মঙ্গলবার ২১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ৬ ডিসেম্বর, ২০২২ মঙ্গলবার

তৃতীয় ফোনে ফিরে যান আহমদ শফী

অনলাইন ডেস্ক :–আজ ৫ মে। রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে বহুল আলোচিত অপারেশন শাপলার ৮ বছর। এই দিনে হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবি আদায়ে ঢাকা অবরোধ করে। অবরোধকালে হঠাৎ সংগঠনটি মতিঝিল শাপলা চত্বরে সমাবেশের ঘোষণা দেয়। পরে টানা অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হয়। শাপলা চত্বর থেকে হেফাজত কর্মীদের হটিয়ে দিতে ৫ মে মধ্যরাতে র‌্যাব-পুুলিশ ও বিজিবির যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। যে অভিযান নিয়ে সে সময় দেশে-বিদেশে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। অভিযানে হতাহতের সংখ্যা নিয়েও বিতর্ক চলে।

কেন সেই রাতে মতিঝিল শাপলা চত্বরে সরকারকে অভিযান চালাতে হয়েছিল? কেন হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন আমির শাহ আহমদ শফী কথা দিয়েও সমাবেশস্থলে শেষ পর্যন্ত আসেননি? কেন তিনি শাপলা চত্বরে আসার পথে পলাশী মোড় থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে আবার লালবাগ মাদ্রাসায় ফিরে গিয়েছিলেন- এসব প্রশ্ন এখনো অনেকের মনে ঘুরপাক খায়।

র‌্যাব-পুলিশের কর্মকর্তারা বলেছেন, ৫ মে দিনগত মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে শাপলা চত্বরে অবস্থানকারী হেফাজত নেতাকর্মীদের না হটানো হলে পরের দিন সকালেই দেশের পটপরিবর্তন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। কারণ হেফাজতকে সামনে রেখে তৃতীয় পক্ষ শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকার উৎখাতের ছক কষে ।

যে কারণে সরকার পরের দিন সকাল পর্যন্ত আর অপেক্ষা না করে রাতে অভিযানের মধ্য দিয়ে নিজেদের ঝুঁকিমুক্ত করে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নারীনীতি বাতিলসহ ১৩ দফা দাবি আদায়ে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করলে তোলপাড় শুরু হয় সরকারে। হেফাজতের সঙ্গে সমঝোতার জোর চেষ্টা করে সরকার। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলোচনার জন্য চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে প্রতিনিধি পাঠান। কিন্তু সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় না এসে ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে অনড় থাকে হেফাজতে ইসলাম। ৫ মে সকালে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিকালেই হঠাৎ সংগঠনটি মতিঝিল শাপলা চত্বরে সমাবেশের ঘোষণা দেয়। একপর্যায়ে সরকার সন্ধ্যার আগেই সমাবেশ শেষ করার শর্তে মৌখিক অনুমতি দেয়। শুরু হয় সমাবেশ। একদিকে চলে সমাবেশ, আরেকদিকে পুলিশের সঙ্গে চলতে থাকে হেফাজতকর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ। হেফাজতের ব্যানারে পুলিশের সঙ্গে এই সংঘর্ষে লিপ্ত হয় জামায়াত-শিবির ক্যাডাররাও। হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর বিকালে সমাবেশমঞ্চে উঠে দোয়ার মধ্য দিয়ে সমাবেশ শেষ করার কথা ছিল। সে অনুযায়ী মঞ্চ থেকে ঘোষণাও করা হচ্ছিল। কিন্তু সন্ধ্যার পরও তিনি সমাবেশস্থলে না আসায় সরকারের উদ্বেগ বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় আহমদ শফীকে সমাবেশস্থলে আনতে গাড়ি ও পুুলিশ পাঠানো হয় লালবাগ মাদ্রাসায়। যথারীতি তিনি গাড়িতে ওঠেনও। তার গাড়িতে ছিলেন মাওলানা আনাস মাদানী, পুলিশের এসবির তৎকালীন ডিআইজি (রাজনৈতিক) মো. মাহবুব হোসেন ও আরেকজন হেফাজত নেতা। কিন্তু পথে একটি ফোন পেয়ে পলাশী থেকেই ফিরে যান আহমদ শফী। এতে সরকারের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। এর পর আর হেফাজতে ইসলামের আমির আহমদ শফীকে সমাবেশস্থলে আনতে পারেনি সরকার।

