বুধবার ১১ মাঘ, ১৪২৪ ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮ বুধবার

কাঁচামালের দ্বিগুণ দরে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: কাঁচামালের দ্বিগুণ দরে দেশের বাজারে এলপিজি (লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এলপিজির উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজার দর বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগের অভাবে এলপিজিতে অনৈতিক বাণিজ্যের শিকার হচ্ছেন ভোক্তারা।

আন্তর্জাতিক বাজারে এক টন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বর্তমানে ৬৯০ ডলার। অর্থাৎ প্রতি কেজির দর দশমিক ৬৯ ডলার। সে হিসেবে ১২ কেজি এলপিজির দাম দাঁড়ায় ৬৬২ টাকা। অথচ দেশের বাজারে এই এলপিজি বোতলজাত করে বিক্রি হয় প্রায় দ্বিগুণ দামে, এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের দাম ছাড়াও কোম্পানির ব্যবস্থাপনা, পরিচালন, বিতরণ খরচের সঙ্গে যোগ হয় আরো দুই ধাপে মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা। উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ডিলার এবং ডিলারের কাছ থেকে খুচরা ব্যবসায়ীর হাত ঘুরে গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় এলপিজি। এই দুই স্তর পার হতে দাম বেড়ে যায় অন্তত ১৫০ টাকা।

বাংলাদেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করা বেসরকারি কোম্পানিগুলোর একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। তেলের উপজাতের মধ্যে বিউটেন ও প্রপেনের সংমিশ্রণে তৈরি করা হয় এলপিজি। এরপর এটি ট্যাংকারে সংরক্ষণ করে সিলিন্ডারে দিয়ে বাজারজাত করা হয়। আমদানির ক্ষেত্রে সরাসরি জাহাজে করে এই গ্যাস আনা হয়। এরপর ট্যাংকারে সংরক্ষণ করে বোতলজাত করে বিক্রি করা হয়। সরকারিভাবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কোম্পানিগুলো এলপিজি সরবরাহ করে। বেসরকারিভাবে বসুন্ধরা এলপিজি, এনার্জিপ্যাক, বেক্সিমকো, যমুনা, টোটাল গ্যাস, ওরিয়ন, ওমেরা এবং বাংলাদেশ অক্সিজেন কোম্পানিসহ (বিওসি) ৪৪টি কোম্পানি বাজারে এলপিজি সরবরাহ করে। এ ছাড়া, আরো প্রায় ১০০ কোম্পানিকে এলপিজি সরবরাহের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

বিপিসির একজন কর্মকর্তা জানান, দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় তিন থেকে চার লাখ টন গ্যাস প্রয়োজন হয়। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টন। এরমধ্যে সরকারিভাবে মাত্র ১৮ থেকে ২০ হাজার টন। বেসরকারিভাবে প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন এলপি গ্যাস বাজারজাত করা হয়। এদিকে সরকারিভাবে উৎপাদিত বিপিসির এলপি গ্যাস প্রতি বোতল (১২ কেজি) ৭০০ টাকা দামে বিক্রি করে। কিন্তু বেসরকারি কোম্পানিগুলো এলপি গ্যাস প্রতি বোতল সাড়ে ৯০০ থেকে এক হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি করছে।

এ বিষয়ে একটি বেসরকরি কোম্পানির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারে তাদের খরচ হয় ৮৪৫ টাকা। তারা বিক্রি করেন ৯৪৫ টাকায়। এর সঙ্গে খুচরা বাজারে আরো ১৫০ থেকে ২০০ টাকা যোগ করে বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে ডিলার এবং খুচরা ব্যবসায়ীর মুনাফা ছাড়াও পরিবহন ব্যয় রয়েছে। আরেক কর্মকর্তা জানান খরচের মধ্যে গ্যাসের দাম, প্রিমিয়াম, জাহাজের ভাড়া, বন্দরে আনার পর খালাস পর্যন্ত খরচ, এরপর কারখানায় নেওয়ার খরচ, সিলিন্ডারের দাম, সিলিন্ডার কারখানা থেকে ডিলারদের কাছে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত খরচ হিসাব করা হয়। তিনি আরো জানান, সব মিলিয়ে যে খরচ হয়, তাতে লাভ খুবই কম থাকে। তবে কত লাভ থাকে, তা বলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

গ্যাস সংকটের কারণে আবাসিকে এখন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে রাজধানীর বহু এলাকায় এখন সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। মিরপুরের বাসিন্দা শম্পা জানান, গ্যাসের লাইন না থাকায় সিলিন্ডার ব্যবহার করছি দীর্ঘদিন ধরেই। পাইপলাইনের গ্যাসের তুলনায় দাম তো বেশি পড়ছেই, তারওপর মাঝে মাঝে মনে হয় গ্যাসও কম থাকে। কিন্তু কিছুই করার নেই। বাধ্য হয়েই ব্যবহার করতে হচ্ছে। তিনি জানান, বাজারে দামের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সমস্যা। কোথাও সিলিন্ডার এক হাজার ১০০ টাকায় আবার কোথাও কোথাও ১ হাজার ২০০ টাকাও বিক্রি হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের এগিয়ে আসা দরকার বলে তিনি মনে করেন।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, এখন আন্তর্জাতিক বাজারে যে দামে এলপি গ্যাস বিক্রি হচ্ছে তার সঙ্গে কমিশন, ট্যাক্স যোগ করে সিলিন্ডারপ্রতি দাম ৬০০ টাকার বেশি হওয়ার কথা না। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। ফলে যে যার ইচ্ছে মতো দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছে। তিনি অভিযোগ করেন, এলপিজির খুচরা মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। কোম্পানিগুলো একেক দামে ডিলারের কাছে গ্যাস বিক্রি করছে। ডিলাররা ইচ্ছেমতো লাভ ধরে গ্রাহক পর্যায়ে তা সরবরাহ করছেন।

তিনি আরো বলেন, এই দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হলে নীতিমালা করা জরুরি। সরকার বার বার নীতিমালার কথা বললেও এখন পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। বুয়েটের পেট্রোলিয়াম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বাংলাদেশ তেল উৎপাদনকারী দেশ নয়। ফলে আমাদের পক্ষে এলপিজি উৎপাদন করা সম্ভব নয়। নিজেরা এলপিজি উৎপাদন করতে পারলে দাম অনেক কম হতো। তিনি জানান, বর্তমানে যে রিফাইনারি আছে, তাতে মাত্র এক লাখ টন তেল পরিশোধন করা হয়। সেখান থেকে যে এলপিজি পাওয়া যায় তার পরিমাণ খুবই কম। আর সিলেটের কৈলাশটিলা গ্যাসক্ষেত্র থেকে উপজাত হিসেবে পাওয়া কনডেনসেট থেকেও খুবই কম এলপিজি হয়। সব মিলিয়ে মাত্র ২০ হাজার টন এলপিজি পাওয়া যায়। যা চাহিদার মাত্র পাঁচ ভাগ মেটাতে পারে। তিনি আরো বলেন, দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে নীতিমালা করতে হবে। নীতিমালার মাধ্যমেই সব বিষয় নির্ধারণ করা যেতে পারে।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: অর্থনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.