বুধবার ৪ আশ্বিন, ১৪২৫ ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বুধবার

বাংলা একাডেমির পোস্টমর্টেম চাই

এইচ এম সিরাজ: যথাযথ সম্মান জানাচ্ছি প্রথমে। অতঃপর- মাননীয় মহাপরিচালক সামছুজ্জামান খানের কাছে সবিনয়ে দুটি প্রশ্ন রেখে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করতে চাই।
এক. বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম “সঞ্চিতা” নামে কাব্যগ্রন্থ লিখে অতঃপর তা উৎসর্গ করেন ‘সঞ্চয়িতা’র লেখক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। এবং উৎসর্গ-ভাষ্যে ‘গুরুদেব’ রবীন্দ্রনাথকে “বিশ্ব-কবিসম্রাট” বলে সম্বোধন করেন ৩৮ বছরের ছোট বিদ্রোহী নজরুল। আপনি কি বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন?

দুই. গত কয়েক বছর ধরে রোজার ঈদের দিন আমরা জাতীয় কবি’র সমাধিস্থলে “ঈদ আনন্দ” অনুষ্ঠান করি “রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ” প্রতিপাদ্য নিয়ে। এবং কবি নজরুলের স্বহস্তে লিখিত এ গানটির ফটোকপি বিলি করা হয় শ্রোতা-দর্শকদের। সেখানে কিন্তু “ঈদ” কথাটিকে ‘ইদ’ বলা হয়নি। তাহলে আপনি কেনো নতুন ফরমান জারি করে ঈদকে ‘ইদ’ বানাতে চাচ্ছেন?
উপরোল্লেখিত “সঞ্চয়িতা” এবং “সঞ্চিতা”কে ব্যকরণ ধারণ করেছে অভিন্ন অর্থে। বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখে।

হাজার বছরের কিংবা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ব্যারিস্টারি পড়েননি, ডক্টরেট ডিগ্রিধারীও ছিলেন না। তবে, তিনি বুঝে-সুঝেই “৩২ বছর আগে নির্বাক হওয়া” এবং ইন্ডিয়ায় অনাদর-অবহেলায় থাকা কবি নজরুলকে এক প্রকার মহাদুর্যোগের মধ্যে সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশে এনে “জাতীয় কবি” মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন। এরই নাম বঙ্গবন্ধু!

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর সরকারি উদ্যোগে সর্বপ্রথম নজরুল-জয়ন্তী অনুষ্ঠান হয় বাংলাদেশে, ১৯৭২ সালের ২৫শে মে(১১ জৈষ্ঠ ১৩৭৮ বাংলা)। সেদিন বঙ্গবন্ধু তাঁর দেয়া বাণীতে বলেন:
“কবি নজরুল বাঙলার বিদ্রোহী-আত্মা ও বাঙালির স্বাধীন ঐতিহাসিক-সত্তার রূপকার।…..প্রচন্ড সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের মতো, লেলিহান অগ্নিশিখার মতো, পরাধীন জাতির তিমির-ঘন অন্ধকারে বিশ্ব-বিধাতা নজরুলকে এক স্বতন্ত্র ছাঁচে গড়ে পাঠিয়েছিলেন এই ধরার ধূলায়।” এখন বাংলা একাডেমির কান্ড-বান্ড দেখে মনে হচ্ছে, ‘অল্পবিদ্যার’ নজরুলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার “মিশন” নিয়ে কারা যেনো মাঠে নেমেছেন! মূর্খতা আর কালে বলে!
আচ্ছা, গত বছর বইমেলায় বাংলা একাডেমির নজরুল-মঞ্চে বিভিন্ন বইয়ের “মোড়ক উন্মোচন” না করাও কি একইসূত্রে গাঁথা? লক্ষ্যনীয় আরো একটি বিষয়, গত বছর থেকে “এলো খুশির ঈদ” গানটির প্রচার কমিয়ে আনা হয়েছে সরকারি-বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর ঈদপর্ব অনুষ্ঠানসমুহে। এ সম্পর্কে ফেসবুকে কেউ কেউ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

