মঙ্গলবার ৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ২০ নভেম্বর, ২০১৮ মঙ্গলবার

যৌবনের শক্তি কোন কাজে লাগিয়েছ

মাওলানা মো. ফজলুল হক: মানুষ আল্লাহর একটি দুর্বল সৃষ্টি। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন, যৌবন থেকে প্রৌঢ়, প্রৌঢ়ত্ব থেকে বার্ধক্য জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে মানুষ তার দুর্বলতার ছাপ রেখেছে। তবে প্রথম ও শেষ পর্যায়ে দুটিতে তার দুর্বলতার হার শতকরা একশ ভাগ। জন্মের প্রথম মুহূর্তে মানবশিশু একেবারে অসহায়। তার নড়াচড়া থেকে খাওয়াদাওয়া পর্যন্ত সবই পরনির্ভর। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পরনির্ভরতা কমতে থাকে। তবুও সমাজ-শাসন-শৃঙ্খলা তাকে পরনির্ভরশীল করে রাখে। আর শেষ পর্যায়ে বার্ধক্যে সে আবার পুরোপুরি পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যায়ের পরনির্ভরতা চলতে থাকে স্বজ্ঞানে।

কিন্তু এত দুর্বল মানুষ যৌবনে নিজেকে সবচেয়ে সবল মনে করতে থাকে। যৌবন মানুষের মধ্যে এমন একটা প্রাণময়তা ও কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে, যা কল্পনাতীত। কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করার পর মনে হয় যেন হঠাৎ একটা ঘুমন্ত পাহাড় জেগে উঠল। একজন যুবক মনে করতে থাকে, সে দুনিয়ায় কী না করতে পারে। সে দুনিয়াটাকে ভেঙে নতুন করে গড়তে পারে। সে আরেকটি নতুন জগৎ সৃষ্টি করতে পারে। সে আকাশের চাঁদকে হাতের মুঠোর মধ্যে আনতে পারে। সে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। এটা যৌবনের সাধ নয়, তার অন্তরের কর্মপ্রেরণা। তাই যৌবনের শক্তি হচ্ছে মানুষের সমগ্র জীবনকালের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ববহ ও মূল্যবান। মহান আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তাই বিশেষ করে মানুষের যৌবনকালের কর্মকা-ের হিসাব নেবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মানুষ আল্লাহর সামনে থেকে পা নাড়তে পারবে না, যে পর্যন্ত না সে পাঁচটা প্রশ্নের জবাব দেবে
তার সমগ্র জীবনকাল সে কীভাবে ব্যয় করেছ?
তার যৌবনের শক্তিসামর্থ্যকে কোন কাজে লাগিয়েছে?
যে জ্ঞান সে অর্জন করেছিল, সে মোতাবেক কী কাজ করেছে?
তার সম্পদ কীভাবে অর্জন করেছে?
কীভাবে সম্পদ ব্যয় করেছে?
একজনের শাস্তি দেওয়ার সামর্থ্য নেই, সে একজন অপরাধীকে মাফ করে দিল। আর একজনের শাস্তি দেওয়ার সামর্থ্য থাকার পরও সে একজন অপরাধীকে মাফ করে দিল। এই দুই অপরাধীকে মাফ করে দেওয়ার নেকি সমান হতে পারে না। স¦াভাবিকভাবেই শেষোক্ত ব্যক্তির নেকির পাল্লা ভারি হবে। এই শেষোক্ত ব্যক্তিই যেন যুবসমাজের সদস্য। এই বয়সে অফুরন্ত কর্মক্ষমতার কারণে মানুষ সহজেই আল্লাহর নাফরমানির পথে এগিয়ে যায়। শয়তান তাকে যুবশক্তির শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে প্রতারণা করে। তাকে বলে, তোমার এত বিপুল শক্তি, তুমি কেন এক অদেখা শক্তির আনুগত্য করবে? এর পরও যে যুবক আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ করে, সে আসলে নিজের অন্তর্নিহিত বিপুল শক্তির ওপর বিজয় লাভ করেছে।
