বৃহস্পতিবার ১৯ ফাল্গুন, ১৪২৭ ৪ মার্চ, ২০২১ বৃহস্পতিবার

একজন বস্ত্র প্রকৌশলীর বস্ত্রশিল্পের বাদশা হয়ে উঠার গল্প

।।সুভাষ সাহা।। শিক্ষক বাবার অসমাপ্ত গল্পকে পূর্ণতা দেয়ার সংকল্প থেকেই আহসানউল্লাহ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে পড়াশোনা শেষ করেই কর্মজীবনে পা রাখেন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার মোঃ শামসুজ্জামান নাসিম।

স্বপ্নের কোন দূরত্ব নেই। সীমানাও নেই। বাবা স্বপ্নের যে বিজ বপন করে গেছেন, যোগ্য উত্তরাধিকারের হাত ধরেই ডালপালা মেলে তা আজ বটবৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বপ্নবাজ শিল্পোদ্যোক্তা সিআইপি প্রকৌশলী শামসুজ্জামান নাসিম এ প্রতিবেদককে বলেন,’স্কুল শিক্ষক বাবা মরহুম মাওলানা মোঃ লুৎফর রহমান আমার আইডল। মৌলিক শিক্ষা-দীক্ষা পথচলার দিশা পাই আমার বাবার কাছ থেকে। সততা,শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা শিখেছি তাঁরই কাছে। কাছে থেকে দেখেছি বাবার সংগ্রামী জীবনের নানা ধাপ-বাঁক।বাবা যে বিজটি রোপন করে গেছেন আমি তা পরিচর্যা বটবৃক্ষে পরিণত করেছি। এ কৃতিত্ব আমার নয়,বাবার।’

কর্মবীর মোঃনাসিম আরো জানান, ছয় ভাইবোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়।আমার জীবনের কিছু মিরাকল ঘটনা বলে রাখি। বাবা এবং আমার জন্মতারিখ একই ৫ ই সেপ্টেম্বর।আমার বাবা এবং আমার বয়সের পার্থক্য ৩২ বছর। অন্যদিকে আমার এবং আমার বড় ছেলে শরিফ হাসানের বয়সের পার্থক্য ৩৩। পরের গল্পটা আরো রোমাঞ্চকর! এ্যাডভেঞ্চারে ভরপুর।বাবা শিখিয়েছেন,সাফল্য পেতে হলে কিছুটা ঝুঁকি নিতেই হয়। তবে,লক্ষ্যহীন নয়। লক্ষ্য ঠিক থাকলে সাফল্য ধরা দেয় অনন্য দৃষ্টান্ত শামসুজ্জামান নাসিম।

বাবা পঞ্চাশের দশকে প্রথমে ভৈরবের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। সংসারের টানাপোড়েন অবসানকল্পে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের শাহ্তলি গ্রামে একটি হ্যান্ডলুম ফ্যাক্টরী করার কথা ভাবেন। সংগ্রামের নতুন অধ্যায়;

১৯৫৮ থেকে ১৯৬০ সাল নাগাদ ১২টি হ্যান্ডলুম বিশিষ্ট ” শামীম হ্যান্ডলুম ফ্যাক্টরী ” নামে একটি উন্নতমানের লুঙ্গি কারখানা চালু করেন। মালিকানায় বাবা মরহুম মাওলানা মোঃ লুৎফর রহমান। ওই কারখানাতে যে উন্নতমানের মারসেরাইজ্ড লুংগী উৎপাদন হতো তখনকার সময় যা বিক্রী হতো ১৪ টাকা দামে।

উল্লেখ্য, সেসময়কার মারসেরাইজ্ড লুঙ্গি মানে অাভিজত শ্রেণীর ব্রান্ড। সঠিক স্থান নির্বাচন ও পুঁজির অভাবে ১৯৬০ সালের শেষের দিকে কারখানাটি যখন বন্ধ হয়ে যায় ঠিক তখনই মোঃশামসুজ্জামানের এই পৃথিবীতে আগমন। জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত বাবা মরহুম মাওলানা লুৎফর রহমান ঋণগ্রস্থ অবস্থায় ব্যাবসায়িক চিন্তা বাদ দিয়ে তৎকালীন ঢাকা কেন্টনমেন্টে অবস্থিত কেন্টনমেন্ট বোর্ড জুনিয়র হাইস্কুলে (বর্তমানে শহীদ রমিজউদ্দিন হাইস্কুল এন্ড কলেজ নামে পরিচিত) শিক্ষকতা পেশায় নিজকে নিয়োজিত করেন এবং সপরিবারে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