প্রসঙ্গতঃ, ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কোলকাতায় এ্যালবার্ট হলে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাঙালি হিন্দু-মুসলিম সমাজের পক্ষ থেকে “জাতীয় কবি” অভিধায় স্বর্ণের দোয়াত-কলম দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয়। সাড়ম্বর সে অনুষ্ঠানের সভাপতি বিজ্ঞানাচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমরা নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা-গান কন্ঠে ধারণ করিয়া আমাদের তরুণ নেতা সুভাষের নেতৃত্বে বৃটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাপাইয়া পড়িব।’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, বাঙলার অবিসংবাদিত সিংহপূরুষ, বৃটিশবিরোধী-বিপ্লবী নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। রুদ্রমূর্তি-বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা কবি নজরুলের বিপ্লবী গান গাইতে গাইতে যুদ্ধক্ষেত্রে যাইব; আবার যখন কারাগারে যাইব তখনও ওর গান গাইব।’ আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা নেতাজী বলেছিলেন সেদিন: ‘একজন সর্বভারতীয় নেতা হিসাবে বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষায় রচিত জাতীয় সঙ্গীত শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তবে, কবি নজরুলের দুর্গমগিরি কান্তার মরু গানটির মত এমন মন-মাতান সঙ্গীত আর কোথাও শুনি নাই।…. ‘ অনুষ্ঠানে নজরুলকে দেয়া মানপত্র পাঠ করেন, ব্যারিস্টার এস ওয়াজেদ আলী। আর, সেই অনুষ্ঠানে “প্রতিভাষণ” শীর্ষক যে বক্তৃতা কবি নকরুল ইসলাম দিয়েছিলেন তা বাঙলা-সাহিত্যের ইতিহাসে “মাইলফলক” হয়ে আছে, থাকবে। এখানে একটি প্রশ্ন আমাকে অহর্নিশ তাড়িত করে, ৬৮ বছর বয়সের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেদিন কোথায় ছিলেন? সে অনুষ্ঠানে থাকলেন না কেনো? না কি তিনি দেশের বাইরে ছিলেন?

বাঙলার তৎকালীন কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে নজরুলকে পরম আস্থায় চিনেছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নজরুলকে “খ্যাপা” বলতেন তিনি। “ধূমকেতু” পত্রিকা প্রকাশ উপলক্ষ্যে নজরুলকে তিনি আশীর্ব্বাণী দেন:
‘আয় চলে আয়, রে ধূৃমকতু,
আঁধারে বাঁধ অগ্নি-সেতু।
দুর্দিনের এই দূর্গশিরে উড়িয়ে দে
তোর বিজয়-কেতন;
অলক্ষণের তিলক-রেখা,
রাতের ভালে হোক না লেখা।
জাগিয়ে দে, রে চমক মেরে,
আছে য়ারা অর্দ্ধ-চেতন।’

কারাগারে ‘কয়েদী’ অবস্থায় নজরুল টানা ৪০ দিন অনশন করেন বন্দী-নির্যাতনের প্রতিবাদে। শরীর ভেঙে পড়ে নজরুলের। ‘গুরুদেব’ রবীন্দ্রনাথ তখন বিচলিত হয়ে টেলিগ্রাম-বার্তা পাঠিয়ে নজরুলকে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন। যদিও সে বার্তা নজরুলকে দেয়নি জেল-কর্তৃপক্ষ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “গিভ আপ হাঙ্গারস্ট্রাইক। আওয়ার লেটারেচার ক্লেমস্ ইউ।” (অর্থাৎ, অনশন প্রত্যাহার করো; আমাদের সাহিত্য এ দাবি করছে তোমার কাছে।) নজরুল-গবেষণায় এ বিষয়টি একদিন নতুনমাত্রা যোগ করবে।

বাংলা একাডেমিকে আমার আর কিছু বলার নেই। সবশেষে বর্তমান মহাপরিচালক মহোদয়কে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, তৎকালীন ভারতবর্ষে কমুনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মোজাফ্ফর আহম্মদ আমাদের মাঝে আজো জাগরুক আছেন তাঁর রচিত “নজরুল স্মৃতিকথা”র সুবাদে। না হলে তিনিও হারিয়ে যেতেন অনেকের মতো। তাই, সম্ভব হলে বাংলা একাডেমির পোস্টমর্টেম করুন অযাচিত কর্মকান্ডের উৎস জানতে। “জাতীয় কবি পদক” প্রবর্তনের জন্যও আবেদন রাখছি আপনার কাছে।
অগ্নিবীণা’র পক্ষ হতে নজরুলীয় শুভেচ্ছা।

লেখক: সাংবাদিক,কবি ও নজরুল ভাবুক।

Categories: খোলা বাতায়ন

Leave A Reply

Your email address will not be published.