রবিবার ৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১৮ নভেম্বর, ২০১৮ রবিবার

খালেদার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি মাপার ব্যারোমিটার কি?

সুলতান মির্জা: বিএনপির এক নেতাকে মৌলিক একটি প্রশ্ন করেছিলাম, ‘আমি বিএনপিকে কেন ভোট দেবো?’ বিএনপির সেই নেতা উত্তরে বললেন: জনগণ পরিবর্তন চায়, এক সরকার বেশী দিন থাকতে পারে না। তাকে বললাম: জনগণ পরিবর্তন চায়, কিন্তু কেন? উত্তরে তিনি জানালেন: নিরাপরাধ নেত্রীকে জেলে ঢুকিয়ে দিলো।

জানতে চাইলাম, আর কোন কারণ আছে? উত্তরে তিনি বললেন, খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিলো, তারেক জিয়াকে সাজা দিলো। জিজ্ঞেস করলাম, আর কিছু? উত্তরে বললেন, বিএনপির নেতা কর্মীদের মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। জানতে চাইলাম, তারপর? তিনি বললেন, জনগণ এ থেকে মুক্তি চায়…।

প্রশ্ন, কোন সে জনগণ? তিনি বললেন, এ দেশের জনগণ। কারা তারা? ঠিক আছে এখানে আমরা পাঁচজন আছি, এই পাঁচজনের মধ্যে একটা জরিপ হয়ে যাক…। বললেন, আমি বাদে এরা সবাই তো আওয়ামী লীগার…।

বললাম, এরা তো জনগণের একটা অংশ, তাই না? উত্তরে আমতা আমতা করে কি বললেন তিনি বুঝিনি আর।

যে কথা বলছিলাম, ৮ ফেব্রুয়ারির আগে থেকে এখন পর্যন্ত টিভি টকশো’তে কিছু পরিচিত মুখ দেখছি, যারা প্রতিনিয়ত বিরতিহীনভাবে খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা বেড়ে গেছে টাইপের ওয়াজ নসিয়তে টকশো’র টেস্ট একেবারে টক করে তুলেছেন। এই এরাই কিন্তু ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারির আগে বা পর থেকে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে নানান ধোয়াশা গপ্পে টকশো মাতিয়ে রাখতেন, তারাও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান, তবে… কিন্তু…অথবা টাইপের শর্ত দিয়ে। অর্থ্যাৎ এই তারা সেই তারা যারা যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধীতা করেন, এখন খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ব্যারোমিটারের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছে।

ব্যক্তি আমি কোন নিরপেক্ষ ব্যক্তি নই, তবে বেগম খালেদা জিয়ার বিচার বিষয়ে আদালতের সকল সিদ্ধান্ত সেটা মুক্তি কিংবা সাজা আমার কোন মন্তব্য নেই। বিশ্বাস করি এবং দায়িত্ব নিয়েই বলতে পারি আদালতের বিচারের বিষয়ে আওয়ামী লীগের মিনিমাম হস্তক্ষেপ নেই। যদি থাকতো তাহলে খালেদার বিচারের রায় বের হতে ১০ বছর সময় লাগতো না, বঙ্গবন্ধুর বিচার শেষ করতে দ্বিতীয় মেয়াদ লাগতো না, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার এখনো কচ্ছপ গতিতে চলতো না। হলমার্ক, বেসিক, জনতা, শেয়ার কেলেংকারী-এইগুলো ভিন্ন প্রসঙ্গ। যেসব ভিন্ন প্রসঙ্গ সামনে এনে খালেদাকে দুধে ধোয়া তুলশি বানানোকে হাস্যকর রাজনীতি ছাড়া আর কিছুই মনে করি না। কেন, সেটা? একটু পরে বলছি…

তার আগে মূল পয়েন্টে কিছু কথা না বললেই নয়। খালেদার মুক্তির জন্য অহিংস আন্দোলন চলছে, এর ভ্যালু কি? আদালত অবমাননা নাকি খালেদার জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটার নিয়ন্ত্রণে রাখা- সেটা একটা প্রশ্ন।

বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক আর তাদের দলীয় কর্মীদের আহাজারি নিয়ে দুই চারটা কথা বলা প্রাসঙ্গিক। এরা আজকে খালেদার দুর্নীতির দুই কোটি সামান্য টাকার বিচারকে জাষ্টিফাই করছে হলমার্ক, বেসিক, জনতা আর শেয়ার বাজারের দিক নিয়ে। মোটেও বলছি না হলমার্ক, বেসিক, জনতা ও শেয়ারের বিচার চাই না।
তবে আরেকটু কম্পেয়ারিটিভ কথা বলতেই হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধে বিএনপি-জামায়াত ২০১৩ সালে মাত্র ছয় মাসেই দেশের ৫০ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ ছয় হাজার বিলিয়ন ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি করে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সেই সময়ের হিসাব অনুসারে, হরতাল-অবরোধের প্রতিটি দিন দেশের এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা (১৯২.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্ষতি হয়েছে।

