রবিবার ৮ আশ্বিন, ১৪২৫ ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রবিবার

এদেশে সিংগাপুর-আমেরিকার মত চিকিৎসা দেয়ার উপযোগী ল্যাব কোথায় ?

ডা. রুমানা বিনতে রেজা: আমাদের এক রোগীর প্লাটিলেট কাউন্ট কম। তো তাকে ড্রাগ রেসপন্স দেখার জন্য সিবিসি দেয়া হয়, কাউন্ট একবার বিশ হাজার, একই দিনে আবার একই প্রতিষ্ঠানের অন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে করা রিপোর্টে কাউন্ট সত্তর হাজার।
ইলেকট্রোলাইট রিপোর্ট করতে দেয়া হয়েছে আরেক রোগীর। সোডিয়াম ১.৩, পটাসিশাম ১৩১।

মিটফোর্ড এ যতগুলো সিবিসি দিয়েছি, আমার রিপোর্ট মুখস্ত।
মেয়ে হলে হিমোগ্লোবিন ৮.৯ বা ৮.২। মাঝে মাঝে ভ্যারিয়েশন আনার জন্য ১০.৫ ।
পুরুষ হলে ১১-১২।
এর কম ও না, বেশিও না।
ইউরিন আরএমই দেন।
মুখস্ত রিপোর্ট।

পাজ সেল ২-৩ প্রতি হাই পাওয়ার ফিল্ডে। এপিথেলিয়াল সেল ২-৪ টি। এর কম ও না, বেশিও না।
ভ্যারিয়েশন এর জন্য মাঝে মাঝে ১/২ টা আরবিসি দিয়ে দেয় অবশ্য!!

একদিন আউটডোরে এক রোগীর রিপোর্ট পেয়ে আপলোড দিয়েছিলাম, সাতক্ষীরার কোন এক উপজেলার, বডির যত এনজাইম আছে- যত মাইক্রোমলিকুলার নিউট্রিয়েন্ট পার্টিকেল আছে, সব মেজার করা ধরনের এক রিপোর্ট এনে দিয়েছে!!!

ঢাকার বাইরের যত রিপোর্ট দেখি, WIDAL টেস্টে মোটামুটি ১৬০ বা ৩২০ পজেটিভ টাইটার।

যত ব্লাড কালচার দেখি কোন একটা অর্গানিজম এর গ্রোথ দেখিয়ে সেনসিটিভিটিতে থার্ড/ফোর্থ জেনারেশন এর দামী কোন কোন এন্টিবায়োটিক সেনসিটিভ। আমার নিষ্পাপ মন ভাবত, এইগুলা কম ইউজ করা হয়, তাই সেনসিটিভ। পরে একদিন জানতে পারলাম এখানে ঔষুধ কোম্পানি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এর কিছু পারস্পরিক বোঝাপড়া আছে!

এএনএ নেগেটিভ এক রোগীকে হাইলি ক্লিনিকাল সাসপিশন থাকায় বার বার বিভিন্ন জায়গা থেকে পরীক্ষা করানোর পরে পঞ্চমবারে দেখা গেল রিপোর্ট পজেটিভ, আমার নিজের চোখে দেখা!

কত আল্ট্রাসনোগ্রামে যে মহিলা রোগীর প্রস্টেট নরমাল, হিসটেরেকটমি করার রোগীর বাল্কি ইউটেরাস পেলাম! আর পেলভিক কালেকশন কিংবা ‘একিউট এপেন্ডিসাইটিস’ কমেন্ট করা তো মুড়ি-মুড়কির মত স্বাভাবিক ব্যাপার!

কথা হলো, আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে। সত্যি করে বলি, আমার পড়াশুনা-চাকরী সবই ঢাকা কেন্দ্রিক, আরো স্পষ্ট করে বললে হাইলি একাডেমিক দুইটা জায়গায় ক্লিনিকাল ওরিয়েন্টেশন আমার। এখানে আমাদের স্যার-ম্যাডাম, সিনিয়ররা যেভাবে চিন্তা করেন, যেভাবে রোগ নির্নয় নিয়ে ধাপে ধাপে আগান বলে দেখি, সেইরকম সাপোর্ট দেয়ার মত ল্যাব ইনভেস্টিগেশন কি আছে আমাদের হাতে?

কিছুদিন আগে এন্ডোক্রাইন বিভাগের একটা প্রেজেন্টেশন দেখছিলাম, একজন প্রাইমারি এমেনোরিয়ার মহিলা রোগী, ধাপে ধাপে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমানিত হয়েছে যিনি আসলে জেনোটাইপিকালি পুরুষ (ডিসওর্ডার অফ সেক্সুয়াল ডিসফাংশন)। ম্যাডাম অনেক বায়োকেমিক্যাল ও হিস্টোলজকাল টেস্টের নাম ধাপে ধাপে উল্লেখ করছিলেন, আমি বুঝতে পারছিলাম এইগুলোর সব ভার্সিটিতে তো নয়-ই, সম্ভবত দেশে-ও করানো সম্ভব হয় নি, একাডেমিক পারপাসে ‘বাইর’-এ থেকে করানো হতে পারে।

আমাদের অনেক রোগীরই বিশেষ করে হিস্টোলজিকাল কিছু পরীক্ষা করার জন্য পাশের দেশের এক স্বনামধন্য ল্যাবে পাঠানো খুবই স্বাভাবিক, ইন্টার্নরা পর্যন্ত সে ল্যাবের নাম জানে!

