সোমবার ৪ পৌষ, ১৪২৪ ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ সোমবার

রোহিঙ্গাদের পক্ষে পোপের অবস্থান স্পষ্ট

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: পোপ ফ্রান্সিসের কাছ থেকে বাংলাদেশ যা আশা করেছিল, তাই পেয়েছে। অস্পষ্টতা দূর করে নির্যাতিতের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন পোপ। এতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের শক্তি আরও বাড়ল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল মিয়ানমারে পোপের সফর। আর এ সফরে পোপ ফ্রান্সিস রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে কী অবস্থান নেন তা শুধু ঢাকা নয়, বলতে গেলে পুরো বিশ্বই পর্যবেক্ষণ করছিল। নির্যাতিত এ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশর নামটি জড়িয়ে আছে ১৯৭৮ সাল থেকে। আর সর্বশেষ ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইনে ‘জাতিগত নিধন’ প্রক্রিয়ার শিকার হয়ে ৬ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। আর আগে থেকে আছে আরও ৪ লাখ রোহিঙ্গা। ২৫ আগস্টের পর রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক আবেদন জানাতে গিয়ে চলতি বছরই দুই-দুইবার ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন পোপ ফ্রান্সিস। কিন্তু মিয়ানমারে তিনি রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করা থেকে বিরত ছিলেন। এ ভ্যাটিকান মুখপাত্র গ্রেগ বুরকে তখন বলেছিলেন, ‘পোপ রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেননি, এর মানে এই নয় যে, তিনি রোহিঙ্গাদের নিয়ে আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।’
বাংলাদেশ সফরের প্রথম দিন পোপ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবনে তার সম্মানে দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কথা বললেও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি এড়িয়ে যান। সেখানে তিনি বলেন, ‘রাখাইন রাজ্য থেকে আসা শরণার্থীদের সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।’ কিন্তু বাংলাদেশ সফরের দ্বিতীয় দিনে পোপ মানবিকতার জয়গান গেয়েছেন। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কথাই বলেছেন। কাকরাইল চার্চে কক্সবাজার থেকে আসা ১৫ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সেখানে তিনি বলেন, এখন ঈশ্বরের অস্তিত্বকেও বলা যেতে পারে ‘রোহিঙ্গা’। তিনি আরও বলেন, ‘তোমাদের ওপর যারা অত্যাচার চালিয়েছে, যারা তোমাদের কষ্ট দিয়েছে, তাদের হয়ে আমি ক্ষমা চাই।’
পোপের সঙ্গে যে রোহিঙ্গারা দেখা করেছেন, কথা বলেছেনÑ তাদের মধ্যে একজন হলেন কুতুপালং ক্যাম্পের লালু মাঝি। তিনি বলেন, ‘পোপ অনেক বড় মানুষ, ভালো মানুষ। আমাদের প্রত্যেকের কথা তিনি আলাদাভাবে শুনেছেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন, হাত ধরেছেন। বলেছেন, আমরা যাতে নাগরিকত্ব নিয়ে সম্মানের সঙ্গে আমাদের দেশে ফিরতে পারি সেজন্য তিনি কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি আমাদের সবাইকে একটি করে রূপার মেডেল উপহার দিয়েছেন।’ লালু মাঝি বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকেই আলাদাভাবে পোপকে আমাদের ওপর ব্যক্তিগত নির্যাতন ও নিপীড়নের কথা বলেছি। বলেছি, আমাদের ওপর হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, আগুন আর লুটতরাজের কথা।’ লালু মাঝি পোপকে বলেছেন, তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিলে এবং নিরাপত্তা দিলে তারা নিজের দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাবেন।
পোপ রোহিঙ্গাদের পক্ষে সুস্পষ্ট মানবিক অবস্থান নিয়েছেন। তার এ অবস্থান বাংলাদেশের পক্ষেই। পোপের এ অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘পোপ শুধু রোহিঙ্গা শব্দটিই উচ্চারণ করেননি। তিনি বলেছেন, এখানে যেন রোহিঙ্গারাই ঈশ্বর। এটা অনেক বড় কথা। তিনি নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মধ্যেই ঈশ্বরকে দেখেছেন। এটা অনেক বড় মানবিক কথা। আর এর একটি বৈশ্বিক প্রভাব আছে। পোপ বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রভাব রাখেন। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ এখন আরও বাড়বে।’ তিনি বলেন, ‘সু চি এখন চীন সফরে রয়েছেন। মিয়ানমার এরই মধ্যে বুঝতে পেরেছে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে তাদের এ লুকোচুরি খেলায় কাজ হবে না। তাই হয়তো সু চি এখন নতুন করে চীনের সঙ্গে পরামর্শ করবেন।’ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এ অধ্যাপক বলেন, ‘পোপ ফ্রান্সিস কার্যত রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের শক্তি আরও বাড়ল বলে আমি মনে করি। পোপ এখন হয়তো নানাভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চাপ দেবেন। পোপের সেই চাপ দেয়ার ক্ষমতা আছে।’
ডয়েচে ভেলে

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: আন্তর্জাতিক

Leave A Reply

Your email address will not be published.