সোমবার ৭ আষাঢ়, ১৪২৮ ২১ জুন, ২০২১ সোমবার

‘শহিদ’ জিয়ার অসমাপ্ত কাজ কি আওয়ামী লীগ সমাপ্ত করবে?

অনলাইন ডেস্ক:-  ব্যঙ্গমা চক্ষু মুদিয়া কহিল, ‘ব্যঙ্গমী, এ মধ্যরাতে তুমি এখনো ঘুমাও নাই, ব্যাপার কী?’ ব্যঙ্গমী কহিল, ‘কাহারা যেন গাছের পর গাছ কাটিতেছে, মনে হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বৃক্ষশূন্য করিয়া ফেলিবে। আমার ভয় হয়, ওরা যদি আমাদের গাছটিও কাটে, তাহা হইলে আমরা যাইব কোথায়? আর গাছ কাটার কী বিকট শব্দ! যেন গাছ নয়, ওরা মানুষ খুন করিতেছে। তুমি কি শুনিতে পাওনা, আমি গাছগুলোর কান্নার শব্দ পাইতেছি।’ ব্যঙ্গমা ডানার মধ্যে মুখ গুঁজিয়া বলিল, ‘ওরা গাছ কাটিতেছে বঙ্গবন্ধু যে দিকটায় সভা মঞ্চে দাঁড়াইয়া তার ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়াছিলেন, দেশ স্বাধীন হইলে ইন্দিরা গান্ধী যে স্থানের কাছাকাছি ইন্দিরা মঞ্চে দাঁড়াইয়া ভাষণ দিয়াছিলেন, সেই দিকটা আমাদের দিকে নয়, আমরা কিছুদিন নিরাপদ আছি।’

ব্যঙ্গমা একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিল, বলিল, ‘আমাদের এ বটগাছটার বয়স শুনিয়াছি দেড়শ’ বছর। আমরাই তো এ গাছে আছি পঞ্চাশ বছর হইয়া গেল। এ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নাম ছিল রেসকোর্স। কত ঘোড়দৌড়ের খেলা আমরা দেখিয়াছি। জিন্না হইতে শেখ মুজিব কত নেতার বক্তৃতা শুনিয়াছি। এমন উদ্যানটার কারা সর্বনাশ করিতেছে বলিতে পার? কলকাতায় গড়ের মাঠের এমন সর্বনাশও তো কেহ করেনি।’

ব্যঙ্গমার ঘুম পাইতে লাগিল, হাই তুলিয়া বলিল, ‘শুনিয়াছি আওয়ামী লীগ সরকারের লোকদের হুকুমেই এ গাছ কাটা হইতেছে।’ ব্যঙ্গমী তার শেষ প্রশ্নটি ঝাড়িল-‘এ গাছ কাটার উদ্দেশ্য কী?’ ব্যঙ্গমার চোখ ঘুমে ঢুলিতেছিল, ‘সে বলিল, এটাও আমার শোনা কথা, ‘শহিদ’ জিয়াউর রহমানের অসমাপ্ত কাজ আওয়ামী লীগ সমাপ্ত করিতে চাহিতেছে।’ বলিয়া ব্যঙ্গমা ঘুমে ঢলিয়া পড়িল। ব্যঙ্গমী আর কথা বাড়াইল না।

