বুধবার ৩০ কার্তিক, ১৪২৫ ১৪ নভেম্বর, ২০১৮ বুধবার

অনিমা ক্লিনিক্যালি মৃত:ছিনতাইকারীর হেঁচকা টানে ডা.নৃপেনের সংসার তছনছ

ডা. তারিক রেজা আলী: ছিনতাইকারীর হেঁচকা টানে রাস্তায় পড়ে যাবার ঠিক আগমুহূর্তে অনিমা বৌদি কি চিন্তা করছিলেন? অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও সকালে উঠে স্নান করেছেন, পূজা করেছেন, স্বামী-সন্তানের জন্য খাবার তৈরি করেছেন, এরপর রওনা দিয়েছেন নিজের কর্মস্থল ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের দিকে। তাঁর স্বামী ডা. নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস নাম করা ইএনটি চিকিৎসক, আমাদের বন্ধু, কাজ করেন একই মেডিকেল কলেজে। বৌদি নিশ্চয়ই চিন্তা করছিলেন দুপুরে বাড়ী এসে কি রান্না করবেন, মেয়ে ভর্তি হয়েছে মেডিকেল কলেজে, সে বাড়ী এসে কি খাবে।

অথবা ছেলেটা কেবল ক্লাস সেভেনে পড়ে, তার পছন্দের কি কি খাবার থাকবে টেবিলে। আমরা কেউ জানি না বৌদির মনে কি খেলা করছিলো। আনমনা ছিলেন নিশ্চয়ই তিনি। সকালের শীতের বাতাসে অটোরিকশাতে কি তাঁর শীত লাগছিলো? আমরা এসব প্রশ্নের কোন জবাব পাব না আর কোনদিন। কারণ, ছিনতাইকারীর টানে রাস্তায় পড়ে গিয়ে মাথায় এমন মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন, সাথে সাথেই সঙ্গা লোপ পেয়েছে তাঁর। এখনো ফেরে নি। আর কখনো ফিরবে এমন আশাও নেই। বৌদি কে ক্লিনিক্যালি মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করছে ছেলে আর ছেলের বাবা। আমরা কি কল্পনা করতে পারি এখন তাদের মনের অবস্থা কিরকম । হায়, এর পর এই ঘটনা যে ঘটবে আপনার আমার সাথে, আমরা কি সে সম্পর্কে একটুও সচেতন?

নৃপেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী, আমাদের বৌদি কে এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় এনেছে। ও একজন চিকিৎসক। আমলা নয়, পুলিশ নয়। সমাজের বড় ও ক্ষমতাধর মানুষদের থেকে অনেক দূরে থেকে জীবনটাকে গড়ে তুলেছে সে। কর্মজীবনের প্রথম থেকে বৌদি সারাক্ষণ পাশে থেকেছে। দু’হাত ভরে শুধু দিয়েছেন তিনি। রাজধানী থেকে অনেক দূরে ছোট্ট শান্ত শহরে তিলতিল করে গড়ে তুলেছে তারা তাদের সুখের সংসার। বহু কষ্টে কিনেছে একটা ফ্ল্যাটবাড়ি। এইতো মধ্যবিত্তের চাহিদা। এখন তাদের সুখের দিন এসেছিল। কি সহজে এক লহমায় সব সুখের বাতি এক ফুঁৎকারে নিভে গেল। ঐ ছিনতাইকারী হয়তো কোনদিন জানতেও পারবে না, কত বড় ক্ষতি করে দিলো তারা এই পরিবারের।
যেহেতু নৃপেন একজন ছাপোষা চিকিৎসক, তার বৌ এর এরকম মর্মান্তিক ঘটনার কোন প্রচার হয় নি। অন্য সময় অন্য কারো ক্ষেত্রে ঘটলে নিশ্চয়ই আরো প্রচার হতো, পত্র-পত্রিকা থেকে সামাজিক মাধ্যম আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া সরগরম থাকতো। বৌদি কে হয়তো সরকারি খরচে বিদেশে পাঠানো হতো। হয়তো বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দিতেন অপরাধীদের কে ধরতে। হয়তো তারা ধরাও পড়তো।

আমরা জানি এসবের কিছুই হবে না। না হোক। আমাদের কিছু যায় আসে না। পৃথিবীর কোন শক্তিই আর আমাদের বৌদিকে ফেরাতে পারবে না। অপরাধী ধরা পড়লেই আমাদের কি লাভ। তারা কি আর একজন দুজন। অসংখ্য। আগামীকাল একই ঘটনা আমাদের সাথে ঘটানোর জন্য আরো অনেক সন্ত্রাসী রান্নাঘরে প্রস্তুত আছে।

তারপরেও বিবেক বলে একটা জিনিষ আছে। সে বারবার বলছে, প্রতিবাদ কর। দেখ না কি হয়। একবার গলা ফাটিয়ে বলোই না, “অনিমা ভৌমিক হত্যার বিচার চাই”। তাই এই অপচেষ্টা। আসুন না, জানি কিছুই হবে না, তাও সবাই একবার বলি এই নীরিহ একজন মানুষের এ রকম অপঘাতে মৃত্যু মানি না, মানতে পারি না। যারা ক্ষমতার শীর্ষে আছেন, আপনাদের কে দায়িত্ব নিতে হবে, আমরা সাধারণ মানুষ যেনো এরকম ঘটনার শিকার না হই, ছেলে-পুলেকে বড় করে সংসার জীবন শেষ করে স্বাভাবিক মৃত্যুর মাধ্যমে যেনো বিদায় নিতে পারি এ পৃথিবী থেকে।

লেখক:সহকারী অধ্যাপক , রেটিনা। বিএসএমএমইউ।

Categories: খোলা বাতায়ন

Leave A Reply

Your email address will not be published.