রবিবার ৮ আশ্বিন, ১৪২৫ ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রবিবার

ডিইউজে নির্বাচনে কি হয়েছে, কেন হয়েছে?

পুলক ঘটক: গতবার যিনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতিদ্বন্দীতার কাছাকাছিও আসতে পারেননি এবার তিনি বিপুল পরিমাণ ভোট পেয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)’র শীর্ষ পদ অধিকার করেছেন। ফেসবুকে প্রকাশিত ফলাফলে সেরকমটাই দৃশ্যমান। অর্থাৎ গত দুই বছরে সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে তিনি অনেক অবদান রেখেছেন; সাংবাদিকদের জন্য অনেক কিছু করে তাদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন এবং ভোটাররা তাকে ব্যালট বাক্স ভরা উপহার দিয়েছেন।

দু’বছর আগে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)’র যুগ্ম-মহাসচিব পদে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমি বেশ ভাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলাম। এবার ডিইউজে’র সাধারণ সম্পাদক পদে অংশ নিয়ে আমি প্রতিদ্বন্দীতার কাছাকাছিও আসতে পারিনি। এর অর্থ দাড়ায়, গত দু’বছরে আমি সাংবাদিকদের পক্ষে দাঁড়াইনি, তাদের জন্য একটি শব্দও উচ্চারণ করিনি -শুধু নিজের ফায়দা লুটেছি এবং ভোটাররা তাদের রায়ের মাধ্যমে এর যথাযথ জবাব দিয়েছেন। এবারের নির্বাচনে আমি প্রতিদ্বন্দীতার কাছাকাছিও আসতে পারিনি।

ব্যাপারটা কি আসলেই এরকম? নইলে ফলাফল এরকম হবে কেন? এই নির্বাচনের ভোটাররা তো সবাই শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ। আমি মনে করি ডিইউজে’র এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য শিক্ষনীয় একটি অধ্যায়। সাংবাদিক, রাজনীতিবিদসহ সকল স্তরের মানুষের উচিৎ এই নির্বাচনের পাঠ অধ্যয়ন করা।

গত দুই বছরে তিনি কি এমন অবদান রাখলেন যার জন্য সাংবাদিকরা তাকে বাক্স উপচে ভোট দিলেন? প্রকৃত সত্য হল, বিগত দুই বছরে তিনি টাকা উপার্জনের দিকে মন দিয়েছেন। সাংবাদিক অধিকার বা সাংবাদিক স্বার্থের ধারে কাছেও আসেননি। বাণিজ্যে মনোযোগ দিয়ে টাকা বানিয়েছেন প্রচুর। একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি সংবাদপত্রের মালিক হয়েছেন। নাম সর্বস্ব বাংলা পত্রিকাটির জন্য তথ্যমন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ রেটকার্ড আদায় করেছেন। “সর্বোচ্চ রেটকার্ড” মানে প্রথম আলো বা কালের কন্ঠের মত পত্রিকা যে রেটে সরকারি বিজ্ঞাপন পায়, সেই রেটেই সরকার তার পত্রিকাতেও বিজ্ঞাপন দেবে। রেটকার্ড পাওয়া পর তিনি তার পত্রিকাটি আর একজন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেন। রেটকার্ডের বদৌলতে অখ্যাত পত্রিকাটির দাম উঠেছিল কয়েক কোটি টাকা। তিনি ভদ্র, নম্র ও বিনয়ী মানুষ। সাংবাদিকরা তার ভাল-মন্দ সবকিছু জানে। যদি তাকে ভোট দিয়ে থাকে তাহলে সবকিছু জেনেবুঝেই সাংবাদিকরা তাকে ভোট দিয়েছে। ফেসবুকে দৃশ্যমান ফলাফল অনুযায়ী এবার তিনি ডিইউজে’র সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সাংবাদিক হিসেবে সুপরিচিত হওয়ার আগেই তিনি দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এই সাংবাদিক সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক পদেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সাংবাদিকদের সমস্যা অনেক এবং তা সমাধানে ব্যর্থতার জন্য ইউনিয়নের নেতাদের প্রতি ভোটারদের অভিযোগও অনেক। সাংবাদিকরা কি এসব সমস্যা সমাধানের জন্য এবার আবু জাফর সূর্যের উপর ভরসা করেছেন?

