রবিবার ৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১৮ নভেম্বর, ২০১৮ রবিবার

নির্বাচনী মাঠে নতুন উদ্যমে আওয়ামী লীগ-বিএনপি

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হবে শপথ নেওয়ার দিন, অর্থাৎ ২০১৯ সালের ১০ জানুয়ারি। সে ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে যেকোনো দিন পরবর্তী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে ক্ষমতাসীনরা চাইছে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ সংসদ নির্বাচন। সেইসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে উপনির্বাচনসহ দেশের আরো পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনও আগামী বছর। ফলে নতুন বছর ২০১৮ সাল হবে নির্বাচনের বছর।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বছর জুড়ে থাকবে নির্বাচনী হাওয়া। দেখা দেবে রাজনৈতিক উত্তাপ। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে মুখোমুখি অবস্থান নেবে চির দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। মূল লক্ষ্য থাকবে ক্ষমতায় যাওয়া। এ নিয়ে টানটান উত্তেজনা থাকবে দেশে। সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই মূলত সরব থাকবে রাজনীতি। তবে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হলে এবং নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দলটি কঠোর অবস্থানে গেলে সংঘাত-সংঘর্ষের রাজনীতি দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সরকার কিভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়, তার ওপরও নির্ভর করছে নতুন বছরের নির্বাচনী রাজনীতি। একই সঙ্গে বিভিন্ন সিটি করপোরেশনসহ অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন কী ধরনের উদ্যোগ নেয় এবং কমিশন তার নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি অক্ষুণœ রাখতে পারে কি না—সেটাও রাজনৈতিক পরিস্থিতির অন্যতম নিয়ামক হবে।

ফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য নানা রাজনৈতিক এবং ইসির জন্য সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসছে নতুন বছর। ইতোমধ্যেই পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে এবং মূল লক্ষ্য ক্ষমতায় যেতে বড় দুই দল নানা রাজনৈতিক ও নির্বাচনী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তবে তাদের এসব কর্মসূচি রাজনীতিতে উত্তেজনা ছড়াতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। একইভাবে ইসিও চাইছে সরকারের সঙ্গে এক ধরনের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে সব দলকে নির্বাচনে আনতে। সে ক্ষেত্রে সরকার বা ইসি উদ্যোগী না হলে বিতর্কের মুখে পড়তে হতে পারে ইসিকেও।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, আগামী বছর রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকবে। গণতন্ত্র চর্চার মূল হচ্ছে ভোট। সেই ভোটের বছর আগামী বছর। উত্তেজনা থাকবেই। সে ক্ষেত্রে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক আচরণ কেমন হবে ও সরকার কিভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়Ñতার ওপর নির্ভর করছে সবকিছু। ‘বড় ঘটনা হবে খালেদা জিয়ার মামলার রায়’Ñউল্লেখ করে এই বিশ্লেষক বলেন, যুক্তিতর্ক যে পর্যায়ে রয়েছে, তাতে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে মামলা দুটি চলছে, তার রায় হবে নতুন বছরে। ওই রায়কে কেন্দ্র করে সাময়িক উত্তেজনা তৈরি হবে। সে পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দেবে, সরকারকে তার প্রস্তুতি রাখতে হবে। বিএনপি নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে জামায়াতকে কিভাবে রাখবে। কারণ রংপুর জামায়াতের ভোটব্যাংক। অথচ বিএনপির পক্ষে সে ভোট পড়েনি। তাহলে ভোটগুলো কই গেল? তা ছাড়া বিএনপির মধ্যেও জামায়াতবিরোধী মত আছে।

অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতাদের মধ্যে আচরণগত ব্যবহার নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। এই মনোবৃত্তি কঠোরভাবে দমন করতে না পারলে দলের জন্য বুমেরাং হবে। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভোটের মাধ্যমে বদলা নেবে। সনাতন পন্থায় না গিয়ে জনবান্ধব ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিতে হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। কিছু মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সে ক্ষতি পোষাতে উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। ভোটে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে কিছু গণমাধ্যমের ওপর সতর্ক পর্যবেক্ষণ রাখতে হবে। এসব গণমাধ্যম নানা ইস্যুতে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন সূত্র ও শীর্ষ নেতারা নতুন বছরের নির্বাচনী রাজনীতির প্রস্তুতি সম্পর্কে জানিয়েছেন। এরমধ্যে আওয়ামী লীগ আগামী ১২ জানুয়ারি বর্তমান সরকারের চার বছর পূর্তির দিন থেকেই জেলা পর্যায়ে নির্বাচনী সফরে বের হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায় পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিও নেবে দলটি। অন্যদিকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও নির্বাচনী রাজনীতিতে রাজপথে আন্দোলন ছাড়া সামনে কোনো উপায় দেখছে না বিএনপি। দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একটি অংশ মনে করছে, পরিস্থিতি যাই হোক আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিলে দল বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে বিএনপি।

