শনিবার ৭ আশ্বিন, ১৪২৫ ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শনিবার

আমার সংক্ষিপ্ত সংগ্রামী ইতিহাস – ২

গৌতম রায়: মালয়েশিয়ায় এসে জীবনের অর্ধেক সময় পার করেছি প্রবাসীদের জন্য লড়াই সংগ্রামে। সবাই যখন নিজের ভাগ্যোন্নেষনে বিদেশ আসে, আমি যেন তখন এসেছি অন্যের ভাগ্য সুপ্রসন্ন দেখতে। ২৭/২৮ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় চলমান কত স্মৃতি। সুখের স্মৃতির চেয়ে কষ্টের স্মৃতিগুলোই আজ দীর্ঘ হচ্ছে। শুধু বঞ্চনা প্রবঞ্চনার মধ্যেই পথ হেঁটেছে প্রবাসীরা। তবু কম নয় আন্দোলনের সেই দিনগুলো। আমার অগ্রভাগে ছিলেন মরহুম গোলাম আহাদ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শ্রমিকের পক্ষে কথা বলতে বলতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রইল-

১০. ১৯৯১ সালে মালয়েশিয়ার উপর প্রথম দৈনিক বাংলার বানীতে উপ সম্পাদকীয় লিখি- মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিক অপরিহার্য্য।
১১. ১৯৯৩ সালে এ দেশে বিদেশী রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় মরহুম গোলাম আহাদের নেতৃত্বে আমরা মালয়েশিয়ায় প্রথম বাংলাদেশী সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ গঠন করি কুয়ালালামপুরস্থ সেন্টোল KTM ক্লাবে। কালের যাত্রায় যা আজ মালয়েশিয়া আওয়ামী লীগে রূপান্তরিত হয়েছে।
১২. ১৯৯৩ সাল থেকে আজ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিকের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে একাগ্রচিত্তে পথ চলেছি।
১৩. ১৯৯৪ সালে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলায় হাইকমিশনের দুর্নীতি ও শ্রমবাজারের কুকীর্তি নিয়ে প্রথম রিপোর্ট করি এবং বাংলাদেশ সরকারের মনযোগ আকর্ষনে সামর্থ হই। একাধিকবার চিঠি পাঠিয়ে আমার সাথে হাইকমিশন বিভিন্ন প্রলোভনে সমঝোতার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।
১৪. ১৯৯৬ সালে জহুর বারুতে স্থানীয়দের সাথে বাংলাদেশী শ্রমিকদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয় এবং প্রচুর শ্রমিকের মৃত্যু হয়। মরহুম গোলাম আহাদের নেতৃত্বে আমরা বিভিন্ন কৌশলে ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনি।
১৫. একই বছর উক্ত ঘটনার রেশ টেনে মালয়েশিয়ায় বিবাহিত বাংলাদেশীদের বহিষ্কারের ঘোষনা দেয় সরকার। বিবাহিত বাংলাদেশীদের অধিকার রক্ষায় স্থানীয় টিভি ও পত্রিকার মাধ্যমে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করি মরহুম গোলাম আহাদের নেতৃত্বে। যার প্রধান ভূমিকায় ছিলাম আমি। এর ফলে মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথীর মোহাম্মদ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেন। সে সূত্রেই আজ মালয়েশিয়ায় বিবাহিত বাংলাদেশীরা স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পাচ্ছেন এবং অনেকে ‘দাতুক’ উপাধিও লাভ করেছেন।
১৬. বিভিন্ন ডিটেনশন ক্যাম্পে বাংলাদেশীদের উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনাগুলো এনজিও সংস্থা ‘তেনাগানিতা’র মাধ্যমে The Sun পত্রিকায় বিশেষ সংখ্যা হিসাবে তুলে ধরা হয়। নেপথ্যে ছিলাম আমরা। পরে সরকার তেনাগানিতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। মালয়েশিয়ায় সবচেয়ে বেশী সময় ১৫ বছরের বেশী এই মামলা চলে।