শিক্ষক বাবারকঠোর অনুশাসনের মাঝে শামসুজ্জামান নাসিমের স্কুল জীবনের সমাপ্তি ঘটে ১৯৭৬ সালে শহীদ রমিজ উদ্দিন হাইস্কুলে। উচ্চ মাধ্যমিক ১৯৭৮ সালে আদমজী কেন্টনমেন্ট কলেজে এবং কলেজ অব টেক্সটাইল টেকনোলজিতে ব্যাচেলর অব টেক্সটাইল সাইন্স এন্ড টেকনোলজিতে ১৯৭৮ এ ভর্তি হয়ে ১৯৮৪ সালে গ্রাজুয়েশন লাভ সমাপ্ত করেন। বস্ত্র প্রকৌশলী হিসাবে চাকুরী জীবন শুরু ১৯৮৫ এর এপ্রিলে জার্মান বহুজাতিক কোম্পানি ” হোয়েকষ্ট বাংলাদেশ লিঃ”এ। ১৯৮০ থেকে ৯০ দশকের দিকে ইউরোপ থেকে বহুজাতিক কোম্পানির আমদানিকৃত প্রোডাক্ট;দেশের চাহিদা পুরন করতো। তবে,পরিবেশ দুষণ ও অতিরিক্ত মজুরির কারনে ডাইষ্টাফ,কেমিক্যাল এবং টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মালিকরা তথা সেইসব দেশের প্রস্তুকারকরা তাঁদের কারখানা এশিয়ায় স্থানান্তর করেন। ফলে,দেশে এইসব প্রোডাক্টের ব্যবসার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। ঠিক সেসময়ই ঝুঁকি নিয়ে লোভনীয় চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ১৯৯১ সালে ওরিয়েন্ট কেমটেক্স লিঃ নামক কোম্পানি খোলে রং ও রাসায়নিকের নিজস্ব ব্যাবসা শুরু চালু করেন।

তখনকার সময় ইউরোপীয় অরিজিন (সোর্সিং প্রডাক্ট) রং রাসায়নিকের ব্যাবসা তুঙ্গে থাকার পরও ইন্ডিয়া, চায়না,তাইওয়ান অরিজিনের কম মূল্যে ভালো প্রডাক্ট ক্রেতাদের চাহিদা মেটানোর মধ্য দিয়ে দ্রুততম সময়ে তাঁর ব্যবসায় সফলতা ধরা দেয়। এভাবেই প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা সাশ্রয় করে নিজস্ব ব্যাবসা প্রসারের পথ সুগম হয় শামসুজ্জামান নাসিমের। মাথায় আসে রফতানিমুখি নীট কম্পোজিট কারখানা প্রতিষ্ঠার।

যেই ভাবনা সেই কাজ। দেরি না করে ১৯৯০ দশকের প্রথম থেকেই বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের স্বর্ণযুগের শুরুর প্রাক্কালে ১৯৯৬ সালে প্রাথমিকভাবে মাক্রোফাইবার লিঃ নামে তিন(৩) টন ক্যাপাসিটির কাপড় উৎপাদনের কারখানা নারায়নগঞ্জের ফতুল্লায় স্থাপন করেন। স্থান নির্বাচনে নারায়নগঞ্জকে বেঁছে নেয়ার কারণ ছিলো দক্ষ শ্রমিক প্রাপ্যতা ও মাইগ্রেশন রেট কম। প্রতিদিন ৩টন ক্যাপাসিটির ফেক্টরীটি ক্রমান্বয়ে বেড়ে এখন ২৫ টন কাপড় (নিটিং এবং ডায়িং), ১০ টন ক্যাপাসিটির অলওভার প্রিন্টিং এবং ২০ লাখ পিস গার্মেন্টসের বিপরীতে ৬ মিলিয়ন ডলার প্রতিমাসে রপ্তানি হয়ে থাকে।

পর্যায়ক্রমে লিবার্টি নিটওয়ার লিঃ, মিডল্যান্ড নিটওয়ার লিঃ, এ-ওয়ান পোলার লিঃ নামধারী প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে প্রতিদিন ১৩০ টন কাপড় উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করে তা দিয়ে সর্বমোট প্রতি বৎসর নিটওয়ার খাতে মাইক্রো ফাইবার গ্রুপ থেকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়ে থাকে যা দেশে একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অবস্থান মধ্যে সর্বোচ্চ স্থানে।

উল্লেখ্য,বর্তমানে এই গ্রুপে প্রত্যক্ষভাবে ২২০০০ লোক কাজ করছেন। বস্ত্র ব্যাবসার পাশাপাশি স্পিনিং,বিদ্যুৎ, রিফাইনারী,ব্যাংকিং,ইন্সুরেন্স এবং ট্রেডিং ব্যাবসায়ও সম্পৃক্ত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে দেশসেরা মাইক্রোফাইবার গ্রুপ অব ইনডাস্ট্রিজ।

রপ্তানী বানিজ্যে অসামান্য অবদানের জন্য গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০১০ সাল থেকে বানিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ( CIP ) হিসেবে নির্বাচিত হওয়ারও গৌরব অর্জন করতে সক্ষম হোন মেধাবী বস্ত্র প্রকৌশলী শামসুজ্জামান নাসিম। ৩ পুত্র সন্তানের জনক মোঃনাসিম অধ্যবাসা,শৃঙ্খলা,নিয়মানুবর্তিতা,সততা ও লেগে থাকার মাধ্যমেই জীবনে পূর্ণতা লাভ করেন।

বিষেরবাঁশী..কম / ডেস্ক / রূপা

Categories: লাইফস্টাইল

Leave A Reply

Your email address will not be published.