আবার আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বরং বিগত সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি যেমন সহিংস আন্দোলন কর্মসূচি দিয়েছিল, এবার সেই চেষ্টা করলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে জানিয়েছেন দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা। এর বিপরীতে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার কৌশল নিয়েছে বিএনপি। দলটি মনে করছে, নির্বাচনের এক বছর আগে হঠকারিতা করা যাবে না বা ভুল কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভেবে-চিন্তে।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, বিএনপির পেছনে সময় নষ্ট না করে আগামী নির্বাচনে নিজেদের প্রস্তুতির দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। দলের প্রধান লক্ষ্য জনসমর্থন বাড়ানো। এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণায় গতি আনতে এবং সাংগঠনিক কোন্দল সমাধানে দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্যদের সাংগঠনিক দায়িত্ব দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। আগামী জানুয়ারি থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্যরা নির্বাচনী প্রচারণায় নামবেন। বিএনপি নির্বাচনে আসুক আর না আসুক নিজেদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন ক্ষমতাসীনরা।

দলীয় সূত্রমতে, বিএনপিকে আগামী নির্বাচনকালীন সরকারে রাখার বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে কোনো প্রস্তাব দেওয়ার আগ্রহ নেই। আর এবার বিএনপি সংসদে না থাকায় নির্বাচনকালীন ছোট পরিসরের মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট কোটায় এক-দুইজনের বেশি রাখার সুযোগও নেই। ফলে গত নির্বাচনকালীন সরকারে অংশগ্রহণের জন্য বিএনপিকে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তা আগামী নির্বাচনে দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

দলীয় সূত্র আরো জানায়, সাংগঠনিক সফর দিয়ে শুরু করে আগামী নির্বাচনের বছর পুরোটা সময় মাঠে থাকবে তারা। বছরের প্রথম তিন মাস থাকবে মূলত দিবসভিত্তিক কর্মসূচি। ৫ জানুয়ারি সরকারের চার বছর পূর্তি, ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস, ফেব্রুয়ারিতে শহীদ দিবস, মার্চে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ দিবস, তার জন্মদিন, স্বাধীনতা দিবসসহ নানা কর্মসূচিতে রাজধানী ঢাকার রাজপথসহ সারা দেশের রাস্তাঘাট, পাড়া-মহল্লা, অলি-গলিতে উপস্থিত থাকবে দলটি। চলতে থাকবে জনসংযোগ। উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি বিএনপির লুটপাট, দুর্নীতি, জিয়া পরিবারের সম্পদের তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। এভাবে চলবে আগামী আগস্ট পর্যন্ত। আর এরপর তো আনুষ্ঠানিকভাবেই শুরু হবে নির্বাচনী প্রচারণা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দলের যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, বিএনপির দাবি অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই। নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে বা অন্য কোনো উদ্যোগে ছোটখাটো কোনো বিষয়ে দ্বিমত থাকলে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। বিএনপি যদি আন্দোলনের পথে হাঁটে তবে আমরা তা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করব। আর একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন সহযোগিতা করবে। তারা তাদের দিক থেকে উদ্যোগ নেবে, আমরা আমাদের দিক থেকে সহযোগিতা করব।

অন্যদিকে সার্বিক পরিস্থিতি বুঝে ধীরে-সুস্থে নির্বাচনী রাজনীতিতে নামতে চায় বিএনপি। সরকারকে চাপে ফেলতে আন্দোলনের যদি প্রয়োজন হয়ও তার জন্য সরকারের মেয়াদের শেষ ছয় মাসকে বেছে নেবে দলটি। এর আগে আন্দোলনে গেলে কোনো সফলতা পাওয়া যাবে না বলে মনে করছেন দলের নেতারা। এ ব্যাপারে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নেতাদের ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

বিএনপির সূত্র জানায়, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের বর্ষপূর্তির দিন ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন করবে বিএনপি। এরপর থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচিতে থাকতে চায় দলটি। সভা, সমাবেশ, বিভাগীয় সফরের মতো কর্মসূচি পালন করা হতে পারে। তবে এবার টানা হরতাল-অবরোধ বা জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো কর্মসূচিতে যেতে চায় না দলটি। আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিলে হতে পারে চার সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এ সময় নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততা থাকবে। বছরের শেষ দিকে পরিস্থিতি বুঝে বড় কর্মসূচির দিকে যাওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে। কিন্তু সরকারের সম্ভবত শান্তিপূর্ণ অবস্থান পছন্দ নয়। তাই একতরফা নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়ে তারা নানা ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে। কিন্তু আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ছাড়া আমরা কিছুই করব না। কারো উসকানিতে পা দেব না। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ের আন্দোলন উপযুক্ত সময়েই হবে।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: রাজনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.