শুক্রবার ৬ আশ্বিন, ১৪২৫ ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শুক্রবার

সব দোষ আইভী’র!

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: গত ১৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত সহিংস ঘটনার জন্য একটি পক্ষ মেয়র আইভীকে দোষারোপ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জোরালো প্রচার চালাচ্ছেন। এছাড়া তৃতীয় পক্ষেরও কিছু মন্তব্য বিষেরবাঁশীডটকমের নজরে এসেছে।
এসব অভিযোগ নিয়েই তৈরী এ প্রতিবেদনঃ

(১).ছেলের বিয়েতে ২৫ কোটি টাকা খরচ করা নিয়ে আইভী বলার কে?

একই বিষয়ে শামীম ওসমান ও আইভী’র উভয়েরই নির্ভেজাল শুভাকাঙ্ক্ষী প্রবাসী দু’জন ব্যক্তিত্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিউজের জেরে মন্তব্যে লিখেছেন,
“গত ৯ জানুয়ারি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে ‘জিমখানা লেকের’ উন্মুক্ত মঞ্চে আয়োজিত ‘জনতার মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানে “শামীম ওসমানের ছেলের বিয়েতে ২৫ কোটি টাকা খরচ নিয়ে আইভী’র তীর্যক মন্তব্য ঠিক হয় নি”।

(২).*আরেকটি মন্তব্যে উঠে এসেছে – আইভী শামীম ওসমানের ফাঁদে পা দিয়েছেন। এটাও আইভী’র রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা।

(৩).* মিছিল নিয়ে আইভী’র চাষাড়া যাওয়া
ঠিক হয় নি।

প্রথম সমালোচনাঃ
জনতার মুখোমুখি অনুষ্ঠানে আইভী কেন শামীম ওসমানের ছেলে বিয়ের ২৫ কোটি টাকা খরচ নিয়ে কথা বললেন? এটি কি আদৌ প্রাসঙ্গিক ছিল?
এর উত্তর জানতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে।
গত ৯ জানুয়ারি এ প্রসঙ্গে আইভী কি বলেছেন এর অডিও ভিডিও রেকর্ডের অংশবিশেষ পাঠকের উদ্দেশ্যে হুবুহু তুলে ধরা হলঃ
“সেদিনের ৪০ মিনিটের ভাষণের শেষেরদিকে হকার প্রসঙ্গে আইভী বলেন,”ডিসি-এসপিকে ধন্যবাদ হকার উচ্ছেদে সহযোগিতা করেছেন। রেল লাইনে রাস্তা করে দিয়ে ছিলাম কিন্তু কী অজানা কারনে রেল লাইনের রাস্তা দখল হয়ে গেছে আমি জানিনা। আমি ডিসি-এসপি সাহেবকে অনুরোধ করবো – তার আগে আমি ডিসি সাহেবকে এবং এসপি সাহেবকে ধন্যবাদ দিতে চাই। হকার উচ্ছেদে তাঁরা আমাকে এই প্রথম সহযোগিতা করলো বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে।
আমরা হকারমুক্ত ফুটপাথ চাই,আমরা চাই ২৫ লক্ষ মানুষ এই শহরে হাঁটাহাঁটি করুক। আমরা ৪ হাজার হকারের কাছে জিম্মি হতে চাই না।
২৫ কোটি টাকা খরচ করে যিনি সন্তানের বিয়ে দিতে পারেন,তিনি চাইলে ২/৪/১০ টি হকার মার্কেট করে দিতে পারেন।
*আমাদের সার্ভেয়ারের মতে ৬ শ’ হকার,কিন্তু তাদের অনুপাতে সাড়ে ৪ হাজার হকার, আর মাননীয় এমপি শামীম ওসমানের বক্তব্য অনুযায়ী ১০ হাজার। আমি জানি না-উনি ১০ হাজার হকার কোথা থেকে পেয়েছেন? এবং উনি বলেছেন,আমি হকারের পেটে লাথি মেরেছি। আমি হকারের পেটে লাথি মারি নাই।
বাংলাদেশের মধ্যে আমি আইভী প্রথম যে হকার্স মার্কেট করে দিয়েছিলাম ১/১১ এ। জেলা প্রশাসন,পুলিশ প্রশাসন,আর্মী প্রশাসনের সহযোগিতায়। সেখানে হকাররা দোকান বিক্রি করে রাস্তায় চলে এসেছে। যেই হকার ৬/৭ লাখ টাকায় দোকান বিক্রি করে রাস্তায় চলে আসে আমরা সেই হকারদের পুনর্বাসন করতে চাই না।
আমার ফুটপাথ দিয়ে আমার জনগণ হাঁটবে এটাই আমি চাই।
আর যিনি বলেন-হকারদের আমি লাথি দিয়েছি…গরীব মানুষের রাজনীতি নাকি উনি করেন।
আমি উনাকে অনুরোধ করবো,২৫ কোটি টাকা খরচ করে যিনি সন্তানের বিয়ে দিতে পারেন-সে চাইলে এরকম ২/৪/১০ টা হকার মার্কেট করে দিতে পারে।…..
আমি অনুরোধ করবো মাননীয় সেই সংসদ সদস্যকে যিনি গরীবের জন্য এতো মায়াকান্না, লাখ লাখ টাকা পাচার করে দুবাইতে যারা ব্যবসা করে,সেই শহরের মানুষকে যারা শুষে খায়,তারা যেন…তাঁদের যখন এতো মায়াকান্না হকারদের জন্য.. তাহলে আপনি ওই জায়গার মধ্যে হকার মার্কেট করে দেন”।
বিশ্লেষণঃ
*এখানে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হকারদের পক্ষে শামীম ওসমানের অবস্থান ও কিছু মন্তব্যের জেরে আইভী ‘জনতার মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন*।