এরপর ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধে দেশের ১.৫৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রাষ্ট্রীয় অর্থ ক্ষয় হয়, সোজা কথায় রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে বিএনপি জামায়াতের সহিংসতায় জনগণের যে সম্পদের ক্ষতি হয়েছে তা এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। এটার হিসাব আলাদা।যেহেতু অনেক মামলা চলমান আছে কাজেই এই বিষয়ে কথা বলার কিছু নেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, উক্ত আন্দোলনে বিএনপি জামায়াত রাষ্ট্রের যেসব আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতি করেছে তার পরিমান কি হলমার্ক, শেয়ার মার্কেট, জনতা, বেসিকের মোট পরিমানের চেয়ে বেশি না কম? আশা করি বিজ্ঞ টকশো আলোচকেরা এই প্রশ্নের একটা নৈতিক ব্যাখ্যা দিবেন। আবারো বলছি আমি যেমন হলমার্ক, জনতা, শেয়ার, বেসিকের বিচারে গলা ফাটাই, তেমনি ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের টাকা ক্ষতিপূরণ চাই। জানতে চাই, একজন নাগরিক হিসেবে এই ক্ষতিপূরণ চাওয়াটা অন্যায় কিনা?

একটি প্রশ্ন প্রায়ই করি, আসলে বাংলাদেশের জনগণটা কে? কাদের চোখে বা দৃষ্টিতে সামান্য দুই কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে রাতারাতি বিএনপি নেত্রী খালেদা এমন জনপ্রিয় হয়ে গেলেন?

দেখুন, শতাংশের ভিত্তিতে বিএনপির একশ্রেণীর ভক্ত আশেকান আছ, যারা আদর্শিকভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোর বিরোধী। তারপরও তাদের সামনে পড়লে বোঝা যায়, তারা চাপার জোরে বাংলাদেশের কত মঙ্গল কামনা করে একেকজনে ন্যূনতম প্রায় ডজনখানেক ফেক আইডি নিয়ে নানান হুমকি-ধামকি সহ মা ডেকে কেঁদে কেটে ফেসবুকে ফাইট করছে। সত্যিকার অর্থে এরা জনগগণ নাকি বিএনপি-জামায়াতপন্থী এই প্রশ্নের উত্তর সকলের খুঁজে দেখা উচিত বলে মনে করি।

তাছাড়া, মোটেও উস্কানি দিচ্ছি না, শুধু বলছি জামায়াত-বিএনপির ফেসবুক জরিপের অংশ হিসাবে মোট জনসংখ্যার ৮৫% লোকের সমর্থন যদি খালেদার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে, তাহলে এখনো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাকে কীভাবে? বিষয়টা বুঝেন? ১৬ কোটি কম বেশি রেজিস্ট্রার জনগণ। এর ৮ শতাংশ মানে বিষয়টা কী দাঁড়ায়? প্রায় ১৪ কোটি জনগণের সমর্থন, এই ১৪ কোটি জনগণ যদি একটা ফুঁ দেয়, তাহলে শেখ হাসিনা কেন খোদ ট্রাম্প প্রশাসনের ভিত্তিই তো নড়েচড়ে যেতে পারে, তাই না?

শেষ করার আগে বিএনপির জন্য দুইটা উপদেশ- খালেদার বাড়ি রক্ষা, তারেক জিয়ার দুর্নীতি রক্ষা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল, খালেদা জিয়াকে আদালত থেকে মুক্তি, এইসব ইস্যু হতে পারে বিএনপি-জামায়াতের অস্বিত্ব রক্ষা ও টিকে থাকার ইস্যু, কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের ইস্যু নয়। বাংলাদেশের জনগণের ইস্যু হলো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, চালের বাজার, তেল-গ্যাস- বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, পাঠ্যবইয়ে ছাগল উঠানো, সড়ক সংস্কার, যানজটসহ নানাবিধ অবকাঠামো উন্নয়ন।

জিজ্ঞেস করি এইসব ইস্যুতে আপনারা সিরিয়াস হয়েছিলেন কবে, কখন, কোথায়? রাষ্ট্রের সামান্য একজন নাগরিক হিসেবে জানতে চাই। তারপরে হিসেব করেন খালেদার জনপ্রিয়তা বাড়ছে নাকি আরো কমছে। শুধু একটা তোতা সরকারের অধীনের ভোট মানেই গণতন্ত্র বুঝায় না, গণতন্ত্র বুঝতে হলে আগে বাংলাদেশের কথা চিন্তা করুন, নাগরিক সমস্যা মাথায় ঢোকান, তারপর গণতন্ত্রের ছবক দেন। সূ: চ্যানেল আই

Categories: খোলা বাতায়ন

Leave A Reply

Your email address will not be published.