যারা নির্বাচন করেছেন তাদের মধ্যে বয়সে, নেতৃত্বগত অবস্থানে, পান্ডিত্যে ও জনপ্রিয়তায় আমাদের সবার উপরে ছিলেন সভাপতি পদপ্রার্থী জাফর ওয়াজেদ। তবে তার দুর্বল দিক হল, তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর কখনই ইউনিয়নের কাজ করেননি, সময় দেননি। এমনকি ইউনিয়নের মিটিংগুলোতেও তিনি উপস্থিত হতেন না। আমার দেখা ১৯ বছরে তিনি বেশ কয়েকবার নির্বাচিত হয়েছেন। এই ১৯ বছরে ১৯টি সভাতেও তিনি উপস্থিত হয়েছেন কিনা সন্দেহ। মানুষ সবসময় তাকে ভালবেসে (সহসভাপতি পদে) সর্বোচ্চ ভোট দিয়ে এসেছে। কিন্তু তিনি তার মূল্য দেননি। ইউনিয়ন কেন্দ্রিক কিছু মানুষ ছাড়া সাধারণ ভোটাররা এসবের খোঁজখবরও রাখেন না। জানলেও খুব একটা আমলে নেন না। তিনি কবি, সুলেখক এবং সদালাপী। মানুষ তাকে ভালবাসে এবং ভোট দেয়। সাংবাদিক সমাজের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য তিনি কাজ করবেন- এই ভরসায় তাকে কেউ ভোট দেয় বলে মনে হয় না। সারাবছর ইউনিয়ন কর্মকান্ডে জাফর ওয়াজেদের অনুপস্থিতি নিয়ে এবারের নির্বাচনেও খুব একটা সমালোচনা হয়নি। বেশি সমালোচনা হয়েছে নির্বাচনে তাঁর মূল পৃষ্ঠপোষক ও নেপথ্য চালক হিসেবে মোল্লা জালালের নাম। সাংবাদিক সমাজে মোল্লা জালালের যে ভাবমূর্তি, সেটা জাফর ওয়াজেদের নির্বাচনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবুও একজন জাফর ওয়াজেদকে স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হারানো সম্ভব বলে আমি মনে করি না –যদি না প্রতিদ্বন্দ্বী তার সমকক্ষ হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীরা কি তার সমকক্ষ ছিলেন? সমকক্ষতায় অনেকটা তার কাছাকাছি অবস্থানে ছিলেন কুদ্দুস আফ্রাদ। তিনি শতভাগ পেশাদার সাংবাদিক, সংগঠক এবং ইউনিয়নের কর্মী। তিনিও বন্ধু বৎসল, সজ্জন ও সদালাপী। অসৎ সাংবাদিক কিংবা দুর্নীতির সাথে জড়িত- এরকম কোনো অভিযোগ তার নামেও নাই। জাফর ওয়াজেদ জনপ্রিয় মানুষ এবং কুদ্দুস আফ্রাদ তুলনামূলক জনপ্রিয় একজন নেতা। কোনো কারণে জাফর ওয়াজেদের মত প্রার্থী হারলে হারতে পারেন কুদ্দুস আফ্রাদের কাছে। আবু জাফর সূর্যের মত ব্যবসায়ীর কাছে নয়। কিন্তু কি হল?

