বুধবার ২৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ বুধবার

আশাবাদী আ.লীগ, ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিএনপি

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: জেলার তিনটি আসনের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো সদর আসন। ফেনী পৌরসভা ও সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে ফেনী-২ সদর আসন গঠিত। এখান থেকে যারা নির্বাচিত হন, তাদের হাতেই থাকে পুরো জেলা নিয়ন্ত্রণের লাগাম। জেলা সংগঠনের মূল ভূমিকায়ও থাকেন তারা। একসময় ‘লেবানন-খ্যাত সন্ত্রাসের জনপদ’ বলে অভিহিত করা হতো ফেনীকে। এখন সে পরিস্থিতি কেটে গেছে। বর্তমানে ফেনী সদর-২ আসনের এমপি রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী। তিনি ‘সন্ত্রাসের জনপদ’কে শান্তির জনপদে পরিণত করেছেন বলে প্রচারণা আছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন। ওই সময় জেলার তিনটি আসনই বিএনপির হাতছাড়া হয়। আসনটি বিএনপির দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। এ আসনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী আওয়ামী লীগ, অপরদিকে নিজেদের পুরোনো অবস্থান ফিরে পেতে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিএনপি।

এ আসনে দুই জয়নালের লড়াই চলত বছরজুড়ে। বিএনপির ভিপি জয়নাল আর আওয়ামী লীগের জয়নাল হাজারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সমানে সমান। ১৯৯৬ সালে জাসদ থেকে ফেনী জেলা বিএনপিতে যোগ দেন ফেনী সরকারি কলেজের ভিপি অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন। এর আগে ১৯৮৮ সালে জাসদ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে সদর আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়নাল হাজারীকে পরাজিত করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন তিনি। জয়ের ধারা অব্যাহত রাখেন ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও। এ সময় আওয়ামী লীগ প্রার্থী, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীকেও বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী পরিবারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত আলাউদ্দীন আহমেদ চৌধুরী নাসিমের সমর্থন রয়েছে নিজাম হাজারীর প্রতি। ফেনীকে সন্ত্রাসমুক্ত করার ক্ষেত্রে নিজাম হাজারীর বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

অপরদিকে, ফেনীতে মামলা হামলায় জর্জরিত বিএনপি। দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম পুলিশি বাধা ও অন্তর্কোন্দলে কিছুটা ছন্দ হারালেও থেমে নেই। বিএনপি নেতাকর্মীরা আলাদা আলাদা গ্রুপে বিভক্ত হলেও সিদ্ধান্তের ব্যাপারে দলের নেত্রীকে প্রাধান্য দেন। আগামী নির্বাচনে দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার নেতৃত্বে নির্বাচন করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন নেতাকর্মীরা।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মনে করছেন, মামলা হামলা আর কোন্দলে জর্জরিত বিএনপি মাঠে দাঁড়াতে পারবে না। জেলাজুড়ে যে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে, তা জারি রাখতে নিজাম হাজারীকেই প্রার্থী হিসেবে চাইছেন দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী। যেকোনো সময়ের চেয়ে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো অনেক শক্তিশালী বলে মনে করেন তারা।

নিজাম উদ্দিন হাজারী ২০১১ সালে ফেনী পৌরসভা নির্বাচনে তৎকালীন মেয়র বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল আবসারকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। তার সময়ে গত কয়েক বছরে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে ছয় উপজেলা, পাঁচ পৌরসভা, ৪৪টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং সর্বশেষ জেলা পরিষদের সব কটি পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হন। জানতে চাইলে নিজাম উদ্দিন হাজারী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী শেখ হাসিনা যাকে যোগ্য মনে করবেন, তাকে মনোনয়ন দেবেন। সে ক্ষেত্রে তিনি দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন।’

এ আসনে ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা ও সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। কিন্তু ভোটযুদ্ধে বিএনপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। এবারও দলীয় মনোনয়ন লাভের জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তিনি সময় পেলেই ছুটে আসেন নিজ বাড়ি শর্শদি ইউনিয়নের ফতেহপুরে। তিনি নিজ বাড়ির প্রবেশমুখে একটি হাফেজিয়া এতিমখানা খুলেছেন। তার প্রতি সাবেক এমপি জয়নাল হাজারীর সমর্থন রয়েছে বলে জানা গেছে। জানতে চাইলে মুঠোফোনে আলাপকালে ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন দিলে তিনি ফেনী সদর আসনে আবারও প্রার্থী হবেন। মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত ফেনী তার অঙ্গীকার বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সদর আসনের সাবেক এমপি জয়নাল হাজারীও এ আসনে প্রার্থী হবেন বলে শোনা যাচ্ছে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে গ্রেফতার এড়াতে ভারতে যান তিনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে দেশে ফিরে এলেও তিনি ফেনীতে থাকছেন না, ঢাকায় থাকছেন। এ ছাড়া ঢাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ফেনী চেম্বারের সভাপতি আ ক ম শাহেদ রেজা শিমুল ফেনী সদর আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, বিএনপির ভাঙনের সূত্রপাত ২০০৯ সালে। অভিযোগ রয়েছে, জেলার কিছু নেতার ইন্ধনে ফেনী বিএনপিতে বিভাজন আর বিভেদের রাজনীতির সূচনা করেন খালেদা জিয়ার ভাই সাইদ ইস্কান্দার। ভিপি জয়নালকে বাদ দেওয়ায় একটা রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয় বলে মনে করেন জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা। আলাপচারিতায় ভিপি জয়নাল বলেন, দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন তিনি। ২০০১ সালে কারাবরণ করেছেন। এ আসন থেকে তিনি তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী নির্বাচনে দল তাকে মনোনয়ন দেবে বলে আশাবাদী তিনি। এ আসনে ভিপি জয়নাল ছাড়া এবার দলের মনোনয়ন চাইতে পারেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-প্রশিক্ষণ সম্পাদক ও ফেনী সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি রেহানা আক্তার রানু। সরকারবিরোধী আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন তিনি। জানতে চাইলে রেহানা আক্তার রানু বলেন, ফেনীর তৃণমূল সংগঠনে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। কিন্তু প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে নেত্রী ও দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। নেত্রী দলীয় মনোনয়ন দিলে তিনি নির্বাচন করতে প্রস্তুত বলে নিশ্চিত করেন।

এদিকে দলের দুঃসময়ে জেলা বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন মিস্টার। দুঃসময়ের কা-ারি হিসেবে ফেনী সদর আসনে এমপি পদে এ নেতা মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। জিয়াউদ্দিন মিস্টার জানান, ত্যাগী নেতা হিসেবে তিনি অবশ্যই মনোনয়নের দাবিদার। তবে দল তাকে যোগ্য মনে করলে মনোনয়ন দেবে।

এদিকে, ফেনীর স্টারলাইন গ্রুপের এমডি ও জাপার কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হাজী আলাউদ্দীন, জেলা সভাপতি মোশাররফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমসহ পূর্ণাঙ্গ কমিটি আওয়ামী লীগে যোগ দিলে জাতীয় পার্টি নেতৃত্বশূন্য হয়ে যায়। জেলায় জাপার এমন দুঃসময়ে কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করছেন ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার নজরুল ইসলাম। ইতোমধ্যে জাপা থেকে তাকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে, নির্বাচন কমিশন দলের নিবন্ধন বাতিল করলেও জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ও সাবেক জেলা আমির অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঞা জোটের প্রার্থী হিসেবে এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: রাজনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.