রবিবার ৬ ফাল্গুন, ১৪২৪ ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রবিবার

নাঃগঞ্জ নাট্য সংগঠনগুলো ঝিমিয়ে পড়ছে।। হারিয়ে যাচ্ছে নাট্যশিল্পীরা

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: প্রগতিশীল নাট্যচর্চা সামাজিক অবক্ষয় রোধে সহায়ক। এক কথায় নাটক হচ্ছে সমাজের দর্পণ। নারায়ণগঞ্জে সরকারি বা বেসরকারি সংস্থাগুলোর সাহায্য সহযোগিতার অভাবে নাট্য সংগঠনগুলো ঝিমিয়ে পড়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের প্রান কেন্দ্র চাষাড়া জিয়া হল ও আলী আহম্মদ চুন্কা পাঠাগার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় নাটক মঞ্চস্থ একেবারেই হচ্ছে না। লোক চক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে যাচ্ছে এক কালের নাট্য শিল্পীরা। শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেষা নারায়ণগঞ্জ শহর। এখানে শিল্প-বানিজ্যের পাশাপাশি সাহিত্য-নাট্য চর্চায় মুখরিত ছিল। নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী আলী আহম্মদ চুন্কা পাঠাগার মিলনায়তন ও জিয়া হলে প্রতি সপ্তাহেই সাহিত্য সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাটক মঞ্চস্থ হতো।

তাছাড়া প্রতিদিন বিকাল হলেই মঞ্চ নাট্য শিল্পীদের সমাগমে মুখরিত হয়ে উঠতো আলী আহম্মদ চুন্কা পাঠাগার মিলনায়তন ও জিয়া হল। চলতো নাটকের রিহার্সেল ও মহড়া। লবনাক্ত চোখের জল নাটকের লেখক রফিকুল হকের নাটকটি আজও স্মরণ রেখেছে দর্শক। নারায়ণগঞ্জের নাট্য সংগঠনগুলোর মধ্যে খন্দকার আব্দুল মজিদ’র চৈতন্য নাট্য গোষ্ঠি, জামাল উদ্দিন সবুজ’র চৈতন্য সমাজ উন্নয়ন শিল্পী গোষ্ঠি, বিশ্বনাথ বিশ্বাস’র নাট্যালাপ, বাহাউদ্দিন ভূলু’র জনেজন নাট্য সম্প্রদায়, ওবায়দুর রহমান লিটন’র দর্পণ থিয়েটার, তমিজ উদ্দিন রিজভী’র নারায়ণগঞ্জ থিয়েটার, এম এ হামিদ’র মাসদাইর থিয়েটার, আশরাফুজ্জ্বামান’র পথিকৃত নাট্য গোষ্টি, ছানাউল্লাহ’র সংসপ্তক থিয়েটার, রহমত উল্লাহ ভান্ডারী’র ফাজিলপুর থিয়েটার, আনিসুল ইসলাম ছানী’র নারায়ণগঞ্জ নাট্য সম্প্রদায়, এস এম ইকবাল রুমী’র সাম্মী থিয়েটার, ফজলুল হক পলাশ’র ফতুল্লা নাট্য চক্র, ফিরোজ ইরাকি’র ফতুল্লা শিল্প নগরী নাট্য সংসদ, সামছুল হক’র আলীগঞ্জ থিয়েটার, শফিক সাদেকী’র চমক নাট্য গোষ্ঠি, জুয়েল চৌধুরী’র জিনিয়া নাট্য সংগঠন, নারায়ণগঞ্জ জেলা নাট্য সংস্থা, কেন্দ্রীয় নাট্য সংস্থা, ফতুল্লা নাট্যগোষ্ঠি, উর্মী নাট্য গোষ্ঠি, শ্রাবন নাট্য সংস্কৃতি, ঐকিক নাট্য সংগঠন। সরকারী-বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এসব নাট্য সংগঠনের কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে। অনেকটা বিলুপ্তের পথে। বিভিন্ন নাট্যশিল্পীদের সাথে আলাপ করলে জানাযায়, সংগঠনগুলো বিলুপ্তির মূল কারণ হচ্ছে স্থায়ী মঞ্চ না থাকা। এবং সরকারকর্তৃক শিল্পীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করা। একসময় দেখা গেছে, প্রতিবছর নাঃগঞ্জ জেলায় সপ্তাহ ব্যাপী নাট্য প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। প্রায় এক যুগ ধরে শহরে এধরনের কোনো প্রতিযোগিতা আয়োজন হয়না। যে কারনে শিল্পীরা অনুৎসাহিত হয়ে পড়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা মরহুম ফয়েজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জের নাট্য সাহিত্য জগতে একজন উৎসাহিত ব্যাক্তি হিসেবে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন। এদিকে নাট্য শিল্পী নাট্য প্রেমিক শান্তি রঞ্জন মুখার্জি এই শহরে রিকশা দিয়ে বাসায় ফেরার পথে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান। শান্তি রঞ্জন মুখার্জির শূন্য স্থান শূন্য হয়েই রয়েছে। আশির দশকের সেই সব নাট্য প্রেমিক মারা যাওয়ার পর তেমন আর নাটক জমে উঠেনি নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জ জেলা শিল্প একাডেমির উদ্যোগে বার্নিক নাটক প্রতিযোগিতায় সর্বমোট সাতটি নাট্য সংগঠন অংশগ্রহন করেন।

