শুক্রবার ৬ আশ্বিন, ১৪২৫ ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শুক্রবার

“ইতিহাস কথা কয়” ‘বিএনপি’র হাতে খুন না’গঞ্জের জনপ্রিয় আ’লীগ নেতা মনির ভাইকে কেউ মনে রাখেন নি” ‘রক্তাক্ত না’গঞ্জ আ’লীগ অফিস : ১৯৮২’

বিষেরবাঁশীডটকম:
বিএনপি’র হাতে খুন হয় মনির ভাই। তুখোড় বক্তা আমলাপাড়ার তরূণ মনিরুল ইসলাম মনির ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, তার আগে বৃহত্তর ঢাকা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। ৩রা নভেম্বর ছিল জাতীয় ৪ নেতা হত্যা দিবস। দিবসটিকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ হরতাল আহবান করে। রাত ৩টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ও শহর আওয়ামী লীগ অফিসের (২গেট পুরাতন ২তলার) দরজা ভেঙ্গে বিএনপি’র পরিচিত খুনিরা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।

Image may contain: 3 people, people smiling, people standing
হরতালের আগে সন্ধ্যায় মশাল মিছিল করি। তখন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনছার আলী, জোহা ভাই সভাপতি। আমি ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলাম। রাত ১১ টায় আমাদের সবাইকে মনির ভাই বিদায় করে দিলেন, যাতে আমরা পরেরদিন সকালে পিকেটিং করতে পারি। অফিসে রয়ে গেলেন আনসার ভাই, মনির ভাই, আনোয়ার ভাই, গোপী দা, কাদেরিয়া বাহিনীর সদ্য ফেরত নাছিম ভাই, দুলাল ভাই ও আরও কিছু নেতা অফিসে ছিল, আমরা চলে আসলাম ঠিকই কিন্তু কৌতূহল রয়ে গেল, বাসায় না গিয়ে অফিসের পাশে অন্য একটি দোতলা ঘরে ঘুমাতে গেলাম। হঠাৎ হই চই শুনে লাফিয়ে উঠে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি খুনিরা স্লোগান দিচ্ছে ‘একটা একটা বাকশাল ধর, সকাল বিকাল নাস্তা কর’ নড়বড়ে কাঠের সিঁড়িতে হামাগুড়ি দিয়ে উপড়ে উঠে, তারপর খুনিরা দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করছে। ২ মিনিটেই হাল্কা দরজাটা ভেঙ্গে যায়। টিউব লাইটের সাদা ধব ধব আলোতে খুনিদের চিনতে কোন সমস্যা হল না, দলনেতা ফতুল্লার ওই বিশাল দেহের খুনি ছিল আমার ক্লাসের ছাত্র, তার নিয়মিত ক্যাপটা সেদিনও পরা ছিল(বর্তমানে প্রবাসী), আরেকজন উকিলপাড়ার বিএনপি’র জন্মকালীন নেতা বর্তমান মহানগর বিএনপি নেতা, সাথে আরো ৩ জন। ২ মিনিটেই তারা মনির ভাইকে গুলি করে হত্যা করে দ্রুত চলে যায়। পাশের বিল্ডিংয়ের বেল্কনি দিয়ে নেতারা যে যেভাবে পারে চলে গেছে। আমি ঠিক ঐ রাস্তায় অফিসের ভিতরে ঢুকি। মনির ভাইয়ে দেহটা মেঝেতে পরে আছে, সাথে সাথে নিথর দেহটা কোলে তুলে নেই, গরম রক্ত আমার শরির ভিজে যায়। তাঁর সাথে কথা বলার চেষ্টা করি, একসময় বুঝতে পারি মনির ভাই মারা গেছেন। তারপর আগের মতোই মনির ভাইকে মেজেতে রেখে দরজা বন্ধ করে দেই এবং টিউব লাইট বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে থাকি, কোন মানুষের সাড়া শব্দ পেলাম না, তারপর যে রাস্তায় অফিসের ভিতরে ঢুকেছিলাম সেখান দিয়েই বের হয়ে যাই। গোসল সেরে জানালার