রবিবার ৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১৮ নভেম্বর, ২০১৮ রবিবার

‘আমার আত্মার সঙ্গে, লেখার সঙ্গে না’গঞ্জ শহরটি জড়িত: ইমদাদুল হক মিলন

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘আমার আত্মার সঙ্গে, আমার লেখার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ শহরটি জড়িত৷ আমি এ শহরের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ৷ সরকারি তোলারাম কলেজ কতৃক আয়োজিত বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা-২০১৮ এর পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন তিনি৷

এসময় তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার লেখক জীবন শুরু করেছিলাম নারায়ণগঞ্জ থেকে৷ আমি এজন্য এ শহরের কাছে কৃতজ্ঞ৷ ১৯৭২ সালের কথা৷ মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে৷ তখন নারয়ণগঞ্জ থেকে একটা পত্রিকা বের হতো ‘কালের পাতা’৷ যারা নারায়ণগঞ্জের পুরোনো লোক তাদের হয়তো মনে থাকতে পারে৷ কালের পাতা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সিরাজুল হক নামের এক ভদ্রলোক৷ তার ছেলেকে আপনারা চিনবেন, এ শহরেরই এক কবি মুজিবুল হক কবির, আমার বন্ধু৷ বাংলাদেশের বিখ্যাত অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদী তখন নারায়ণগঞ্জে থাকতেন৷ ফরিদী আমার বন্ধু, আমি সেই ৭২ সাল থেকে ফরিদীদের বাড়িতে আসতাম৷ নারায়ণগঞ্জে একটি অসাধারন পাঠাগার সেসময় গড়ে উঠেছিলো, ‘সুধীজন পাঠাগার’৷ যেখানে আমি বই পড়তে আসতাম৷ আমাদের বাসা ছিলো গেন্ডারিয়াতে, সেখান থেকে বাসে চড়তাম, চার আনা ভাড়া ছিলো৷ রোজ বিকেলে আমি নারায়ণগঞ্জে আসতাম৷ আমার আত্মার সঙ্গে, আমার লেখার সঙ্গে এ শহরটি জড়িত৷ আমি নারায়ণগঞ্জ শহরের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ৷ আমার ভালো লাগছে সেই নারায়ণগঞ্জের বিখ্যাত তোলারাম কলেজে, কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সামনে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় এসে দাড়াতে পেরেছি৷’
এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ঈশপ ও নাসিরুদ্দীন হোজ্জার কিছু শিক্ষনীয় গল্প শোনান এবং উপদেশ হিসেবে বলেন, ‘গাধার সঙ্গে কখনো তর্কে যাবে না৷ সদা সত্য কথা বলবে৷ আমরা গাধা হতে চাই না৷ সত্য কথা বলতে চাই, নীতির কথা বলতে চাই৷ আমি চাই তোলারাম কলেজের প্রত্যেকটা ছেলেমেয়ে এই আদর্শ নিয়ে বড় হবে৷

এসময় তিনি ঈশপের একটি গল্পের বরাত দিয়ে বলেন, ‘জিবের (জিহ্বা) মধ্যে ভালো ও খারাপ দুই-ই আছে৷ এটা দিয়ে ভালো কাজও করা যায় আবার খারাপ কাজও করা যায়৷ এখন থেকে চারশ বছর আগে সার্ভেন্থিস নামে একজন স্প্যানিশ লেখক লিখেছিলেন, ‘জিব হচ্ছে হৃদয়ের কলম৷ এই কলম দিয়ে তুমি সত্যি কথা লিখতে পারে, মিথ্যে কথা লিখতে পারো, একটা মানুষের দুর্নাম করতে পারো আবার সুনামও করতে পারো৷’ সুতরাং যারা এখানে সাহিত্য-শিল্পের চর্চা করে তাদেরকে বলতে চাই, আমরা যেন আমাদের কলম দিয়ে সত্য কথাটা লিখি কখনো যেন মিথ্যার আশ্রয় না নেই৷’

শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের কয়েকটি গল্প বলে তিনি বলেন, দেশপ্রেম যার না থাকে সে কখনো মানুষ হিসেবে তৈরি হয় না৷ আমাদের দুটো জায়গায় বড় ঋন থাকে৷ এক মায়ের কাছে, দ্বিতীয়টি দেশের কাছে৷ মায়ের প্রতি যে ঋন আমাদের শোধ করতে হয়, দেশের প্রতিও সে ঋন আমাদের শোধ করতে চাই৷ প্রত্যেকদিন একটিবার করে বলতে হবে, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি৷ ভালোবাসার কথা বলতে হবে৷ হোক সেটা দেশ, মা, বাবা, স্ত্রী কিংবা প্রেমিকা৷

তিনি আরও বলেন, ‘তোমাদের বই পড়তে হবে৷ আলো ছাড়া পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যেতো৷ এই আলোটা তোমাদের দেবে বই৷ প্রায়ই অনেকে বলেন, আমাদের দেশে বই পড়া কমে গেছে৷ আসলেই কমে গেছে৷ কেননা আমরা মনে করি, আমাদের টেলিভিশন আছে, ফেসবুক আছে, ইন্টারনেট আছে৷ কিন্তু ওয়েষ্টার্ন কান্ট্রিতে এইসব জিনিস বহু আগেই পৌছে গেছে৷ অথচ তারা এখনও সকালে অফিসে যাবার সময় ট্রেনে একটা বই পড়তে পড়তে যান আবার ফেরার সময় আরেকটা বই পড়তে পড়তে ফেরেন৷ তারা কিন্তু বই থেকে সরে যায় নি৷ কেননা তারা জানে তাদেরকে একটা বড় জাতি হতে হলে, সুস্থ সুন্দর অগ্রগামী জাতি হতে হলে বইয়ের কোন বিকল্প নেই৷ মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জীবনান্দের গান কিংবা কবিতা শোনানো হতো৷ এই গান ও কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অনুপ্রেরণা দিতো৷ শিল্প সাহিত্য সবসময় হৃদয়ের শক্তিতে বাড়িয়ে দেয়৷ শিল্প সাহিত্যের চর্চা না করলে কোন জাতি এগিয়ে যেতে পারে না৷

সরকারি তোলারাম কলেজের বার্ষিক সাহিত্য ও সংষ্কৃতিক প্রতিযোগিতা-২০১৮ এর পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সম্মানীয় অধ্যক্ষ প্রফেসর মধুমিতা চক্রবর্ত্তীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরেন্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন৷ এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন অত্র কলেজের উপাধ্যাক্ষ শাহ্ মোঃ আমিনুল ইসলাম, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আহ্বায়ক প্রফেসর সায়েরা বেগম৷ অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন প্রফেসর শামীমা পারভীন ও ইসরাত জাহান উর্মি৷

বিষেরবাঁশী.কম/ সংবাদদাতা/ হীরা

Categories: নারায়ণগঞ্জের খবর,সাহিত্য

Leave A Reply

Your email address will not be published.