স্ববর্ণ থিয়েটার নারায়ণগঞ্জ গত ২০০৭ সালের ২৪শে আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আবদুল্লাহ আল মামুন এর “মেরাজ ফকিরের মা” নাটকটি মঞ্চস্থ করা হয়েছিলো। অবক্ষয়ের যুগে সত্যি বলতেকি (নারায়ণগঞ্জ) আলী আহম্মদ চুন্কা পাঠাগার মিলনায়তনে দর্শকের কমতি ছিল না। হাউজফুল পরিবেশে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিলো। সৌভাগ্যক্রমে সেই নাটকের দর্শক হিসেবে আমিও উপস্থিত ছিলাম। নাটক শেষে নাট্য শিল্পী মহসীন ও কাজী মোশারফ হোসেনের সাথে গ্রীণ রুমে কথা হলো। মহসীন “মেরাজ ফকিরের মা” নাটকে মোজাহের মন্ডল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। একপর্যায়ে নাট্য জগত নিয়ে কথা হলে, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে স্থানীয় নাট্য সংগঠনগুলো ঝিমিয়ে পড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন।

নাট্য পরিচালক বিশ্বনাথ বিশ্বাস বলেন, গত ৪০ বছর যাবৎ নাট্যালাপ নামে নাট্য সংগঠনের সাথে জড়িত আমি। নাট্যালাপ স্থাপিত হয় ১৯৭৬ সনে । সারা বাংলাদেশে ১৯৭৭ সনে নাটকের পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় ২য় স্থান অধিকার করেন বিশ্বনাথ বিশ্বাস। প্রথম নারায়ণগঞ্জে ১৯৭৯ সালে পৌর পাঠাগার প্রদর্শনী টিকেটের বিনিময়ে প্রতি সপ্তাহে “সূর্য উদয়ের গন্ধ” নাটক মঞ্চস্থ হতো।

ফতুল্লা ডিআইটি মাঠে অস্থায়ী মঞ্চে প্রায় ২০ বছর পরে ফতুল্লা রিপোর্টার্স ক্লাবের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক “ফুলজান সমাচার” মঞ্চস্থ হয়, ফজলুল হক পলাশের পরিচালনায়। নাট্য প্রেমিক ফজলুল হক পলাশ ফতুল্লা নাট্য চক্রের পক্ষে বেশ কিছু নাটক মঞ্চস্থ করেন। যা অনেক ক্ষেত্রে প্রশংসা কুড়িয়েছে। ফজলুল হক পলাশ সাক্ষাৎকারে বলেন, নারায়ণগঞ্জ শহরে কোনো স্থায়ী নাট্য মঞ্চ না থাকায় খোলা মঞ্চে নাটক মঞ্চস্থ করা ব্যয় বহুল। তাই তিনি ঢাকামুখী হলেন। তিনি দুঃখের সাথে বলেন, আলী আহম্মদ চুন্কা পাঠাগার কাজ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। চাষাড়ায় অবস্থিত জিয়া হল এখন বর্তমানে নিষ্প্রান ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে আছে। আলী আহম্মদ চুন্কা পাঠাগার মিলনায়তনকে দ্রুত উদ্বোধন করে, সকল নাট্যকর্মী ও কবি-সাহিত্যিকদের একজায়গায় সমাবেত করার আবেদন জানান তিনি।

সামাজিক অবক্ষয় রোধে নাট্যচর্চা খুবই গুরুত্ব বহন করে। এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগের যথাযথ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বলে সচেতন মহল মনে করেন।

বিষেরবাঁশী.কম/ সংবাদদাতা/ হীরা

Categories: নারায়ণগঞ্জের খবর,বিনোদন

Leave A Reply

Your email address will not be published.