মঙ্গলবার ৪ আষাঢ়, ১৪২৬ ১৮ জুন, ২০১৯ মঙ্গলবার

নিয়ন্ত্রণহীন দ্রব্যমূল্য, মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ

সাবরিনা শুভ্রা : দ্রব্যমূল্যের দৃশ্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। চাল, তেল, পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। চাল ও সবজির দাম বৃদ্ধির অজুহাত হিসেবে ব্যবসায়ীরা বন্যার কথা বলছেন। কিন্তু কিছু পণ্য আছে সরবরাহে ঘাটতি না থাকার পরও দাম বেড়ে গেছে। অর্থাৎ আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়াচ্ছে সিন্ডিকেট। আর এর মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ।
ব্যবসায়ীদের হাতে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার পেছনে সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দুর্বলতাকেও অনেকে দায়ী করেন। আমরাও মনে করি, টিসিবি ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। হাতেগোনা কিছু পণ্য মাঝেমধ্যে তারা খোলাবাজারে বিক্রি করে, যা বিদ্যমান বিশাল বাজার ব্যবস্থায় কোনো প্রভাবই ফেলতে পারে না। টিসিবির দুর্বলতার জন্য নিজস্ব তহবিলের অভাবের সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকেও দায়ী করা হয়। সরকার কেন টিসিবিকে সবল করার পদক্ষেপ নিচ্ছে না?
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি বাড়ছে বাসা ভাড়া, পরিবহন ভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা খাতে ব্যয়। সরকারি-বেসরকারি সেবার দামও বাড়ছে। সে অনুপাতে বাড়ছে না মানুষের আয়। ফলে জীবনযাত্রার মানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, ১৬ কোটি মানুষের দেশে ৯ কোটি ১০ লাখই অতিদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর। বাজার অস্থিতিশীল হওয়া মানেই দেশের বেশিরভাগ মানুষের ওপর চাপ পড়া। তাই সরকারকে বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই শুধু নয়, কর্মসংস্থানও বাড়াতে হবে। তখন উৎপাদন বাড়বে, বাড়বে ক্রয়ক্ষমতা। আয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির আঘাতও হয় সহনীয়।
তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশ। অধিকাংশ জনসংখ্যা এখানে দারিদ্র্যসীমার মধ্যে বাস করে। বর্তমানে দেশের অন্যতম আলোচ্য বিষয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। কালোবাজারি, মুনাফাখোর, মজুদদার প্রভৃতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য দ্রব্যগুলোর মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিদিন এবং ক্রমে এসব পণ্য সংগ্রহ কঠিনতর হচ্ছে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য। জনজীবন আজ বিপর্যস্ত, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষকে অর্ধাহার ও অনাহারে দিন কাটাতে বাধ্য করছে। মানুষের একটু ভালোভাবে বাঁচার দাবি আজ সর্বত্র। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাদের প্রতিকূলে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমাকে অতিক্রম করে অশ্বের মতো দ্রুতগতিতে বেড়ে চলছে।
দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে জীবনযাত্রার সম্পর্ক অতিনিবিড় এবং বাস্তব। একটি পরিবার কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনকে নির্বাহ করবে, তা নির্ভর করে তাদের আয়, চাহিদা এবং দ্রব্যমূল্যের ওপর। প্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের মূল্য যখন সহনীয় পর্যায়ে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, তখন তাদের জীবন কাটে স্বস্তিতে। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যখন সাধারণ মানুষের আর্থিক সংগতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায়, তখন দরিদ্র এবং অতিদরিদ্র পরিবারে চলে অর্ধাহার, অনাহার এবং পারিবারিক অশান্তি। তাই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে একদিকে জনজীবনে নেমে আসে কষ্টের কালো ছায়া, অন্যদিকে মুনাফাখোরি, কালোবাজারিদের কারণে দেশে বিরাজ করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বর্তমান এ যুগে ন্যায়সংগত মূল্যে কোনো পণ্যই আর পাওয়া যায় না। প্রতিটি পণ্যেই যেন অধিক মূল্যের আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। অথচ এক বা দুই দশক আগেও এ অবস্থা ছিল না। মানুষ জীবন কাটাত সাধ্যের মধ্যে ভালো থেকে। শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় আট মণ চালের কথা যেন এখন রূপকথা। ব্রিটিশ শাসনামালও দেশের দ্রব্যমূল্য ছিল নিয়ন্ত্রিত অবস্থায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর দেশের অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হলেও দ্রবের মূল্য সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে ছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর অর্থনৈতিক বিপর্যয়, দুর্ভিক্ষ ও মহামারী আমাদের জীবনে অতর্কিতে হানা দেয়। ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় অধিকাংশ দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে থাকে। আর এরই ধারবাহিকতার চরম পর্যায় হলো বর্তমান অবস্থা। ভবিষ্যতে এ অবস্থা আরও নাজুক যেন না হয়— এটাই সবার চাওয়া।
সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে। বেঁচে থাকার তাগিদ থেকেও কেউ কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। আমরা আশা করব, দৃশ্য ও অদৃশ্যমান সব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। নিশ্চিত করা হবে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের দুই বেলা আহারের নিরাপত্তা। যেসব দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা বাজারকে বারবার কব্জা করে নিচ্ছেন, সেগুলোরও নিরসন করতে হবে।

—সাবরিনা শুভ্রা
গবেষক, কলামিস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
shuvraa7@gmail.com

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: খোলা বাতায়ন,লাইফস্টাইল

Leave A Reply

Your email address will not be published.