখানকার নীরস শুষ্ক মরুভূমির বুকে কোনদিন বর্ষণ নামে নাই- এই ঊষর মরুভূমিকে সরস করে নাই, সৌভাগ্য আমাদের আজ এই মরুভূমির বুকে সুধাধারা সিঞ্চিত হইবে- নব বসন্তের আবির্ভাব হইবে নব রূপে- নব ভাবে- নব পিককুহরণে- এই বসন্তোদয় চির বসন্তের উজ্জ্বল শ্যামল শ্রীতে মণ্ডিত হউক- এই আশীর্বাদ ভিক্ষা করিয়া তোমাকে অর্ঘ্যডালা সমর্পণ করিতেছি। এই দীর্ঘ নগরের পৌরগণের গব্বর্ করিবার অতীত ইতিহাস আছে,- ঐ দূরে- লক্ষ্যার তীরে- সোনাকান্দার দুর্গ এখনও বাঁচিয়া আছে। সুবর্ণগ্রামের শত প্রাচীন কীত্তির্- সেন পাল ও পাঠান-মোগলের রণ-ভেরী শব্দিত কানন-প্রান্তর ও মগ-বাঙ্গাীর রণ কোলাহল- এখনও এই ভূমির আকাশে বাতাসে শব্দায়মান- সে কাহিনী আমাদিগকে অতীত গব্বের্ গৌরবান্বিত করে- সেই অতীত কীত্তির্গরিমামণ্ডিত- শত শত পণ্ডিতের পাণ্ডিত্যে-ভূষিত দেশ আজ শুরু স্মৃতির কঙ্কাল লইয়া বাঁচিয়া আছে- তোমার পাদস্পর্শে আবার তাহা নবজীবন লাভ করিয়াছে।

কবি তুমি! ঋষি তুমি! বাঙ্গালীর হৃদয়াসনে সুপ্রতিষ্ঠিত উজ্জ্বল রবি তুমি কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাইয়া তোমাকে বলিতেছি- ‘জগৎ কবি-সভার মাঝে তোমার করি গব্বর্ / বাঙ্গালী আজি গানের রাজা বাঙ্গালী নহে খব্বর্।’প্রণতঃ ছাত্রসঙ্ঘের সভ্যবৃন্দ।নারায়ণগঞ্জ ১৫/১১/৩২ বঙ্গাব্দনারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলের ছাত্ররাই এ সংবর্ধনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তখন অমৃতবাজার পত্রিকায় হাই স্কুলের এ সংবর্ধনা সভার সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকা তখন লিখে যে, ছাত্রদের পক্ষ থেকে কামাখ্যা চরণ সেন কবিকে স্বাগত জানিয়ে এক অভিনন্দনপত্র পাঠ করেন এবং অভিনন্দন এর উত্তরে কবি নিজের ছাত্রজীবনের কথা উল্লে­খ করেন। পত্রিকাটি আরও লিখে, ‘কবি বলেন, লোকে চাকরি পাওয়ার জন্য নিজেকে শিক্ষিত করতে স্কুল-কলেজে পড়তে যায়। কিন্তু বর্তমানে চাকরির দরজা বন্ধ হওয়ায় শিক্ষিত লোকেরা স্বাধীন জীবিকার দিকে ঝুঁকছে। তিনি আরও বলেন- রাজনীতির ক্ষেত্রেও কাজ কর্মে এক পরিবর্তন এসেছে। এমন একটি সময় ছিল, যখন লোকে ভাবতেন বক্তৃতা দিয়েই তাঁরা তাঁদের কাজ উদ্ধার করতে সক্ষম হবেন। তাঁরা পুরাতন অভ্যাসবশতঃ এখনও ঐরূপ কাজ করে বসেন। কিন্তু বর্তমানে যুবসমাজ বাস্তব ও আসল কাজের দিকে তাকায়। বর্তমান আন্দোলন কালে যে উদ্দীপনা এসেছে, তাকে যেন তারা স্থায়ী করে। কবি বলেন- শান্তিনিকেতনে পূর্ববঙ্গের বহু ছেলে পড়ে। তাদরে মধ্যে চরিত্রের দৃঢ়তা, একাগ্রতা ও শ্রদ্ধার ভাব দেখেছি। আমি পূর্ববঙ্গ ভ্রমণ করে দেখলাম, এটা একটা ভাল কমীর্ সংগ্রহের স্থান। এখানকার ছেলেদের যে কাজেই লাগানো যাবে, তারা তাদের একাগ্রতা ও নিষ্ঠার দ্বারা কৃতকার্য হবেই। আমি যদি এখনও যুবক থাকতাম, তাহলে এখানে বক্তৃতা না করে হাত-নাতে কাজে লেগে যেতাম। এখানকার উর্বরা মাটির মতই এখানকার মানুষের উদ্যম আগ্রহও প্রবল। কিন্তু আজ আমার বয়স এবং স্বাস্থ্য দুই-ই নেই। আমার কর্মক্ষেত্র পশ্চিমবাংলার এক সীমান্তে অবস্থিত। সেখানকার মাটি উর্বরা নয় এবং মানুষও অনেকটা উদাসীন। পূর্ববঙ্গের এ অঞ্চলে উপযুক্ত পরিবেশে লোকে যদি তাদের কাজ আরম্ভ করে তাহলে তারা অতি সহজেই সফলকাম হবে। রাজনৈতিক নেতারা গ্রাম থেকে দূর শহরে শহরে খুব ভাল বক্তৃতা দিয়ে থাকে।

