সোমবার ৪ পৌষ, ১৪২৪ ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ সোমবার

শৃঙ্খলা আসছে না ব্যাংক খাতে

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: দেশের ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ও অনিয়ম দূর করতে গত বছরের জানুয়ারি থেকে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায় ও ঋণ বিতরণে অনিয়ম বন্ধ করতে গত প্রায় দুই বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। সর্বশেষ গত সোমবার ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং ব্যাংকের নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালক মাহাবুবুল হক চিশতীকে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় এই ব্যাংকে কিছুদিন ধরেই তারল্য ঘাটতি ও আর্থিক সূচকগুলোর অবনতি ঘটছে।

খেলাপি ও কু-ঋণ আদায়ে আলাদা কোম্পানি গঠন, বড় ঋণখেলাপিদের যৌথভাবে তদারকি করা, দক্ষ ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত করা এবং ব্যর্থদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া ঋণ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কোনোভাবেই ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ব্যাংক একীভূতকরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন নিয়েও পর্যালোচনা করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এ জন্য মতামত চাওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রস্তাবের অনুমোদনও দিয়েছেন।

ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা আনতে তৎপর দুর্নীতি দমন কমিশনও। অনুসন্ধান শুরুর প্রায় চার বছর পর বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু ও তার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত সপ্তাহে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিস দিয়েছে। এই পর্ষদ ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত মাত্র ১১ মাসে নজিরবিহীন অনিয়মের মাধ্যমে তিন হাজার ৪৯৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ঋণের নামে বিভিন্নজনকে দিয়ে দেয়। একইভাবে অগ্রণী ব্যাংকের ৬০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার দায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, ব্যাংকের অপসারিত ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ আটজনের বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগপত্র অনুমোদন করেছে সংস্থাটি। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাজধানীর মতিঝিল থানায় ২০১৬ সালের ৩০ জুন মামলা হয়েছিল।

এমনকি ব্যাংক খাতের সংকটের আগাম বার্তা ও সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে চিঠি চালাচালি চলছে দু’বছর ধরেই। প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও এসেছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশও করেছে।

কিন্তু কিছুতেই ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা আনা যাচ্ছে না। বরং আরো দুর্বল হয়ে পড়ছে দেশের ব্যাংক খাত। নিয়মনীতি না মেনে ঋণ দেওয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে দেশের আর্থিক খাতে। ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ গত নয় বছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ বেড়ে সাড়ে তিন গুণ হয়েছে। এর বাইরে আরো ৪৫ হাজার কোটি টাকার খারাপ ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ এখন এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

এমনকি ব্যাংক খাত ঠিক রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এককভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল। এগুলো হলো-ব্যবসার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেওয়া, পর্যবেক্ষক বসানো, পর্ষদ সভার যাবতীয় নথি বিশ্লেষণ, বড় ঋণ অনুমোদন, একক গ্রাহকের ঋণসীমা নির্ধারণ ও ঋণ পুনর্গঠন ব্যবস্থা চালু। এ সংক্রান্ত নির্দেশনাও দিয়েছিল ব্যাংকগুলোকে। কিন্তু ব্যাংকগুলো তা মানেনি। আর্থিকভাবে আরো নাজুক হয়ে পড়েছে ব্যাংকগুলো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে ৪৮টি ব্যাংকের মধ্যে ১৩টির আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ। এই ১৩ ব্যাংকের মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ও বিশেষায়িত ব্যাংক আটটি। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কমার্স, ন্যাশনাল, ফারমার্স ও এনআরবি কমার্শিয়ালে পরিস্থিতি কয়েক বছর ধরে খারাপ হচ্ছে। এ ছাড়া ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হওয়া ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের দুর্নীতির বোঝা এখনো টেনে চলেছে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। বাকি বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের অভাবে খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ঋণ অনিয়ম বেড়েছে। এমনকি দুই বছর ধরে এই ১৩ ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসিয়েও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