আর যে যুবক আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ করে না, সে নিজের অপশক্তির হাতে পরাজিত। তার কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছে। সে নিজের নফসের দাসানুদাস তাদের বলে নফসের বান্দা। আর একজন যুবক আল্লাহর অনুগত কিন্তু শয়তান তাকে প্ররোচিত করে। এই তো তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়! এই সময় আয়েশ, আরাম ও ভোগ না করতে পারলে দুনিয়ার জীবনে আর ভোগ-সুখ নেই। আল্লাহর অনুগত যুবককেও শয়তান প্ররোচিত করে নাফরমানির পথে নিয়ে যায়। এ সময় যে যুবক বিভ্রান্ত হয় না, সে আসলে শয়তানের ওপর বিজয় লাভ করছে। আর যে বিভ্রান্ত হয়, সে শয়তানের দাসানুদাসে পরিণত হয়েছে। তাকে বলে শয়তানের বান্দা। যৌবনের এই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর ওপরই তাই সমগ্র জীবনের সফলতা নির্ভর করছে।
একজন যুবক আল্লাহর অনুগত হতে পারে, শয়তানের অনুগত হতে পারে, নফসেরও অনুগত হতে পারে। কিন্তু শয়তানের অনুগত হওয়ার মধ্যে তার গৌরবের বা শ্রেষ্ঠত্বের কিছুই নেই। এটা তার যৌবনের অফুরন্ত শক্তির কৃতিত্বের পরিচায়ক নয়। কৃতিত্ব সেখানে, যেখানে সে সব প্রলোভন তুচ্ছ করার হিম্মত রাখে। যৌবন জলতরঙ্গ যেদিকে প্রবাহিত হতে চায়, সে যদি সেদিকেই প্রবাহিত হয়ে যায়, তাহলে তাতে তার কৃতিত্ব কোথায়? স্রোতের বিপরীতে এগিয়ে চলার মধ্যেই তো সাঁতারুর দক্ষতা প্রমাণিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা সাত পর্যায়ের লোককে তার আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন। তার মধ্যে এক শ্রেণি হলো, সেসব যুবক, যারা যৌবনের আহংকারে বিভ্রান্ত না হয়ে এ সময় আল্লাহর বন্দেগিতে কাটায়। তিনি আরও বলেন, হে মানবম-লী! তোমরা পাঁচটি অবস্থার সম্মুখীন হওয়ার আগেই পাঁচটি অবস্থাকে ‘গনিমত’ (মহামূল্যবান) মনে করো।
বার্ধক্য আসার আগে যৌবনকে,
দারিদ্র্যে পতিত হওয়ার আগে ঐশ্বর্যকে,
রোগেশোকে আক্রান্ত হওয়ার আগে শারীরিক সুস্থতাকে,
মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছার আগে জীবনকালকে এবং
কোনো কাজে লিপ্ত হওয়ার আগে অবসর সময়কে।
সত্যকে আবিষ্কার করা, সত্যকে মেনে নেওয়া এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা যুবকদের জন্য মোটেও কঠিন নয়। সত্য তো আবিষ্কৃত হওয়ার জন্য, প্রস্ফুটিত হওয়ার জন্য, বিকশিত হওয়ার জন্য এসেছে। কিন্তু কোথায় সেই যুবসমাজ, যারা একে আবিষ্কার করে বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত করবে। সত্য তো নিজেকে প্রকাশ করেছে। কিন্তু তাকে গ্রহণ করার ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কি যুবসমাজ এগিয়ে এসেছে? মহান আল্লাহ তাঁর শেষ নবীর মাধ্যমে যে সত্য দ্বীন পাঠিয়েছেন বাংলার জমিনে, তার প্রবেশ ঘটেছে হাজার বছর আগে। এ সত্য দ্বীন এ দেশে প্রতিষ্ঠার জন্য যুবসমাজের উদ্যোগের প্রতীক্ষা চলছে। কিন্তু আমাদের যুবসমাজ কোন মরীচিকার দিকে ছুটে চলছে? তাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে মূল্যবান সময় অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা কি জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে মূল্যবান কাজ সম্পন্ন করতে পারছে?

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: লাইফস্টাইল

Leave A Reply

Your email address will not be published.