ডাক্তারদের মুন্ডুপাত করার জন্য মুখিয়ে থাকে সবাই, কিন্তু ১৭ কোটি মানুষের দেশে একটা নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে সকল পরীক্ষা করা যায়, সকল ল্যাব রিপোর্ট এ বিশ্বাস করা যায় নিশ্চিন্তে।

রোগীরা ডাক্তার রোগ ধরতে পারছেনা বলে কি দ্রুত সিদ্ধান্তে আসে, কিন্তু তার সিবিসি রিপোর্ট যেটি আপনি পিবিএফ সহ করতে দিয়েছিলেন, তাতে যে রিপোর্টটি এসেছে এটি ক্লিনিকাল ডায়াগনোসিস এর সাথে মিলে না–এ কথা কাকে বুঝাবেন?
কিভাবে বুঝাবেন?

ইন্টার্ন এর সময় একজন প্রফেসর স্যার বলেছিলেন– ইনভেস্টিগেশন করাবা নিজের ডায়াগনোসিস দাড়া করানোর জন্য, যদি তোমার ক্লিনিকাল ডায়াগনোসিস এর সাথে মিলে তো রিপোর্ট হয় বিশ্বাস করবা, না হলে ভাববা রিপোর্ট ভুল!
তো সেইসময় স্যারের কথা শুনে মনে হয়েছিল, আরেহ স্যার এত বড় ডাক্তার তাই উনি তো এমন বলবেই!
এখন যখন স্পষ্ট হাইপারথাইরয়েড এর ফিচার ওয়ালা রোগীর রিপোর্ট এ থাইরয়েড স্ট্যাটাস আসে সাবক্লিনিকাল-হাইপো রেঞ্জের, মনে হয় নিজেই মুঠো ভর্তি করে আয়োডিন খাই!

রোগীর সামনে থাকেন ডাক্তার, অন্যরা না। আপনার রোগ ধরতে অমুক অমুক রিপোর্ট জরুরি।
–শালা কসাই, কত পরীক্ষা দেয়!

এই রিপোর্ট এ অমুক রোগ ধরা পরেছে বলে মনে হচ্ছে। নিশ্চিত হবার জন্য ও চিকিৎসা শুরুর জন্য আরো কিছু টেস্ট লাগবে।
–শালা, কমিশন খাবার ফন্দি।

ল্যাব রিপোর্টটা ভুল মনে হচ্ছে। আবার করাতে হবে। দোষ কার?
–ডাক্তারের।

এইখানে এই পরীক্ষা হয় না, বাইরে থেকে করাতে হবে। কমিশন কার?
–ডাক্তারের!

গ্রামে বসে পিসি, ডিসি, টিসি আর গ্যাসের বড়ি বিলানোর জন্য দশ হাজার-পঞ্চাশ হাজার ডাক্তার নিয়োগের আদৌ কি দরকার আছে?
যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটা পুর্নাংগ ল্যাব নেই সেখানে ছয় মাসের এনেস্থিসিয়া করা ডাক্তারের ভূমিকা কি?

যে সিস্টাররা চাকরী করার কয়েক বছর পরেও যে হাতে স্যালাইন চলছে সেই হাত থেকেই স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষা করতে দেয়, অই রিপোর্ট হাতে নিয়ে কাকে দুষবেন আপনি?

চিকিৎসা সেবা বলতে শুধু কি ডাক্তারদের বোঝায়?
চিকিৎসা একটা ফুল প্যাকেজ।

এই যে হাজার হাজার ম্যাটস-প্যারামেডিকসরা ‘ডাক্তার হবার জন্য’ আন্দোলন করছে, এদের দিয়ে কি চিকিৎসা ব্যবস্থার আসলেই উপকার হয়, এমন কিছু করা যেত না?

এদের উপযুক্ত ট্রেনিং এর আওতায় এনে এই বেহাল ল্যাবগুলোর পরিবর্তন আশা করা কি খুব অমুলূক কিছু??

সিংগাপুর আমেরিকার চিকিৎসা দেয়ার উপযোগী চিকিৎসক এই দেশে অসংখ্য আছেন, কিন্তু সরি টু সে, সিংগাপুর আমেরিকার মত চিকিৎসা দেয়ার উপযোগী ল্যাব এই দেশে একটিও নেই! আই রিপিট,একটিও নেই

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: স্বাস্থ্য

Leave A Reply

Your email address will not be published.