শুক্রবার ৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ শুক্রবার

আজ বসন্ত, কাল ভালোবাসা

কাজী আনিসুল হক ॥ ‘শীতের অলস বেলা/ পাতা ঝরার খেলা/ ফাগুনে পরে সাজ / ফুল-বধূর’ জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ভাষায় বসন্ত সাজ পরেছে এখন প্রকৃতিতে। আবার কবি বলেছেন-এলো বনান্তে পাগল বসন্ত/ বনে বনে মনে মনে রং সে ছড়ায় রে,চঞ্চল তরুণ দুরন্ত/ বাঁশীতে বাজায় সে বিধুর পরজ বসন্তের সুর/পান্ডু-কপোলে জাগে রং নব অনুরাগে/ রাঙা হল ধূসর দিগন্ত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘আহা, আজি এ বসন্তে/কত ফুল ফোটে, কত বাঁশি বাজে/কত পাখি গায়।’ বছর ঘুরে আবার এলো ফুল ফোটার দিন। আজ মঙ্গলবার। পহেলা ফাল্গুন। শীতের আদ্রতা মুছে প্রকৃতিজুড়ে সাজ সাজ রব। প্রকৃতিতে জেগে উঠেছে নতুন জীবনের ঢেউ। নীল আকাশের সোনাঝরা আলোর মতোই আন্দোলিত হৃদয়।
গাছের পাতা ঝরতে শুরু করেছে আরও কয়েকদিন আগেই। ইট-পাথরের নগরিতে শোনা যাচ্ছে কোকিলের কুহুতান। আর শীতের খোলস পাল্টে প্রকৃতি তার রূপ বদলাতে শুরু করেছে তারও আগে। আজ বসন্তের প্রথম দিন। অমর একুশে গ্রন্থমেলায়ও এর দোলা লাগবে। আজ মেলায় থাকবে বাসন্তী রঙের উৎসব। তরুণীরা এ রংয়ের পোশাক আর গাঁদা ফুলে নিজেদের সাজিয়ে মেলায় আসবেন। তরুণরা পরবেন বাসন্তী রংয়ের পাঞ্জাবি-ফতুয়া। আর ফাল্গুনের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ বুধবার মেলায় থাকবে ভালোবাসার পরশ। কারণ, দিনটি ভালোবাসার মানে ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’। প্রেমিকযুগল হাতে হাত ধরে শহরে নানা জায়গায় ঘোরাঘুরি শেষে আসবেন বইমেলায়। মনের মানুষটিকে লাল গোলাপের সঙ্গে উপহার দেবেন প্রিয় লেখকের বই। এদিন মেলা রাঙাবে লাল রংয়ে। দু’দিনই মেলায় থাকবে উৎসবের আমেজ।
আজ পহেলা ফাল্গুন হলেও মেলায় বসন্তের আমেজ শুরু হয়ে গেছে আগে থেকেই। শীতের শেষ বেলায় মেলায় আসা বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষের পোশাক সাজসজ্জায় ছিল বসন্তের আবহ। বাসন্তী রংয়ের শাড়ি পরে ঘুরছিল একদল তরুণী।
পহেলা ফাল্গুন ও ভ্যালেন্টাইন্স ডে লেখক-প্রকাশকদের জন্যও দুটি কাঙ্খিত দিন। কারণ এ দু’দিনেই প্রচুর পাঠক সমাগম হয়। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে বই বিক্রি।
পহেলা ফাল্গুন ও ভ্যালেন্টাইন্স ডে কেমন হবে মেলায় জানতে চাইলে জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম বলেন, আসলে আমাদের দেশে মানুষের উৎসব-আনন্দে যাওয়ার জায়গা খুব বেশি নেই। বইমেলা আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম উৎসব। তাই পহেলা ফাল্গুন ও ভ্যালেন্টইন্স ডে-তে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে বইমেলায় আসবেন এটাই তো স্বাভাবিক। এ দুটি দিন মানুষের পদচারণায় মুখর হবে মেলা প্রাঙ্গণ।
বসন্তের প্রথম দিনে আজ নানা আয়োজনে আলোড়িত হবে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন প্রান্তের বাংলার ভাষাভাষী মানুষ । তরুণ-তরুণীরা বইমেলা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, চারুকলার বকুলতলা মাতিয়ে রাখবে সারা দিন। নগরীর বিভিন্ন উদ্যান, খাবারের দোকানগুলো মুখর থাকবে। মোবাইল ফোনে এসএমএস আদান-প্রদান, ফেসবুক, টুইটার প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শুভেচ্ছা জানানোর মধ্য দিয়ে বরণ করা হবে ঋতুরাজ বসন্তকে।

বসন্তের প্রকৃত রূপ দেখা যায় গ্রামে; শহরে তেমন নয়। ষড়ঋতুর দেশে আবহমান গ্রামবাংলার প্রকৃতিতেই মূলত বসন্ত জানান দেয় তার আগমনী বারতা। গ্রামের মেঠো পথ, নদীর পাড়, বৃক্ষরাজি, মাঠভরা ফসলের ক্ষেত বসন্তে রঙিন হয়ে ওঠে। নিসর্গের বর্ণচ্ছটায় প্রকৃতি হয়ে ওঠে বাঙ্ময়। কচি পাতায় আলোর নাচনের মতোই তখন বাঙালির মনে দোলা লাগে, হৃদয় উচাটন হয়।

বসন্তের সাজে আজ মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হবে। প্রীতির বন্ধনে আপন মহিমায় খুঁজে নেবে বসন্তকে। সেই মিলনের তাগিদে আজ সারা দিন দেশের নানা প্রান্তে বসন্তবরণে মেতে উঠবে জাতি।

কর্মসূচি : নাচ, গান ও কবিতাসহ নানা বর্ণাঢ্য আয়োজনে বসন্ত বরণ করবে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদ। দীপন সরকারের গিটারে বসন্তবাহার যন্ত্রসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সকাল ৭টায় চারুকলার বকুলতলায় শুরু হবে এই উৎসব। উৎসবের উদ্বোধনী পর্বে থাকবে বসন্ত কথন পর্ব, আবির বিনিময়, রাখিবন্ধন, ধ্রুপদি, দলীয় নৃত্য ও দলীয় সংগীত। বরেণ্য শিল্পীদের অংশগ্রহণে একক আবৃত্তি ও একক সংগীত পরিবেশন। এ পর্ব শেষ হবে সকাল ১০টায়। এরপর বিকেল সাড়ে ৩টায় একযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলা, লক্ষ্মীবাজারের বাহাদুরশাহ পার্ক, ধানমণ্ডি ৮ নম্বর রোডসংলগ্ন রবীন্দ্রসরোবর উন্মুক্ত মঞ্চ এবং উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টর রবীন্দ্র সরণির উন্মুক্ত মঞ্চে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে এই আয়োজন। শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করেছে তিন দিনের বসন্ত উৎসব। আজ সকাল ১০টায় এ উৎসব শুরু হবে নন্দন মঞ্চে।

বিষেরবাঁশী.কম/ হীরা

Categories: জাতীয়,সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.