আমার কথা

খবরটা আমার কাছে বিস্ময়কর। বিলাতে বাস করি। এখানে সরকারের অনুমোদন ছাড়া নিজের বাগানের গাছও কাটা যায় না। সেখানে আমার দেশে রমনা গ্রিন বলতে যা বোঝায়, যে সবুজ রমনা দেখার জন্য এক সময় বিদেশি পর্যটকরা ভিড় করতেন, সেই সবুজ রমনাকে হত্যা করতে বসেছে আওয়ামী লীগ সরকারের গণপূর্ত বিভাগ? ইতোমধ্যেই শতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, যার অনেকগুলোর বয়স ৫০ বছরের বেশি। ঢাকা শহরের শ্বাস ফেলার একমাত্র কেন্দ্র রমনা গ্রিন। খোলা আকাশের নিচে শত শত বৃক্ষশোভিত এ স্থানটির রয়েছে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এখানকার হাজার বছরের প্রাচীন কালিমন্দিরের (’৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদাররা ভেঙে ফেলেছে) চত্বরে অনুশীলন ও যুগান্তর পার্টির সদস্যরা নিজেদের আঙুল কেটে শপথপত্রে সেই রক্ত দিয়ে সই করত-যে শপথ ছিল ইংরেজ রাজত্ব উচ্ছেদের। এখানে পাকিস্তান হওয়ার পর মোহাম্মদ আলী জিন্না ভাষণ দিয়েছেন। ১৯৭১ সালে এ উদ্যানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই ইন্দিরা মঞ্চ স্থাপিত হয়েছিল। সেই মঞ্চ থেকে ভাষণ দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী।

এই উদ্যানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও কম নয়। এখানে শিল্পমেলা, বইমেলা, লোকসংগীতের আসর বহু কিছু বসেছে। নতুন চিত্রশিল্পীদের ছবি আঁকার এবং ছবি প্রদর্শনীরও স্থান এটি। কংক্রিটের তৈরি সুউচ্চ ভবনে ভর্তি শহরের মানুষের শরৎ, বসন্তে শ্বাস ফেলার একমাত্র জায়গা সবুজ রমনা। খেলাধুলার মাঠও রয়েছে এখানে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখানেই স্বাধীনতার স্তম্ভ, জাদুঘর ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এ রমনা গ্রিনকেও হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন হত্যাকারীদের মুরব্বি জিয়াউর রহমান। তার হুকুমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ বৃহত্তর রমনায় গাছ কাটা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ভবন ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে, আরও স্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে বর্তমানে ভাষা শহিদ মিনারের সামনে কৃষ্ণচূড়ার যে বড় বড় গাছগুলো ছিল তা জিয়ার আদেশে কেটে ফেলা হয়। প্রতি ফাল্গুন মাসে ভাষা শহিদদের স্মরণে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের সময় এই কৃষ্ণচূড়া গাছে থোকা থোকা লাল কৃষ্ণচূড়া ফুল ফুটত। সারা আকাশ-বাতাস রক্তিম আভায় ভরে যেত। মনে হতো ভাষা শহিদদের রক্তের আভাই বুঝি ফুটে উঠেছে আকাশে-বাতাসে।

এই গাছগুলো কেটেই জিয়াউর রহমান ক্ষান্ত হননি। তিনি হাত বাড়িয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে। হয়তো তার ইচ্ছা ছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণদানের স্থানটিসহ রমনা গ্রিনে স্বাধীনতা যুদ্ধের কোনো স্মৃতিস্তম্ভ, বঙ্গবন্ধুর কোনো স্টাচু যাতে স্থাপিত হতে না পারে সেজন্য তড়িঘড়ি একটি শিশু উদ্যান প্রতিষ্ঠা করে ফেলা। জিয়াউর রহমানের এ মহতী উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কারণ, তার পরিকল্পনা সফল হওয়ার আগেই চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে তিনি ‘শহিদ’ হয়ে যান। ভাগ্যের পরিহাস এই যে, রমনা গ্রিনে তিনি যে এ বৃক্ষ কর্তন শুরু করেছিলেন, তার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছিলেন তাকে হত্যা করার জন্য একটি সন্ত্রাসী দল তৎপর রয়েছে। তার ওপর হামলা চালানোর জন্য তারা বড় বড় গাছের আড়ালে আত্মগোপন করে থাকবে। এ অজুহাতে তিনি ঢাকার গাছ কাটলেন বটে, কিন্তু আততায়ীরা তাকে হত্যা করল চট্টগ্রামে।

