সোমবার ৪ পৌষ, ১৪২৪ ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ সোমবার

আ.লীগ, বিএনপি ও জাপায় গৃহদাহ, সুযোগ নিতে চায় ইসলামী দল

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৫ আসন। এই দুই উপজেলায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি দলীয় কোন্দলে জর্জরিত। প্রতিটি দল তিন ভাগে বিভক্ত, মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী। এতে তাদের নেতাকর্মীরা বিভ্রান্ত ও হতাশ। আর এর সুযোগ নিতে চাইছে ইসলামপন্থি দলগুলো। বর্তমানে এ আসনের এমপি হলেন জাতীয় পার্টির নেতা সেলিম উদ্দিন। কিন্তু এবার নিজস্ব প্রার্থী চাইছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে জামায়াতের অধ্যক্ষ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন। আগামী নির্বাচনেও বিএনপির কাছ থেকে আসনটি চাইছে তারা। কিন্তু বিএনপির নেতারা চান এ আসনে নিজ দলের ধানের শীষের প্রার্থী।

নৌকা পেতে সিলেট-৫ আসনে চলছে ক্ষমতার লড়াই। এ ছাড়াও বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে শুরু হয়েছে নির্বাচনী দৌড়ঝাঁপ। এ আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির কোন্দল ও মাঠে একাধিক প্রার্থী থাকায় সুযোগ নিতে চায় ইসলামী দলগুলো। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট ও আঞ্জুমানে আল-ইসলাহ এ আসনে ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন সচেতন ভোটাররা।

এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আছেন সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ হাফিজ আহমদ মজুমদার, গত নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েও দলের নির্দেশে ছেড়ে দিতে হয়েছে। ছাড় দেওয়া আরো নেতারা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আহমদ আল কবির, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডভোকেট মোস্তাক আহমদ।

২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় এবং পরবর্তীকালে কমিটি গঠন নিয়ে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ কোন্দালে আটকে আছে জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট আওয়ামী লীগ। এ কারণেই গত দুটি উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলটির প্রার্থীরা পরাজিত হন। তৃণমূল পর্যায়ে দলের অনেক সমর্থক ও কর্মী থাকলেও তারা রয়েছেন বহুধাবিভক্ত। দলে রয়েছে শৃঙ্খলার অভাব। বর্তমানে জকিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগে তিনটি গ্রুপ রয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপ হাফিজ আহমদ মজুমদার সমর্থিত, একটি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুক উদ্দিন আহমদ সমর্থিত আর অন্যটি ড. আহমদ আল কবির সমর্থিত। এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদে এম এ লতিফ, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে হাফিজ আহমদ মজুমদার আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি নির্বাচিত হন। জকিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি লোকমান উদ্দিন চৌধুরী বলেন, হাফিজ মজুমদার অসুস্থ নির্বাচনে তার আগ্রহ নেই। তৃণমূলের মতামত অনুযায়ী দল যাকেই মনোনয়ন দেবে, নেতাকর্মীরা তার পক্ষেই কাজ করবেন।

অন্যদিকে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে এ আসনটি জামায়াতকে ছেড়ে দেবে বলে শোনা যাচ্ছে। তবে জকিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল আহমদ বলেন, সিলেট-৫ আসনের মানুষ আগামীতে ধানের শীষে ভোট দিতে চায়। বিএনপির লোককেই ধানের শীষ প্রতীক দিতে হবে। অন্য দলের কাউকে প্রার্থী দিলে তাকে বয়কট করবে বিএনপি।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন সাবেক এমপি আবুল কাহির চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর ভাই, জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও কানাইঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ও কানাইঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি, জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন (চাকসু মামুন)। এ ছাড়া জকিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল আহমদ, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান পাপলু, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক চৌধুরী (ভিপি মাহবুব) দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে আব্দুল কাহির চৌধুরী এ আসনে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন আশিক চৌধুরী। খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে অংশ নিয়ে জামানত হারিয়েছিলেন।

জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট বিএনপির একাংশ বর্তমানে নিখোঁজ কেন্দ্রীয় নেতা ইলিয়াস আলীর সমর্থক, অন্য অংশ প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান গ্রুপের অনুসারী। দলীয় কোন্দলের কারণে দুটি পৌরসভায়ই দলীয় প্রার্থীরা পরাজিত হন। জকিগঞ্জ-কানাইঘাট বিএনপি এখন ঘরের আগুনে পুড়ছে। নেতাদের দলাদলিতে দলের সাধারণ কর্মী ও সমর্থকরা বিভ্রান্ত। দ্বিধাদ্বন্দ্ব, হতাশা আর নিষ্ক্রিয়তা ভর করেছে অনেকের মধ্যে।

অন্যদিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে বর্তমান এমপি সেলিম উদ্দিন এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাব্বির আহমদ জাপার লাঙল প্রতীক নিয়ে এ আসনে লড়তে চান। জাপার কেন্দ্রীয় সদস্য, সিলেট জেলা জাপার যুগ্ম আহ্বায়ক শিল্পপতি সাইফুদ্দিন খালেদ, জাপার কেন্দ্রীয় সদস্য, জাতীয় ছাত্রসমাজ সিলেট জেলার সাবেক সভাপতি ব্রিটেন প্রবাসী শিল্পপতি এম জাকির হুসেইন এবং নবম সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী জাপা নেতা এম এ মতিন চৌধুরী এ আসনে জাপার মনোনয়নপ্রত্যাশী।

এ ছাড়া আদালতের রায়ে দলের নিবন্ধন হারানোর পর ভিন্ন কৌশলে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। যেসব আসনে জোট জামায়াতকে ছাড় দেবে এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সিলেট-৫। বৃহত্তর সিলেটে জামায়াতের একমাত্র আসন এটি। দলটির নেতাদের দাবি, আগামী নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীকে স্বতন্ত্র অথবা বিএনপির সঙ্গে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রার্থিতায় দেখা যেতে পারে।

নবম সংসদ নির্বাচনে মহাজোটকে সমর্থনকারী আঞ্জুমানে আল ইসলাহর সভাপতি মাও. হুসাম উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলীকে এ আসনে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন তার সমর্থকরা। ফুলতলীর পীর প্রয়াত আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলীর দল আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইসির নিবন্ধিত না হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বা মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে আসতে পারেন হুছামুদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী। বৃহত্তর সিলেটে সংসদের ১৯টি আসনেই ফুলতলীর অনুসারী রয়েছেন। গত সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থীদের বাক্সে পড়েছিল সংগঠনটির সমর্থকদের ভোট।

খেলাফত মজলিস ইতোমধ্যে দলের যুক্তরাজ্য শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এনামুল হাছান ছাবিরকে এ আসনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ওবায়দুল্লাহ ফারুক, কারি আবদুল হাফিজ ও আবদুর রহমান সিদ্দিকীর নাম শোনা যাচ্ছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী হিসেবে। এ আসনে ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে মাওলানা ওবায়দুল হক এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগ, বিএনপির মতো জাতীয় পার্টিতেও রয়েছে কোন্দল। জকিগঞ্জ জাপা এখন তিন টুকরা। বর্তমান এমপি সেলিম উদ্দিনের সঙ্গে রয়েছেন একাংশ। অন্য দুই গ্রুপের একটি সাইফুদ্দিন খালেদের সমর্থক, অন্যটি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাব্বির আহমদের সমর্থক। কানাইঘাটেও একই অবস্থা। দলীয় কোন্দলের কারণে কর্মী ও সমর্থকরা হতাশ ও দ্বিধাগ্রস্ত।

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাব্বির আহমদ বলেন, ‘বিগত নির্বাচনে দলীয় প্রধানের নির্দেশে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছি। আশা করি, দল আমাকে হতাশ করবে না।’

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: রাজনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.