শনিবার ৭ আশ্বিন, ১৪২৫ ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শনিবার

প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষা নিয়ে বানিজ্য আর কতদিন?

রনজিৎ মোদক: সরকার শিক্ষিতের গড় সংখ্যা ও শিক্ষার মান উন্নয়ন বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি জেলায় বিশ্ব বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছেন। বে-সরকারী ও আধা সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহে শিক্ষার্থী ভর্তির নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ভর্তির টাকা যোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছে অভিভাবক শ্রেনী। অপর দিকে অনেক ছাত্র-ছাত্রী ইচ্ছা থাকা সত্বেও অর্থাভাবে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শহর ও শহর তলীর বিদ্যালয় সমূহে নানা অযুহাতে বিভিন্ন খাত দেখিয়ে সেশন ফি বাবদ প্রতি ছাত্র-ছাত্রী থেকে দুই থেকে আড়াইহাজার টাকা আদায় করে নিচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিষয়গুলো কতটুকু অবগত বা এই আইনানুগ কি ব্যবস্থা গ্রহন করছে তা নিয়ে ভূক্তভোগীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষা মানুষের অধিকার। শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর শিক্ষা হচ্ছে জাতির মেরুদন্ড। সেই মেরুদন্ডের কোথাও ঘুন ধরলে জাতি অন্ধকারে নিমজ্জ্বিত হয়ে পড়বে নিশ্চিত ভাবে। বিশ্বের সাথে তাল রেখে শিক্ষার হার ও মান উন্নয়নে বর্তমান আওয়ামীলীগ তথা মহাজোট সরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহন করেছে। ইতিমধ্যে প্রথম শ্রেনী থেকে নবম শ্রেনী পর্যন্ত বিনামূল্যে বই বিতরণ, দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান, জিপিএ ভিত্তিক ফলাফলের ভিত্তিতে শহরের মানসম্পন্ন মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে অনেকেই সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

অপরদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেনীর সমাপনী পরীক্ষা এবং অষ্টম শ্রেনীতে জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষার প্রতিযোগিতার জন্য উৎসাহ প্রদান করছে। পাশাপাশি অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের প্রতি বিশেষভাবে নজর দিচ্ছে। এই সুযোগকে পুঁজি করে এক শ্রেনীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকমন্ডলী নিজেদের আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাধ্যতামূলক কোচিং বানিজ্য করে যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তার আশেপাশে রুম কিংবা বাসা ভাড়া করে এই বানিজ্য করে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য নারায়ণগঞ্জ মর্গ্যান বালিকা বিদ্যালয়ে গত দশম শ্রেনীর টেস্ট পরীক্ষায় ১৭৫জন পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়। পরবর্তীতে পরীক্ষার্থীরা আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠান ভাংচুর করে এবং এই আন্দোলনে অভিভাবক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। এবং তারা অভিযোগ করেন তাদের সন্তানরা কোচিং না করায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের অকৃতকার্য দেখানো হয়েছে। যাতে আগামীতে কোচিংয়ের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। অকৃতকার্য ছাত্রীরা যখন আত্মহত্যার হুমকি দেয়। তখন জেলা প্রশাসক বিষয়টি বিবেচনা সাপেক্ষে তাদেরকে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ করে দেন। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ জেলার সকল থানায় এই ব্যবসা চালু আছে।

তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ৭৫ ভাগ পরিবার তাদের সন্তানকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারছেনা। এদের মধ্যে যারা তাদের সীমা অতিক্রম করে এগিয়ে আসছেন তারা শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা বিক্রির শিক্ষকদের হাতে। অর্থলোলুপ শিক্ষা গুরুর মাসিক টাকা পরিশোধে অনেক ছাত্র-ছাত্রী তাদের শ্রদ্ধার পুষ্প দিতে না পেরে লজ্জ্বায় শিক্ষা এবং শিক্ষক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কথায় আছে “বিদ্যা বিনয় দান করে”। এই নীতিবাক্য আজ অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। এসবের কারণ, প্রকৃত শিক্ষার অভাব প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে যা যা প্রয়োজন তার অনেক কিছুই এখনও অনুপস্থিত।

তাছাড়াও পশ্নপত্র ফাঁস নতুন কিছু নয়। তবে ইদানীং এই ফাঁসের ঘটনাটি বেড়েছে। পাবলিক পরীক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর আসছে সংবাদমাধ্যমে। দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম নিয়ে এক অনৈতিক খেলায় মেতে উঠেছে কতিপয় ব্যক্তি, গোষ্ঠী। যাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে আগামী প্রজন্ম।

সম্ভবত, ১৯৭৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় দেশে প্রথম প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। তখন ওই ঘটনা ছিল সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। আর গত চার-পাঁচ বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি একেবারে সাধারণ একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাপারটা যেন এমন, পরীক্ষা হচ্ছে তো প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই ধারণা সাধারণ মানুষদের জন্য যতটা না ক্ষতিকর তার চেয়ে হাজার হাজার গুণে বেশি ক্ষতিকর- যে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে তার জন্য।

বিগত ২০১১ সালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় সমাজসেবা দিবস ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে, প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মানুষের দোড়গোড়ায় শিক্ষার সুযোগ পৌছে দেওয়ার জন্য দেশের প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। সেই প্রতিশ্রুতির আলোকে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠিান এবং শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে বলে সাধারণ মানুষ আশা করেন। কিন্তু বেসরকারী-আধা সরকারী ও উচ্চ মাধ্যমিক এমনকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ অনেকটা অর্থ রোজগারের প্রতিষ্ঠানে রূপ নিচ্ছে। এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষালয় না বলে শিল্প প্রতিষ্ঠান বললে অনেকের গাত্রদাহ হবে।

এবিষয় নিয়ে স্থানীয় বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সাথে আলাপ করা হলে তারা জানান, একই সিলেবাসে সরকারী এবং বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান করানো হয়। কিন্তু সরকারী এবং বেসরকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্যের শিকার। যার ফলে বেসরকারী শিক্ষকদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। সরকারী এবং বেসরকারী শিক্ষদের বেতন বৈষম্য কবে দূর হবে তা কে জানে? আর এই কারণেই কি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ অর্থ রোজগারের প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপ নিবে?

শিক্ষক, অভিভাবক, ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষার মান নিয়ে বিচার বিশ্লেষণপূর্বক সেশন ও মাসিক ফি নির্ধারণ প্রয়োজন। এবিষয়ে শিক্ষা বিভাগ কিংবা সরকার থেকে বিধি-বিধান থাকা প্রয়োজন বলে ভূক্তভোগী মহল মনে করেন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।

Categories: খোলা বাতায়ন

Leave A Reply

Your email address will not be published.