শামীম ওসমানের ফাঁদে পা দিয়েছেন আইভী
বিশ্লেষণঃ
*মেয়র ডা.সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সাংসদ শামীম ওসমান দু’জনই আওয়ামীলীগ দলীয় জনপ্রতিনিধি।
অভিন্ন স্বার্থে দু’জনে কাজ করবেন এটাই স্বাভাবিক। পক্ষান্তরে একজন আরেকজনকে ফাঁদে ফেলাই বরং অস্বাভাবিক এবং অনভিপ্রেত।

 আইভী’র মিছিল নিয়ে চাষাড়া পর্যন্ত যাওয়া ঠিক হয়নি
বিশ্লেষণঃ
হকার ইস্যুটি সংসদীয়-৫ আসনের সাংসদ সেলিম ওসমান এবং স্থানীয় সরকার ও সিটি কর্পোনেশনের মেয়র আইভীর আওতাধীন। এ ইস্যুতে সংসদীয়-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের হস্তক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে।
যেখানে আইভী এবং শামীম ওসমানের ‘সাপে-নেউলের সম্পর্ক,সেখানে গত ১৫ জানুয়ারী কয়েক হাজার হকারের বিক্ষোভ সমাবেশে উপস্থিত হয়ে মেয়র আইভীকে ২৪ ঘন্টার আল্টেমেটাম দিয়ে শামীম ওসমান বলেন,”১৬ জানুয়ারি বিকাল ৪ টা থেকে ফুটপাথে হকার বসবে,এটা আমার অনুরোধ নয়,নির্দেশ। আমি শহীদ মিনারে উপস্থিত থাকবো। আপনাদের কেউ মারলে মার খাবেন। কীভাবে পাল্টা মাইর দিতে হয় আমার জানা আছে”।
শামীম ওসমানের এই বক্তব্যে অবাক হন আইভী। এখানেই শেষ নয়,শামীম ওসমান ছাত্রলীগ,যুবলীগকেও উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দেন।
এ যেন আগুনে ঘি ঢালা!

উল্লেখ্য,গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে হকার উচ্ছেদ অভিযান শুরুর ১৮ দিন পর ১৩ জানুয়ারি হকারদের নেতৃবৃন্দ স্থানীয়া সাংসদ সেলিম ওসমানের সঙ্গে সাক্ষাত করে সাহায্য চাইলে সাংসদ সেলিম ওসমান দ্রুত সাড়া দেন। তিনি এ ব্যাপারে মেয়রের সঙ্গে পত্রবিনিময়ও করেন। সমস্যা সমাধানে অনেকটা অগ্রসরও হন। কিন্তু ১৪ জানুয়ারি সাংসদ সেলিম ওসমান দেশের বাইরে যাওয়ার পর ১৫ জানুয়ারি বিকালে বিক্ষুব্ধ হকারদের সমাবেশে শামীম ওসমান উপস্থিত হয়ে ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেন। এতেই ঘটে বিপত্তি। এর পরের ঘটনা সবার জানা।

১৬ জানুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার পর

আইভী পরদিন ১৭ জানুয়ারি নগরভবনে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে অভিযোগ করে বলেন,”আমি কখনো কাউকে আগ বাড়িয়ে কিছু বলি না। আমি শুধু জবাব দেই।
১৬ জানুয়ারি আমি শান্তিপূর্ণ উপায়ে পায়ে হেঁটে চাষাড়ার দিকে যাচ্ছিলাম। আমরা নিরস্ত্র ছিলাম। আমরা ফুটপাথ ধরে হেঁটে চাষাড়া হয়ে প্রেসক্লাবে বসে বক্তব্য রাখতাম। মানুষকে সচেতন করাই ছিল উদ্দেশ্য।
আমার অপরাধ কী?আমি ২৫ লক্ষ মানুষের অধিকার রক্ষা করতে চেষ্টা করছি?
তিনি আমাকে সহযোগিতা না করে পরিস্থিতি তৈরী করেছেন।
বিশ্লেষণঃ
মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতিও। তিনি ২৫ লাখ মানুষের ফুটপাথে নির্বিঘ্নে চলাচলের স্বার্থে আইনসম্মত কাজ করছেন। শান্তিপূর্ণ মিছিল নাগরিক অধিকার। মিছিল নিয়ে আসার ব্যাপারে মেয়র আগেই প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন। তারপরও প্রশাসন তাঁকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
হকাররা ছিল মারমুখী
আগেরদিন শামীম ওসমানের অভিভাবক সূলভ বক্তব্যের পর বিক্ষুব্ধ হকার ও সুযোগসন্ধানীরা উজ্জীবিত হয়ে ১৬ জানুয়ারি আইভী’র উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত।
পর্যবেক্ষকদের মতে,মানবঢাল হয়ে মেয়রকে ঘেরাও করে রাখার পাশাপাশি চূড়ান্ত সময়ে পুলিশী এ্যাকশানের ফলে মেয়র আইভী অপঘাত থেকে রক্ষা পান। অন্যথা, পরিণতি কী হতো বলা বাহুল্য!

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/ হীরা

Categories: খোলা বাতায়ন,নারায়ণগঞ্জের খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.