জানতে চাইলে এসবির তৎকালীন ডিআইজি (রাজনৈতিক) ও বর্তমানে অতিরিক্ত আইজি মো. মাহবুব হোসেন বলেছেন, হেফাজত আমির শাপলা চত্বরে আসার উদ্দেশে ৫ মে সন্ধ্যায় লালবাগ মাদ্রাসা থেকে একটি গাড়িতে বের হন। তখন ওই গাড়িতে তিনিও ছিলেন। গাড়িতে ওঠার কিছুক্ষণ পর শাহ আহমদ শফীর কাছে একটি ফোন আসে। কিছুদূর যাওয়ার পর আরেকটি ফোন আসে। তৃতীয় ফোনটি আসার পরই হেফাজত আমির চালককে লালবাগ মাদ্রাসার দিকে ফিরে যেতে বলেন। তৃতীয় ফোনটি কে করেছিলেন, অপর প্রান্ত থেকে কী বলা হয়েছিল তা জানা যায়নি।

মাহবুব হোসেন আরও বলেন, ‘গাড়িতে বসেই শফী হুজুরকে শাপলা চত্বরে যেতে অনুরোধ জানানো হয়। না গেলে ভবিষ্যতে কী পরিণতি হতে পারে- এ ব্যাপারেও তাকে বোঝানো হয়। কিন্তু হেফাজত আমির কোনো কথা না শুনে তিনি লালবাগ মাদ্রাসায় ফিরে যান। হেফাজতকর্মীরা অবস্থান করতে থাকেন শাপলা চত্বরে।’

এদিকে শাপলা চত্বরের সমাবেশ থেকে সেখানে লাগাতার অবস্থানের ঘোষণা দেন ১৮ দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হেফাজত নেতা মুফতি ফয়জুল্লাহসহ অন্যরা। এর পরই সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে শাপলা চত্বরে যৌথ অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী অভিযানের ছক তৈরি করে। পরে মধ্যরাতে অভিযানের মাধ্যমে শাপলা চত্বর হেফাজতমুক্ত করা হয়।

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের তা-বের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন অ্যাডভোকেট শামসুল হক। তিনি আমাদের সময়কে বলেছেন, মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ এবং ওইদিন সন্ধ্যার পরও তাদের সেখানে অবস্থানের পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র ছিল। তারা চেয়েছিল সরকারকে টেনেহিঁচড়ে ক্ষমতা থেকে নামাতে। আর এ জন্য খালেদা জিয়া হেফাজতকে গরু দিয়েছিলেন, বাছুর দিয়েছিলেন। অর্থ দিয়েছিলেন। বিএনপির কর্মীদের মাঠে নামতে বলেছিলেন। ওইদিন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের আড়ালে বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা বায়তুল মোকাররম, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, পল্টন ও মতিঝিলে অগ্নি-সন্ত্রাস চালায়। এ প্রেক্ষাপটে মানুষের জানমাল রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় মধ্যরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, তৎকালীন ১৮-দলীয় জোটের যে দলগুলো হেফাজতে রয়েছে, তাদের পরামর্শ ও চাপে টানা অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেয় হেফাজতে ইসলাম। এই অবস্থান লাগাতার করার মধ্য দিয়ে তৃতীয় একটি পক্ষ চেয়েছিল সরকারকে সরিয়ে দিতে। হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী এ ব্যাপারে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বৃত্তান্ত বলেছেন। হেফাজতের সমাবেশের আড়ালে বাংলাদেশ ব্যাংক লুট ও সচিবালয়ে হামলারও নকশা ছিল।

বিষের বাঁশী/ডেস্ক /ব্রিজ

Categories: blog

Leave A Reply

Your email address will not be published.