সূর্য ভোট পেয়েছেন ৭১২, কুদ্দুস আফ্রাদ ৬৭১, আর জাফর ওয়াজেদ ৩৪১ ভোট। কেউ হয়তো বলবেন, জাফর ওয়াজেদ এবং কুদ্দুস আফ্রাদের মধ্যে ভোট ভাগাভাগির কারণে সূর্য জয়ী হয়েছেন। তাতেই কি হিসাব মেলে? গত নির্বাচনে সূর্য ভোট পেয়েছেন ২৬১। সাংবাদিকদের জন্য কোন অবদানের বদৌলতে তার ভোট গতবারের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গেল? মনোনয়ন দাখিলের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত তার প্যানেল ছিল ভঙ্গুর। প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক একজন দক্ষ রিপোর্টার হিসেবে পরিচিত হলেও নীতিতে সুবিধাবাদী এবং উপার্জনের প্রশ্নে অন্য খ্যাতিতে অভিষিক্ত। তিনি কখনোই ডিইউজে’র সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। গতবার হঠাৎ করে ডিইউজে নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়ে হেরে যাওয়ার পর দু’বছর যাবত গা ঢাকা দিয়ে ছিলেন। এবার নির্বাচনে আবু জাফর সূর্য জয়ী হলেও প্যানেলের সেক্রেটারি প্রার্থী সাজ্জাদ আলম খান তপু হেরেছেন। তবে তিনি বজয়ী প্রার্থী সোহেল হায়দার চোধুরীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, আমি এই নির্বাচনে একজন প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছাকাছিও নেই।

আমি অযোগ্য, ইউনিয়ন কর্মকান্ডে নিষ্ক্রিয় ছিলাম, কিংবা সাংবাদিক সমাজের দাবি আদায়ের প্রশ্নে নিশ্চেষ্ট ছিলাম – এরকম অভিযোগ কেউ করে না। এই নির্বাচনে আমার সুস্পষ্ট অঙ্গিকার ছিল এবং ঘোষিত এজেন্ডা ছিল। ইতিবাচক দিকগুলো বাদ দেই। গণতন্ত্রের জন্য নেতিবাচক যেসব উপাদান একজন খারাপ প্রার্থীকেও নির্বাচনে জয়ী করাতে ভুমিকা রাখে, তার সবগুলো না থাকলেও কিছুকিছু উপাদান এবার আমার অনুকুলেও ছিল। যেসব উপাদান একজন ভোটারের মনোজগৎকে সুবিচারক না বানিয়ে তাকে পক্ষপাতদুষ্ট করে, আমি সে সব উপাদানের কথা বলছি। যেমন: সাম্প্রদায়িকতা, আঞ্চলিকতা, বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত পক্ষপাত, কালো টাকার ব্যবহার, বংশ পরিচয় ও শানসৈকত প্রদর্শন ইত্যাদি।

