শুক্রবার ৬ আশ্বিন, ১৪২৫ ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শুক্রবার

ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে না’গঞ্জের ভূমিকা

রনজিৎ মোদক: ভাষা আন্দোলন নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে স্বরণীয় ও বরণীয় এক অধ্যায়। নারায়ণগঞ্জ থেকে ২০ কিঃমিঃ অদূরেই অবস্থিত ঢাকা জেলা, তাই পার্শ্ববর্তী জেলা হিসেবে আন্দোলনে সংগ্রামে রাষ্ট্র ভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ এবং অগ্রনীভূমিকায় ছিলো নারায়ণগঞ্জবাসী। তৎকালীন ছাত্রনেতা শামসুজ্জোহা, বজলুর রহমান, বদরুজ্জামান, মফিজ উদ্দিন, হাবিব রশিদ, সুলতান মাহমুদ মল্লিক, কাজী মজিবুর, শেখ মিজান ও এনায়েত নগরের শামসুল হক প্রমুখের নের্তৃত্বে ভাষা আন্দোলনে স্বক্রিয় ভূমিকা নিতে সক্ষম হন। এখনও এ অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে অমরত্ব ধারন করে প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রভাতফেরীতে অংশগ্রহন করেন।

১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হয় এবং ভারতবর্ষকে ২ ভাগে বিভক্ত করা হয়। ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নের উদ্ভব হয়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে প্রথম ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে একটি মিছিলও বের করা হয়। ১৯৪৮ সালের ২৩শে জানুয়ারি পাকিস্তানে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে বাংলাভাষা স্বীকৃতি না পাওয়ায় ২৬শে জানুয়ারি ঢাকায় সমস্ত প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও মিছিল বের করা হয়। বিকালে একটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২রা মার্চ “রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ” নামে একটি সর্বদলীয় পরিষদ গঠন করা হয়। ১১ই মার্চ সমগ্র পূর্ব বঙ্গে সাধারণ ধর্মঘট আহবান করা হয়।

এই ধর্মঘটে নারায়ণগঞ্জের ছাত্র সমাজ বিপুলভাবে সাড়া দেয়। তৎকালীন ছাত্রনেতা শামসুজ্জোহা, বজলুর রহমান, বদরুজ্জামান, মফিজ উদ্দিন, হাব্বির রশীদ, সুলতান মাহমুদ মল্লিক, কাজী মজিবর ও শেখ মিজান প্রমুখ এর নেতৃত্বে একদল ছাত্রকর্মী তখনকার ফুড অফিসে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ছাত্রদের এ বিক্ষোভের সংবাদ পেয়ে পুলিশ তাদেরকে হটিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এই খবর পেয়ে খান সাহেব ওসমান আলী এবং আলমাছ আলী সেখানে ছুটে যান।

নারায়ণগঞ্জের সমস্ত স্কুল-কলেজে ধর্মঘট পালন করা হয়। রহমত উল্লাহ ক্লাবের সম্মুখে তারা মিলিত হয়। ওই স্থানে শামসুজ্জোহার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন- বজলুর রহমান, সুলতান মাহমুদ মল্লিক, শামসুল হুদা ও মোস্তফা সারওয়ার। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবসকে সফল করার জন্য নারায়ণগঞ্জে ছাত্রসমাজ পোস্টার ও হ্যান্ডবিল ছাপিয়ে বড়সড় প্রস্তুতি গ্রহন করে এবং দেয়ালে দেয়ালে রাষ্ট্রভাষার স্লোগান লিখে দাবি জানান। নারায়ণগঞ্জের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি গোপন বৈঠক হয় বঙ্গবন্ধু রোডস্থ আবু বিশ্বাস সাহেবের বাড়ীতে। সেখানেও ২৫/৩০ জন পুলিশের উপস্থিতি ঘটে তবে পুলিশের সাথে তাদের কথা হয় তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করবে ফলে তাদের গ্রেফতার না করে চলে যায় পুলিশ। ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশ গুলি চালানোর কারণে রফিক, বরকত, সালামসহ অনেকে শহীদ হয় এবং আহত হয়। এই সংবাদ নারায়ণগঞ্জে ছড়িয়ে পড়লে নারায়ণগঞ্জের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এতে ছাত্র-শ্রমিক সবাই অংশগ্রহন করে। চাষাড়ার মাঠে (বর্তমান তোলারাম কলেজ) সামনে এক বিশাল প্রতিবাদ জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভার একপর্যায়ে পুলিশ তাদের ওপর আক্রমন করে ছত্রভঙ্গ করে এবং বেশ কিছু আন্দোলনকারী ছাত্রনেতা গ্রেফতার হয় তাদের উপর নির্যাতন চালায় পুলিশ। এই নির্যাতন থেকে ওসমান আলী এম,এল,এ, সহ মহিলারাও বাদ যায়নি। যাদেরকে বন্দী করা হয়েছিল তাদেরকে প্রায় দেড়/দুই বছর পর জেলখানা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধেও এক বলিষ্ট ভূমিকা ছিল নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলাধীন সুসংঘঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার এম,এ গনি, মোহাম্মদ আলী, মোঃ নাসির উদ্দিন, মহিউদ্দিন রতন, নুরুল ইসলাম, মোঃ সামসুল হক, মমিনুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। ফতুল্লার পঞ্চবটিতে ডালডার মিল নামের এলাকা ছিল পাকসেনাদের দখলে। প্রতিরাতে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে যমুনা জেটির কাছে নিয়ে আসত এবং গুলিবর্ষন করে হত্যার পরে লাশগুলো বুড়িগঙ্গা নদীর জলে নিক্ষেপ করে ভাসিয়ে দেওয়া হতো জানা যায়। মুক্তিযোদ্ধা দুলাল ও আমিনুর ডিক্রিরচর ও কানাইনগরে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি শক্তিশালী গ্রুপ তৈরী করেন। বাবুরাইলের মুক্তিযোদ্ধা শরিফুল আশ্রাফ যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্ব দেখাতে সক্ষম হন। শুধু ভাষা অন্দোলনেই নয় মহান মুক্তিযুদ্ধেও নারায়ণগঞ্জবাসীর ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ ।
মোবাইল : ০১৭১১৯৭৪৩৭২

Categories: খোলা বাতায়ন

Leave A Reply

Your email address will not be published.