কেন ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা আনা যাচ্ছে না এবং খাতটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদরা সরকারের স্ববিরোধী কিছু নীতিকে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, একদিকে সরকার ব্যাংককে দুর্নীতিমুক্ত করতে চাইছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকগুলোর অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে অর্ধশত বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় বেশি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, সেখানে আরো তিনটি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়াটা মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়। এমনকি পরিবারতন্ত্রকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যাংকিং খাতে সরকার আইনের যে সংশোধন করতে যাচ্ছে, তাতে এ খাতে লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা আরো বাড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা। প্রস্তাবিত এ আইনে বলা হচ্ছে, যেকোনো বেসরকারি ব্যাংকে একই পরিবার থেকে চারজন সদস্য পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারবেন।

ব্যাংক খাতের এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে অব্যবস্থাপনা চলছে। অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে। এটি ব্যাংক খাত তো বটেই, সার্বিক অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। এমন অবস্থা চলতে থাকলে কেবল আমানতকারী বা ব্যবসায়ীরাই ব্যাংকবিমুখ হবেন না, উৎপাদন, বিদেশি বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখনই সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শক্ত হাতে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। নতুবা ২০০৮ সালের মতো দেশের সার্বিক আর্থিক খাত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। যদি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে সমস্যা হয়ে যাবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণ ও খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণেই মূলত ব্যাংকিং খাতে এমন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। খাতটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়েছে। সেখান থেকে মুক্ত করতে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকের পরিমাণ ও নতুন করে আরো তিনটি ব্যাংক অনুমোদনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। ব্যাংক খাতের নানা সমালোচনার মধ্যে গত সোমবার এক অনুষ্ঠানে নতুন করে আরো তিনটি ব্যাংকের অনুমোদনের কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক বেশি হওয়ায় ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বেড়েছে। গত পাঁচ বছরে খাতটি অনেক পেছনে চলে গেছে। ব্যাংকগুলো এখন মুদি দোকানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ৫৭টি ব্যাংক যথেষ্ট। নতুন করে আরো ব্যাংক দিলে এ খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর হতে হবে।

‘এর আগে যখন নয়টি ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়, আমরা তখনই বলেছিলাম দেশের অর্থনীতির যে আকার সেখানে আর নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। এই নয়টি ব্যাংকের মধ্যে ফারমার্স ব্যাংক রয়ে গেছে। এনআরবি ব্যাংকসহ সমস্যাযুক্ত কিছু ব্যাংক আছে। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে আবারও তিনটা ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়াটা আমি যুক্তিযুক্ত মনে করি না’-বলেও মত দেন এই অর্থনীতিবিদ।

সরকার ব্যাংকিং খাতে আইনের যে সংশোধন আনতে যাচ্ছে, সেখানে পরিবারতন্ত্র গুরুত্ব পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রস্তাবিত এ আইনে বলা হচ্ছে, যেকোনো বেসরকারি ব্যাংকে একই পরিবার থেকে চারজন সদস্য পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারবেন। এই সংশোধিত আইন কার্যকর করা হলে পরিবারতন্ত্র কায়েমের মাধ্যমে পরিচালকদের লুটপাটের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্তে একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। এটি হবে ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের পরিপন্থি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, নতুন ব্যাংক ও পরিবারতন্ত্রকে প্রশ্রয় দিয়ে আইনের সংশোধনোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। বর্তমান ব্যাংকিং খাতে পুরোপুরি সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। অথচ এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার দুর্বলতার পাশাপাশি সরকারের এ ব্যাপারে সদিচ্ছার অভাব আছে। এর ফলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ঋণখেলাপি প্রসঙ্গে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। সে কারণে খেলাপি ঋণ না কমে শুধু বেড়েই চলেছে। এ ছাড়া যাচাই-বাছাই ছাড়া যেসব নতুন ঋণ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোও খেলাপিতে যোগ হচ্ছে।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: অর্থনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.