সাংবাদিক সমাজে আমি বামপন্থী চিন্তার মানুষ হিসেবে সুপরিচিত। মিডিয়াতে আমার রাজনৈতিক সমমনা (কিংবা প্রায় সমমনা) সহকর্মীর সংখ্যা তিনশো’র কাছাকাছি। রাজনৈতিক সমবিশ্বাসে তাদের সংগঠিত করার জন্য আমিই সবচেয়ে সক্রিয় ছিলাম। তাদের সবাইকে নিয়ে সুদৃঢ় জোটবদ্ধ অবস্থান তৈরি করা সম্ভব না হলেও সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে গড়ে ওঠা পারস্পরিক মৈত্রী একেবারে ঠুনকো বলে মনে করি না। সংখ্যালঘু (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান ও আদিবাসী মিলিয়ে) সম্প্রদায়ভুক্ত ভোটার ৩৭১। আমি রংপুর বিভাগ সাংবাদিক সমিতি, ঢাকার সাবেক সহসভাপতি। ডিইউজে’র তালিকায় ঐ অঞ্চলের ভোটার রয়েছে ১৭২। সমিতির পক্ষ থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল সবাই আমার পক্ষে সমন্বিতভাবে কাজ করবেন। নেতৃস্থানীয় কয়েকজন আমার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। আমার নিজের হাউজ ডেইলি অবজারভারে ভোটারের সংখ্যা ৫১। দুর্দিনে পাশে দাঁড়িয়েছিলাম এমন সদস্য সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তাদের অনেকেই প্রকাশ্যে আমার পক্ষে কথা বলেছেন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমার পক্ষে লিখেছেন। নির্বাচনের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত কয়েকটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানে আমার একচেটিয়া অবস্থান দেখেছি। ডেইলি সানের চাকুরিচ্যুত সাংবাদিকদের পাওনা আদায় আন্দোলনে আমি নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। ঐ সময়ের সহকর্মীদের অনেকেই আমার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। দৈনিক ইনকিলাবের চাকুরিচ্যুত সাংবাদিকদের মধ্যে ১৭ জন ভোটার। পাওনা আদায়ের আন্দোলনে ইউনিয়নের বিদ্যমান নেতাদের অবিশ্বস্ত ভুমিকায় তারা সবাই ক্ষুব্ধ ছিলেন। অবিশ্বস্ত হিসেবে সমালোচিত চার নেতার একজন ছিলেন বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুর। তার প্রতি ক্ষুব্ধ ইনকিলাবের চাকুরিচ্যুত সাংবাদিকদের অনেকেই আমার পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছিলেন। কয়েকজন আমার পক্ষে খেটেছেন। কিন্তু ফলাফল কি হল? আমি ভোট পেয়েছি মোটে ১৫১। সোহেল হায়দার ৫৫১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। আমার কি বিস্মিত হওয়া উচিত? নির্বাচনের দিন দেখলাম আগে থেকে আমাকে সমর্থন করা অধিকাংশ সাংবাদিক প্রকাশ্যে ক্যাম্পেইন করতে রাজী হচ্ছেন না। প্ল্যাকার্ড না ঝুলিয়ে কেউ কেউ চুপে চুপে কাজ করেছেন। অনেকে ভোট কেন্দ্রেই যান নি।

নির্বাচনে কালোটাকার ব্যবহার হয়েছে অতি মাত্রায়। কিন্তু সাংবাদিকরা সবাই কি টাকার বিনিময়ে ভোট দিয়েছেন? মোটেই না। আমার পর্যবেক্ষণ হল, এই নির্বাচনে ৮০ শতাংশ ভোটার টাকা পয়সা নেননি। বড় জোর পাঁচ শতাংশ সাংবাদিক এবং ১৫ শতাংশ সাংবাদিক নামধারীর দুস্কর্মের কারণে গোটা সাংবাদিক সমাজের দুর্নাম হচ্ছে। ৩২৩২ ভোটারের মধ্যে ২১০৭ জন ভোট প্রদান করেছেন বলে দেখানো হচ্ছে। অর্থাৎ ৩৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিতেই যাননি। অনেকেই ভোট দিতে এসেছিলেন। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে ভোট দিতে না পেরে ফিরে গেছেন। তাদের প্রায় সবাই মূল ধারার সাংবাদিক। মূলধারার অনেক সাংবাদিক ভোট দেন। কিন্তু সাংবাদিক ইউনিয়নে কার কি অবদান সে বিষয়ে তারা খোঁজ রাখেন না। সাংবাদিক ইউনিয়ন তাদের কোনো কাজে আসে বলেও তারা বিশ্বাস করেন না। অনেকেই ভোট দেন ব্যক্তি পর্যায়ের অনুরাগ বা বিরাগের জায়গা থেকে। অনেকের ভোটিং মানসিকতা দায়সারা গোছের। পেইড প্রভাবকরা দায়সারা গোছের ভোটারদের ভোট কবজা করতে সফল হয়েছেন। এর বাইরে অন্তত ২০ শতাংশ ভোটার আছেন, যারা নিজেদের বিক্রি করেছেন। এর মধ্যে অন্তত ৫ শতাংশ সাংবাদিক আছেন যারা প্রভাবক হিসেবেও শক্তিশালী ভুমিকা রেখেছেন। এদের মধ্যে অনেক সাংবাদিক থাকলেও সবাই পেশাদার সাংবাদিক নন।

