বুধবার ৪ আশ্বিন, ১৪২৫ ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বুধবার

নির্বাচনী রাজনীতি কোন পথে

প্রতীক ইজাজ: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র আট মাসের মতো বাকি। এরই মধ্যে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে দেশে। নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলোও। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এগিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায়। শেষপর্যন্ত বিএনপিও নির্বাচনে অংশ নেবে- এমন ধারণা সবার। এই দুই দলের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলগুলোও দরকষাকষি শুরু করেছে। চেষ্টা চলছে নির্বাচনী নতুন জোট গঠনের। নির্বাচন কমিশনও ডিসেম্বরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে।

অথচ নির্বাচনী মাঠের বর্তমান রাজনীতির গতিবিধি ঠিক বোঝা যাচ্ছে না এখনো। কোন পথে এগোচ্ছ তাও স্পষ্ট নয়। একদিকে দুর্নীতির দায়ে কারান্তরীণ খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার কথা বলছে বিএনপি। যদিও বিএনপি আশা করছে খালেদা জিয়া জামিন পাবেন ও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু দুর্নীতির কারণে কারাদন্ড হওয়ায় তার নির্বাচনে অংশ গ্রহণের বিষয়টি অনিশ্চিত। নির্ভর করছে আদালতের ওপর। জামিন পাবেন কি না আর পেলেও অন্যান্য মামলায় তাকে ঠিক কত দিন কারাগারে থাকতে হতে পারে, সেটিও নির্ভর করছে আদালতের ওপরই। আর শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না তাও অনিশ্চিত।

অন্যদিকে, সংবিধান মেনেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে চায় সরকার। সেক্ষেত্রে বিএনপির নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নের সমাধান কি হবে- তা বলা যাচ্ছে না। বিএনপি কি সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশ নেবে, নাকি ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন বয়কট করবে- তাও স্পষ্ট নয়। তবে সরকার যে সংবিধানের বাইরে যাবে না- তা সর্বশেষ গত সোমবারের সংবাদ সম্মেলনেও প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি, এবারও সময়মতো নির্বাচন হবে, কেউ ঠেকাতে পারবে না। বিএনপি নির্বাচনে আসুক না আসুক সময়মতোই নির্বাচন হবে, কেউ আটকাতে পারবে না। তিনি এমনও বলেন, নির্বাচন করা না-করা দলীয় সিদ্ধান্ত, কোনো দল নির্বাচনে না এলে আমাদের কিছু করার নেই।

আবার নির্বাচনী প্রস্তুতি ও প্রচারণায় দুই প্রধান দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রতিদ্ব›দ্বী বিএনপির অবস্থান এখনো ঠিক বিপরীতমুখী। মাঠে থেকে বেশ জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। গত বৃহস্পতিবারও প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নৌকার জন্য ভোট চেয়েছেন। অনেক আগে থেকেই মাঠে সরব দলটি। বিপরীতে বিএনপি ব্যস্ত খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে আইনি লড়াইয়ে। আগামীকাল রোববার শুনানিতে তিনি জামিন পাবেন কি না, কিংবা পেলেও অন্যান্য মামলায় কারান্তরীণই থাকতে হয় কি না- তার ওপর নির্ভর করছে বিএনপির পরবর্তী কর্মসূচি ও নির্বাচনী ভাবনা।

এমনকি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নে নির্বাচনকালীন সরকারসহ বিএনপির বিভিন্ন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সমাধানের কোনো আলোচনা এই মুহূর্তে নেই। সংবিধান অনুযায়ী, যদিও এসব দাবি অযৌক্তিক ও পূরণ সম্ভব নয়; তারপরও ঠিক কোন পথে সমঝোতা আসবে- সে নিয়েও কোনো আলোচনা রাজনীতিতে নেই। উল্টো খালেদা জিয়ার কারান্তরীণকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই মুহূর্তে পরস্পরকে দোষারোপের মধ্যেই রয়েছে। একদিকে আওয়ামী লীগ বলছে, খালেদার সাজার ঘটনায় সরকারের কোনো হাত নেই। কারণ মামলাটি সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সময় করা ও রায় দিয়েছেন আদালত। কিন্তু বিএনপির দাবি, সরকার খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখতে ও বিএনপিকে ভাঙতেই এই পথ বেছে নিয়েছেন।

অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এরই মধ্যে আশার আলো দেখছেন। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থাকবে না। ভোটের সময় ঘনিয়ে এলেই অবস্থা পাল্টে যাবে। বিশেষ করে বিএনপি নির্বাচনের মাঠে নেমে এলেই রাতারাতি অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটবে। তবে খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে আদালতের ওপর শ্রদ্ধা রাখতে হবে বিএনপিকে। নমনীয় হতে হবে। পরিস্থিতি বুঝে নির্বাচনে অংশগ্রহণটাই হবে যুক্তিযুক্ত।

এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না তা আদালতের ওপর নির্ভর করছে। পক্ষে-বিপক্ষে দুই ধরনের রায় রয়েছে। তবে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন আদালত। এর বাইরে সংবিধানের মধ্যে থেকেও নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলের নেতাদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যায়। সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে বিএনপিকেও এই সরকারে রাখা সম্ভব। টেকনোক্র্যাট কোটা বা উপনির্বাচনের মাধ্যমে ওই দলের প্রতিনিধিদের বিজয়ী করে আনলেই নির্বাচনকালীন সরকারে রাখা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে নমনীয় হতে হবে।

এদিকে, আগে থেকেই নির্বাচনী মাঠে থাকা আওয়ামী লীগ আরো সরব হয়েছে। এপ্রিল-মে-এর মধ্যেই একাদশ জাতীয় নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে চায় তারা। এ নিয়ে দ্রæত গতিতে কাজ করছে ক্ষমতাসীনরা। আগাম প্রস্তুতি নিতে তৃণমূল চষে বেড়াচ্ছে দলটির ১৫টি টিম। সভা-সমাবেশ করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জেলা নেতাদের মাঠ গোছাতে দেওয়া হয়েছে ডেডলাইন। চলছে নির্বাচনী মহাযজ্ঞ। লক্ষ্য মাঠ গুছিয়ে বিএনপি-জামায়াতের ‘নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র’ প্রতিরোধে প্রস্তুত থাকা।

দলের নেতারা বলেন, দশম জাতীয় সংসদের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই আগাম নির্বাচনী প্রস্তুতি ও বিএনপি-জামায়াতের ‘নির্বাচন বানচাল ষড়যন্ত্র’ প্রতিহতে প্রস্তুত থাকবে আওয়ামী লীগ। জুন থেকে নির্বাচনের আগমুহূর্ত (অক্টোবর) পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার চেয়ে সে সময় উদ্ভ‚ত পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় মোকাবেলার কৌশলে এগোচ্ছে দল।

এ ব্যাপারে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচন আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এ নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে। যেহেতু নির্বাচন অনেক প্রতিদ্বন্ধিদ্বতাপূর্ণ হবে তাই আমরা অনেক আগেই নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার কাজ শুরু করেছি।

অন্যদিকে, বিএনপির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের চেয়ে এখন বিএনপি ব্যস্ত দলের সাংগঠনিক অবস্থা ঠিক রাখতে। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের স্থায়ী কমিটির নেতারা দল চালাচ্ছেন। পরামর্শ নিচ্ছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দুর্নীতির দন্ড নিয়ে লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান।

দলের নেতারা বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ীই, দল চলবে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশমতো, সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকেই দল চালাচ্ছেন। এবার দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবেই খালেদা জিয়াকে কারাগারে প্রবেশ করতে হয়েছে। দলীয়প্রধানের কারাদন্ড হওয়ায় বিএনপির যতটা মারমুখী ভ‚মিকায় মাঠে নামার কথা, তার অংশবিশেষ পড়েনি। বিপর্যয় উত্তরণে বিএনপি নেতিবাচক পথ ছেড়ে ইতিবাচক পথে পা রেখেছে। আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার টার্গেটসহ দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিএনপি। অবশ্য দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও দলের নির্বাহী কমিটির সভায় এবং সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তারা কোনো সংঘাতের রাজনীতি বিশ্বাস করেন না।

দলীয় সূত্রমতে, খালেদা জিয়াকে মুক্ত ও নির্বাচনকালীন সরকারসহ নির্বাচনী দাবি দাওয়া পূরণের পথে হাঁটছে দল। দলের নেতারা মনে করছেন, খালেদা জিয়া জামিন পাবেন ও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে রাজনীতির মাঠ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোন ধরনের সহিংসতার দিকে যাবে না দলটি।

এ ব্যাপারে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি অতীতেও এ ধরনের সংকটে পড়েছিল। দল ভাঙনের মুখে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ রায়ে খুব বেশি অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়বে না বিএনপি। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করেই নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি। খালেদা জিয়াকে ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: খোলা বাতায়ন

Leave A Reply

Your email address will not be published.