ধারে আবার এসে বসে থাকি, ফজরের নামাজ শেষে সবার আগে ঠিক ৬ টায় আনসার ভাই অফিসে আসেন, দরজা বন্ধ দেখে সে জোরে ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে মনির ভাইকে মেজেতে মৃত দেখতে পায়। ৬ঃ৪৫ মিনিটে একজন অপরিচিত লোক ঢুকে, আমার চোখের সামনে তাঁর মানিব্যাগ, ঘড়ি নিয়ে দ্রুত চলে যায়। সকাল সাড়ে সাতটার পর থেকে মানুষ মনির ভাইকে দেখতে আসে। সকাল সারে ১০ টায় জোহা’দার আসার খবর পেয়ে লুঙ্গি ও হাফ হাতা শার্ট পরে অফিসের নিচে মিষ্টির দোকানে বসা তাঁর কাছে সব কিছু খুলে বলি। তিনি আমাকে এই বিষয়ে কারো সাথে আলাপ করতে নিষেধ করেন, বলেন ক্ষমতাসীন বিএনপি আমার অনেক বড় ক্ষতি করতে পারে। আমাকে সাক্ষী রাখা হয়নি। মামলায় সবাই খালাস। আওয়ামী লীগ অফিসে মনির ভাইয়ের ‘শোক সভা’ করা দরকার। তা না হলে আমরাও খুন হলে কেউ মনে রাখবে না।
*পেছনের কথা*
১৯৮১ সালে নেত্রী যেদিন বাংলাদেশে আসেন, আমরা সবাই ১০০ ট্রাক নিয়ে এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে গিয়েছিলাম, চুনকা ভাই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, ট্রাক শ্রমিক নেতা আমিনুল ভাই সহযোগিতা করেছিল, চুনকা ভাই নিজে না গিয়ে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আপা এয়ারপোর্টে থেকে সরাসরি মানিক মিয়া এভিনিউতে এসে জনসভায় বক্তব্য রাখেন। জনসভা চলার আগে থেকে বৃষ্টি শুরু হয়, আমরা সবাই ‘কাক ভেজা’। নারায়ণগঞ্জ থেকে যে পরিমাণ মানুষ সেদিন গিয়েছিল তা ছিল জনসভার প্রায় অর্ধেক। ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়ার জন্য গৌতম তোমাকে আবারো ধন্যবাদ।
** এই বিশেষ দিনে আমরা তাকে স্মরণ করছি শ্রদ্ধাভরে**
পরম করুণাময়ের কাছে পার্থনা করছি তিনি যেন তাঁকে বেহেস্থ দান করেন। আমিন। আমি নিজেও বহুরার আক্রমণের শিকার হয়েছি, আমার জন্য দোয়ার দরখাস্ত রইল।
*আমাকে বিতাড়িত হলাম*
২৩ বছর আমাকে আওয়ামী লীগ করতে দেয়া হয়নি, আস্তে আস্তে সব কিছু জানতে পারবেন। কেমন আছেন শওকত ভাই? কেমন চলছে আপনার গড়া গাংচিল? নিউইয়র্কে আপনি শত শত বাংলাদেশীকে পুলিশে চাকরি করার সুযোগ করে দিয়েছেন, কেমন আছেন তারা? ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ ভাই।
**পাঠক প্রতিক্রিয়া**
সুভাষ সাহা
পরের দিন সকালে ঢাকার পুলিশ সুপার নামটা সম্ভবত ক্ষিতিশ চন্দ্র দে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে আসেন।সেখানে মনির ভাইয়ের পোস্ট মর্টেম হয়। সারা শহরে উত্তেজনা। খুনিদের পরিচয় চাপা থাকেনি। এ খুনের পর খুনিরা ‘হিরো’ হয়ে গেল! কারোই বিচার হল না….।
দেশের রাজনীতিতে খুনের সংস্কৃতি ৭৫ এর পর এভাবেই নতুন মাত্রা যোগ হতে থাকে। তুখোড় বক্তা মুনির ভাইয়ের মত নিরীহ একজন নেতাকে এভাবে খুন করা ছিল অবিশ্বাস্য।
* ফেসবুক প্রতিক্রিয়ায় Shahid Ullah লিখেন *