আমার সুধী পাঠকরা এখন ব্যঙ্গমীর প্রশ্নের জবাবে ব্যঙ্গমা কী বলেছে তা স্মরণ করুন। রমনা গ্রিনে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবার গাছ কাটা শুরু হওয়ায় ব্যঙ্গমা ভেবেছে ‘শহিদ জিয়ার’ গাছ কাটার অসমাপ্ত কাজটি সমাপ্ত করার দায়িত্বই বুঝি আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করেছে। জিয়াউর রহমানের আমলে এ গাছ কাটার প্রতিবাদ কেউ করতে সাহসী হয়নি। তখন সামরিক শাসন চলছে। কঠোর সামরিক শাসন। কারফিউ জারি রেখে দেশ শাসন চলছে। বঙ্গবন্ধু, তার পরিবার ও জাতীয় নেতাদের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের কার্যকলাপের প্রতিবাদ জানানোর সাহস কেউ অর্জন করেনি।

কিন্তু এখন শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিক শাসনামলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছ কাটার হিড়িক দেখে দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, স্থপতি, প্রকৌশলী, পরিবেশবাদী, নগর পরিকল্পক সবাই প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ মানববন্ধন করছে বৃক্ষ কর্তনের প্রতিবাদে। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। আমার ধারণা, প্রধানমন্ত্রীর নজরে বিষয়টি গেলে এর সহজ প্রতিকারের উপায় বেরিয়ে আসবে। প্রথমেই রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করার চেয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডেপুটেশন পাঠানো ভালো। আমলাদের চক্করে রাজধানীর একটি ঐতিহাসিক ও একমাত্র বিনোদনমূলক স্থান যদি সৌন্দর্য ও গুরুত্ব হারায়, তার চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কিছু থাকবে না।

রমনা গ্রিন তৈরি হয়েছিল ইংরেজ শাসনামলে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর আসাম ও পূর্ববঙ্গ মিলিয়ে ইংরেজরা একটি প্রদেশ গঠনের প্লান করেছিল, যার রাজধানী হবে ঢাকা। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই রমনায় নতুন ঢাকা গড়ে তোলা হয়েছিল। নতুন নতুন ভবন তৈরি করা হয়েছিল। সবুজ গাছগাছালি দ্বারা রমনার মাঠ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ঢাকার নবাবদের বাগানবাড়ি হিসাবে মতিঝিল, দিলকুশা ইত্যাদি এলাকা তো ছিলই।

রমনায় স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ, জাদুঘর তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার আরও বিরাট স্মৃতিস্তম্ভ, জাদুঘর কমপ্লেক্স তৈরির বৃহত্তর পরিকল্পনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এ উন্নয়ন পরিকল্পনায় আমলাদের দাপটে শিল্পী হাশেম খান, স্থপতি রবিউল হাসান, ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুন উন্নয়ন কমিটি থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন। এখনো তারা কমিটিতে ফিরে আসেননি।

সম্ভবত এরই সুযোগ গ্রহণ করেছে গণপূর্ত বিভাগের আমলারা। তারা স্থানটির সৌন্দর্যবর্ধনের নামে গাছ কেটে ফেলতে চান এবং সেখানে ফুডকোর্ট তৈরি করতে চান। প্রথম কথা, ঢাকা শহরে আরও রেস্টুরেন্টের কি দরকার আছে? যদি থাকে, তাহলে ঐতিহাসিক স্থান, নগরবাসীর বিনোদনের স্থানের নাক কেটে কি তা স্থাপন করতে হবে? এ তুঘলকি পরিকল্পনা বাতিলের জন্য নোঙর বাংলাদেশ, স্বাধীনতা উদ্যান সাংস্কৃতিক জোট এবং গ্রিন প্লানেট ইত্যাদি সংগঠন দাবি জানিয়েছে। দাবি না মানলে আন্দোলন। আমি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ অবিলম্বে কামনা করি।

বিষেরবাঁশী.কম / ডেস্ক / রূপা

Categories: রাজনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.