এ পর্যায়ে একটা মজার অভিজ্ঞতা বলি। ২৭ ফেব্রুয়ারি ডিইউজের সাধারণ সভা শেষ হওয়ার পর সর্বশেষ ক্যাম্পেইনের জন্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে যেতে চাচ্ছিলাম। আমার এক সহকর্মী প্রেসক্লাবে উপস্থিত একজনের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তার মটরবাইকে আমাকে উঠিয়ে দিলেন। আমাকে দ্রুত ডেইলি স্টার কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভদ্রলোক প্রাণান্ত চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু যানজটের কারণে সুবিধা করা যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে তিনি উদ্বীগ্ন হয়ে আমাকে বললেন, “সাড়ে ছয়টা বেঁজে গেছে। এখন গেলে অফিস খোলা পাবেন?” আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম, “সন্ধায় সংবাদপত্র অফিস বন্ধ হয় না, বরং বেশি ব্যস্ত থাকে।” উল্লেখ্য, তিনি ডিইউজের একজন ভোটার।

সংবাদপত্র অফিস কখন খোলা থাকে এবং কখন বন্ধ হয় তা জানেন না -ডিইউজেতে এরকম ভোটারের সংখ্যা কত তা আমিও জানি না।

আমরা ঢালাওভাবে নির্বাচন কমিশনকে দুষছি! কিন্তু নির্বাচন কমিশন কি গণনার সময় ফলাফল বদলিয়ে দিয়েছে? এটা আমি অন্তত বিশ্বাস করিনা। ফলাফল বদলে গেছে নির্বাচন শুরু হওয়ার আগেই। নির্বাচন কমিশন কিছু অনিয়ম বরদাস্ত করেছে মাত্র। দৃশ্যমান অনিয়মের একটি হল সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী সোহেল হায়দার চৌধুরীকে নির্বাচনী বুথের ভেতরে অবস্থান করে ভোটারদের ভোট প্রদান কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করার সুযোগ দেওয়া। পর্যাপ্ত বুথের ব্যবস্থা করতে না পারায় ভোট প্রদানে ধীর গতি তৈরি হয়। প্রচন্ড রোদে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ভোট দিতে না পেরে বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক ফিরে গেছেন। একটি প্যানেলের পক্ষে আমদানিকৃত লোকজন লাইনে ঢুকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। ধৃত ৩০ জন জ্বাল ভোট প্রদানকারীকে নির্বাচন কমিশন ছেড়ে দিয়েছে। যেসব জ্বাল ভোটার ধরা পরেছেন তাদের অনেকের গলায় সূর্য-তপু পরিষদের নির্বাচনী প্ল্যাকার্ড ঝুলতে দেখা গেছে। দশজনে একজন ধরা পরার সম্ভাব্য সমিকরণ থেকে অন্তত ৩০০ জ্বাল ভোট পরেছে বলে অনুমান করা যায়। প্রায় ২০০ ব্যালটে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া অন্য পদগুলোতে ভোট দিতে দেখা যায়নি। তার মানে ঐ দু’শ ভোটদানকারীর মূল দায়িত্ব ছিল প্যানেলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ দুটো ঠিক রাখার। অন্য পদের প্রার্থীদের ব্যাপারে তাদের অত মাথা ব্যথা ছিল না। কোনো কোনো ব্যালটে শুধুমাত্র সভাপতি পদে কিংবা শুধুমাত্র সাধারণ সম্পাদক পদে ভোট দিয়ে বাকিগুলো ফাঁকা রাখতে দেখা গেছে। ২০০/৩০০ জ্বাল ভোট পরে থাকলে তার সবগুলো এক প্যানেলে পরেছে তা মনে করিনা। তিনটি প্যানেলের পক্ষেই কম বেশি জ্বাল ভোট পরেছে। একজন প্রার্থীর ২০০ জন পেইড কর্মী, ২০০ জ্বাল ভোট, ৩০০ ক্রয়কৃত ভোট এবং ২০০ ব্যক্তিগত/আঞ্চলিক বা অন্য কোনো সম্পর্কের ভোট থাকলে তাকে হারানোর সাধ্য আছে কার?