যোগ করতে চাই,,,,ঐদিন ২ তারিখে পাগলায় পলাশ সাহেবের পিতা ইদ্রিস সাহেবের সভাপতিত্বে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয় থানা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে।অতিথি ছিলেন রাজ্জাক ভাই ও তোফায়েল ভাই। মনির ভাই ছিলেন,জেলা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক।মনির ভাই বারবার বক্তব্য দেবার সুযোগ চেয়েছিলেন আমার কাছে। দু:খ হয় মনির ভাইকে সময়ের অভাবে কথা বলতে দিতে পারিনি, যার জন্য শহরে একসাথে আসার পথে তার কাছে মাফ চাই। দলীয় অফিসে গভীর রাতে জোহাদা আমাদেরকে বাসায় আসতে বল্লে মনির ভাই বলেছিলেন,তিনি অফিসেই নির্ঘুম থেকে সকালে খানপুর হতে মিশাল মিছিল নিয়ে হরতালে যোগ দিবেন। হ্যা,মনির ভাইকে শারীরিক ভাবে হরতালে পাইনি,তাঁর লাশ নিয়ে মিছিল করেছিলাম। আরেকটি ইতিহাস বলতে মন চায়, আইয়ুব খার পল্টন মিটিং বানচাল করার জন্য মনির ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা সামনের রশি টেনে দৌড়ে#আইলরে# বলে চলে গিয়েছিলাম। আল্লাহ তুমি অকুতুভয়ী মনির ভাইকে বেহেস্ত নসিব করো।আমীন।
*Gautam Roy লিখেন *
কামাল ভাই, সেদিন লাখো জনতার ভীড় ঠেলে আপার(নেত্রী শেখ হাসিনা) সেই গাড়ীতেই আমি দৌড়ে উঠেছিলাম এবং জাতীয় নেতাদের ভেতর ছিলাম ছাত্রলীগ পতাকা হাতে। কি ঝড় তুফান ছিল। ঢাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। আপার কান্নার কথা মনে হলে এখনো মন গুমড়ে কাঁধে।
চুনকা ভাইয়ের সেই নিতাইগঞ্জ বাড়ীটা অনেক স্মৃতি হয়ে আছে। মনে আছে ছাদে গনহারে লাল চায়ের ব্যবস্থা ছিল। কত আন্দোলন করেছি। মনে কি পড়ে, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা দিবসের নাম পাল্টিয়ে শুধু জাতীয় দিবস করতে চেয়েছিলেন। আমরা হরতাল করেছিলাম। চুনকা ভাই জিয়াকে সহ্যই করতে পারতেন না। এই সাহসী বীর নেতাকে সশ্রদ্ধ সালাম।
**
কামাল ভাই। সেই দিনটি আমি ভুলতে পারবো না। আপনি মনে রেখেছেন পুরোটাই। আমিও ছিলাম সেদিন। অফিস থেকে সবার সাথে বের হয়ে গেলাম। কিন্তু বাড়ী গেলাম না। অফিসের রাস্তার উল্টা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। অনেক পরে দেখি কিছু লোক অফিসের দিকে ঢুকছে। ওরা সময় বেশী নেয়নি। গুলি হলো। আমার সামনেই পুলিশ ছিল। ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিল। রাস্তায় ২/৪ জন মানুষ ছিল। আমি ভয়ে বাসায় গেলেও ঘুমুতে পারিনি। সকালে সব জানলাম। আপনি না বললেও পরের দিন মুখে মুখে নাম প্রচার হয়েছিল।
কিন্তু সনটা কি ১৯৮২ ছিল? না ১৯৮১?
* Kazi Nazmul Islam Babul *
সকালে মনির ভাইয়ের লাশ দেখে কান্নায় ভেংগে পড়েছিলাম।চাষাড়া রেল লাইনের পাশে স মিল থেকে কাঠের লাঠি নিয়ে আমরা মিছিল করে এমরানকে খুজেছিলাম।এখন ভাবি কাঠের লাঠ নিয়ে কত মনবল আমাদের ছিল।কামাল ভাই,নারায়নগন্জ আওয়ামীলীগে মনির ভাই অমর। উনার জন্য একটা অনুষ্ঠান করুন।

*Ajoy Chakraborty*
আমরা পরের দিনের পিকেটিং এর জন্য মনির ভাই এর নির্দেশে যার যার বাসায় চলে যাই। সকালে এসে দেখি মনির ভাই আর বেঁচে নেই।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: জাতীয়,নারায়ণগঞ্জের খবর,সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.