এই উপায়ে গ্রামের কোন উপকার করাই সম্ভব নয়। পূর্ববঙ্গে পল্লী উন্নয়ন নিঃসন্দেহে সম্ভবপর। এই প্রসঙ্গে কুমিল্লায় অভয় আশ্রমের কথা আমার মনে পড়ে। ঐ আশ্রমের কমীর্রা স্বার্থত্যাগের মধ্য দিয়ে যে কাজ করে চলেছেন, তা দেখে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছি। তাঁরা খুবই সাহস দেখিয়ে নিম্নবর্ণের মানুষদের নিজেদের মধ্যে নিয়েছেন। আমি এটা ক্বচিৎ কোথাও দেখেছি। নিম্নবর্ণের লোকদের সঙ্গে আমাদের মেলামেশার অভাব, সেটা আমাদের ঐক্যের পথে একটা বড় অন্তরায়। এটা দূর করতে না পারলে দেশের মুক্তি অসম্ভব। আমরা আমাদের মধ্যে এই বিভেদ সৃষ্টি করে দেশকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছি। অভয় আশ্রমে অস্পৃশ্যদের মধ্যে যে আত্মসম্মানবোধ দেখলাম, তা সত্যই প্রশংসার যোগ্য। সাহসের সঙ্গে গ্রামবাসীদের পল­ী সংস্কারের কাজ করে যাওয়া উচিৎ। তাহলেই দেশের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। পূর্ববঙ্গে প্রকৃতি যেমন সৌন্দর্যে ও প্রাচুর্যে নিজেকে বিকশিত করেছে, এখানকার লোকদের মধ্যেও দেখেছি তেমন প্রাণ-প্রাচুর্য ও প্রাণের উদারতা। পূর্ববঙ্গের যুবকরা যদি তাদের এ অঞ্চলে গ্রামীণ কাজ আরম্ভ করে, তাহলে তারা নিশ্চয়ই সফলকাম হবে। উপসংহারে আমি ছাত্রদের আশীর্বাদ জানিয়ে বলব- তারা তাদের ত্যাগ ও নিষ্ঠার দ্বারা কাজ করলে শুধু বাংলাকেই নয়, সারা ভারতকেও আসল পথের সন্ধান দেবে।

’পূর্ববঙ্গের প্রকৃতির সৌন্দর্য ও প্রাচুর্য এবং এর মানুষের প্রাণ-প্রাচুর্য ও প্রাণের উদারতা মুগ্ধ করেছিলো রবীন্দ্রনাথকে। তিনি আক্ষেপ করেছিলেন পশ্চিমবাংলার অনুর্বর ভূমি ও মানুষের উদাসীনতায়। গর্ব বোধ করেছিলেন এ বঙ্গের অস্পৃশ্যদের আত্মসম্মানবোধ আর অভয়আশ্রমের মতো প্রতিষ্ঠানের কর্ম তৎপরতায়। কিন্তু আজ? কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে সেই অভয়আশ্রম, আত্মসম্মানবোধ, প্রাণ-প্রাচুর্য? রবীন্দ্রনাথ স্বপ্ন দেখতেন। নির্মম বাস্তবতায় তাঁর অন্তিম সময়ে ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায় তাঁর স্বপ্ন। তিনি হতাশ হয়েছেন, ক্রুব্ধ হয়েছেন আবার সে ভাঙ্গা টুকরোগুলো জোড়া দিয়েছেন- ‘আজ পারের দিকে যাত্রা করেছি- পিছনের মাঠে কী দেখে এলুম, কী রেখে এলুম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিতকর উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ। কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষপর্যন্ত রক্ষা করবো। আশা করবো মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে।’ আমরাও তা-ই চাই। ক্রমাগত আমরা যাচ্ছি অস্তাচলের দিকে, তবুও আমাদের চোখ আজ পূর্বাচলের দিকেই। সূর্যের রক্তিম আলোর ছটা আমাদের চোখে লাগুক, প্রাণে লাগুক।

লেখক : রফিউর রাব্বির ফেসবুক থেকে নেওয়া

Categories: blog

Leave A Reply

Your email address will not be published.