আমি মোট ছয়বার ভোটে দাঁড়িয়ে জয়ী হয়েছি। তবে এবারের ভোটে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা আর কখনো হয়নি। এখনো এই পেশায় নিয়োজিত অধিকাংশ মানুষ আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন। তারা নির্বাচনে কারও কাছে টাকা নেন না। টাকা অফার করায়, কিংবা তার পক্ষে ইউনিয়নের চাঁদা পরিশোধ করায় একজন প্রার্থীকে অপমান করেছেন -এমন সাংবাদিকও দেখেছি। আবার এমন বেশ কিছু রিপোর্টার, সাব এডিটর ও প্রুপরিডার পেয়েছি যারা এবার আমার মত প্রার্থীর কাছেও টাকা দাবি করার সাহস দেখিয়েছেন। টাকা চাওয়ার নানা স্টাইল। নির্বাচনে দাঁড়ানোর পর দুই একজন তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরে টাকা ধার চেয়েছেন। নির্বাচনের প্রাক্কালে কেউ একজন বলেছেন, “টাকার অভাবে বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাতে পারিনি।” ভোট চুক্তিবিদ সাংবাদিকও পেয়েছি। তিনি বলছেন, “আমার হাতে ২৭ জন ভোটার আছে। সবার হাতে কিছু টাকা দিলে ভোটগুলা কনফার্ম করার যায়।” এমন সাংবাদিক পেয়েছি যিনি মুখের উপর আমাকে বলেছেন, “সাংবাদিক ইউনিয়ন আমার কি কাজে লাগে? নেতা হয়ে তো অনেক ফায়দা নেবেন। আমার ভোট নিতে হলে টাকা দিতে হবে।” আর একটা শ্রেণীর সাংবাদিক আছে। তারা সমালোচনা কিংবা গালাগাল করবে। মুখ বন্ধ করার জন্য টাকা দিতে হবে। মুখ ভরাতে পারলে সারাদিন আপনার প্রশংসা করবে। এই সবধরণের সাংবাদিক মিলে সংখ্যটি ১০ শতাংশের বেশি হবে না। এর বাইরেও প্রায় ১০ শতাংশ আছেন -যারা নামে মাত্র সাংবাদিক। বাস্তবতা হল, তারা অন্য পেশায় নিয়োজিত। তাদেরও সবাই টাকা খান না। তাদের মধ্যে কিছু লোক আছেন -যারা নিজেরাই অনেক টাকার মালিক। সাংবাদিকতা পরিচয়টা কাজে লাগে বলে ইউনিয়নের খাতায় যেভাবেই হোক নাম ঢুকিয়ে রেখেছেন।

যিনি প্রায় কোটি টাকা ব্যয় করে একটি পদ কিনে নিয়েছেন, আপনার বা আমার প্রতি তার দায়বদ্ধতা কি? তার কাছে আমরা চাইবই বা কেন? কেউ টাকার বিনিময়ে ভোট দিলে প্রত্যাশা করার নৈতিক অধিকার তার কতটা থাকে? আপনি টাকার বিনিময়ে ভোট দেবেন, আবার নেতাদের গালাগাল করবেন -এ কেমন কথা? টাকা খাওয়ার পক্ষেও যুক্তি এসেছে। যেমন একজন বলেছেন, “ইউনিয়ন আমার কি কাজে লাগে। নগদ দেন, ভোট দেব।” সুতরাং ইউনিয়নের প্রতি সদস্যদের এহেন আস্থাহীনতা তৈরির দায় আমরা নীতিহীন নেতারাও এড়াতে পারিনা।

 

Categories: খোলা বাতায়ন

Leave A Reply

Your email address will not be published.