১৭. ১৯৯৭ সালে কিলাত কেলাব মাঠে অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে বাস নিয়ে দলবেঁধে সমর্থন করি। সেদিন স্থানীয় পুলিশের বৈষম্যমূলক আচরনে খেলা চলাকালীন সময়ে বিনা অপরাধেই গ্যালারী থেকে আমাকে গ্রেফতার করা হয়। সে খেলাতেই বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয় আইসিসি ট্রফি লাভ করে এবং টেষ্ট ম্যাচ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। যা আজ বিশ্ব ক্রিকেটে দাপটের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
১৮. ২০০৭ সালে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে প্রতারনা ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে রুখে দাঁড়াই। হাইকমিশনের ভেতরে দালালরা আমার উপর হামলা চালায়। বিবিসি, আল জাজিরা ও বাংলাদেশ মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়গুলো জন সন্মুখে নিয়ে এসে সর্বত্র তোলপাড় ফেলতে সক্ষম হই। সে বছরই পুলিশ দিয়ে আমাকে মিথ্যা মামলায় ২ বার গ্রেফতার করা হয়। পরের বছর ২০০৮ সালে শ্রমবাজারটি বন্ধ হয়ে যায়।
১৯. দুর্নীতিবাজ হাইকমিশনার শফি ইউ আহম্মদের বিরুদ্ধে দৈনিক ‘যায় যায় দিন’ পত্রিকায় ধারাবাহিক রিপোর্ট করি। ১/১১ সরকার তাকে লন্ডন থেকে ঢাকায় অপসারন করে।
২০. ২০০৮ সালে মালয়েশিয়ায় প্রথম নিয়মিত বাংলা পত্রিকা ‘প্রবাসীকন্ঠ’ বের করি। যা এ দেশের সর্বত্র বাংলাদেশীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মালয়েশিয়ায় সর্বত্র বাংলা ভাষাকে পরিচয় করতে সামর্থ হই।
২১. আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মালয়েশিয়ায় ৩৫-৪০ হাজার টাকায় শ্রমিক পাঠাতে দাবী করি। যা পরে ৩৩ হাজার টাকায় জি টু জি ভিসায় শ্রমিক পাঠায় সরকার। এ দাবীটি একমাত্র আমারই ছিল।
২২. ২০১০ সালে কুয়ালালামপুরে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে একমাত্র বাংলাদেশী সাংবাদিক হিসাবে আমন্ত্রিত হই। সম্মেলনের অবসরে মালয়েশিয়ায় সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে একান্ত আলাপকালে শ্রমিকদের বৈধকরনের প্রস্তাব তুলে ধরি। যা দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বিষটি উত্থাপিত হয়। এভাবেই বৈধকরন প্রক্রিয়ায় ‘৬ পি’ পারমিট পেয়েছিল কয়েক লাখ শ্রমিক।
২৩.২০১০ সালে এক আলোচনা সভায় বিদেশে প্রবাসীদের মৃতদেহগুলো সরকারী খরচে দেশে ফেরত পাঠানোর জোর দাবী জানিয়েছি সরকারের কাছে। যা পরবর্তীতে বর্তমান সরকার কার্যকর করে। আজ সরকারী খরচে লাশ দেশে পাঠানো হচ্ছে এবং ঢাকা বিমানবন্দরে লাশ দাফন কাফনের জন্য নিহতের পরিবারকে অনুদান দেয়া হচ্ছে।
২৩. এর পর আজ অব্দি ফেইসবুকে প্রবাসীদের সঠিক পরামর্শ দিয়ে তাদের বিপদমুক্তি ও সুন্দর প্রবাস জীবন চালু রাখার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম অব্যহত রেখেছি।

Categories: খোলা বাতায়ন

Leave A Reply

Your email address will not be published.