বৃহস্পতিবার ৫ আশ্বিন, ১৪২৫ ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বৃহস্পতিবার

আমদানি করা এলএনজি যাবে শিল্প খাতে!

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: চট্টগ্রামে আগামী বছরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হচ্ছে আমদানি করা লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ। দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানি করা গ্যাস গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহের পরিকল্পনা আছে পেট্রোবাংলার। আমদানি করা গ্যাস মজুদ ও সরবরাহে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো মহেশখালী উপকূল থেকে কর্ণফুলী থানা এলাকা পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু আমদানি করা গ্যাস কী পরিমাণ আবাসিক খাত পাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা মিলছে না কারও কাছ থেকে। সংশ্লিষ্টদের অনেকেই বলছেন, শিল্প খাতের ঘাটতি মেটাতে আমদানি খাতের সব গ্যাস ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ, আমদানি করা গ্যাসের দৈনিক সরবরাহের সবটুকু যাবে শিল্প খাতে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) কর্মকর্তারাও সুনর্দিষ্টভাবে কিছু বলছেন না। কোম্পানির উপমহাব্যবস্থাপক খায়ের আহমদ আলোকিত বাংলাদেশকে জানান, দুই খাতেই ব্যবহার হবে এলএনজি। তার মতে, মহেশখালী উপকূল থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে স্টোরেজ ট্যাঙ্ক থেকে গ্যাস যুক্ত হবে মূল লাইনে। তাই এলএনজি শিল্প কিংবা আবাসিক খাতে যাবে- তা বিভক্ত করার সুযোগ নেই। তবে উপমহাব্যবস্থাপকের এ বক্তব্য নাকচ করে দিয়েছেন কোম্পানির অন্য এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, আবাসিক খাতে এলএনজি ব্যবহারের প্রশ্নই আসে না। আমদানি এলএনজির সবই যাবে শিল্প খাতে। কারণ, এ মুহূর্তে শিল্প খাতে ঘাটতি নিরসনের জন্য সরকারের কাছে ব্যবসায়ীদের চাপ আছে। আবাসিক খাতের গ্রাহকের সরবরাহ ঘাটতির খুব বেশি উন্নতি হবে না। এদিকে এলএনজি ব্যবহার নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় হতাশা প্রকাশ করেছেন সাধারণ গ্রাহক। তারা বলছেন, এলএনজি আমদানি শুরু হলে চুলায় গ্যাসের ঘাটতির জন্য চরম দুর্ভোগ থেকে নিস্তার মিলবে- এমন আশায় আছি। কিন্তু সাধারণ গ্রাহকদের সরবরাহ না দিয়ে ব্যবসায়ীদের খুশি করা হলে দুর্ভোগ কমবে না। এলএনজি আমদানির পর আবাসিক গ্রাহকের ক্ষোভ-হতাশা আরও বাড়বে। এলএনজি আমদানির উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

গেল জুলাইয়ে কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাওয়া এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেডের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। ঢাকার একটি হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর উপস্থিতিতে এ চুক্তি হয়। এ প্রকল্পে খরচ হবে ১৭৯ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সালের প্রথম দিক থেকে এলএনজির ব্যবহার শুরুর টার্গেট নেয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী মহেশখালীতে বিপুল এলএনজি রাখা যাবে। এটি হবে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। টার্মিনালে এলএনজি ধারণ ক্ষমতা হবে ১ লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার। ১৫ বছর পর টার্মিনালটি কোনো বিনিময় মূল্য ছাড়া পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তর করা হবে চুক্তি অনুযায়ী। এখন স্টোরেজ ট্যাঙ্ক নির্মাণসহ পাইপলাইন নির্মাণ কাজ চলছে। পাইপলাইন নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের পথে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেজিডিসিএলের বিতরণ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এলএনজি সরবরাহ শুরুর পরপরই বন্ধ শিল্প কারখানাগুলো চালু করা হবে। গ্যাসের সংযোগ পেতে ক্লিয়ারেন্স পাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতেও সরবরাহ শুরু হবে। এ সময় বাড়তি এলএনজির পুরোটাই যাবে শিল্প খাতে। আবাসিকের জন্য আর গ্যাস অবশিষ্ট থাকে কই। এলএনজিতে আবাসিকের সংকট কাটবে না, এটিই বাস্তবতা।
কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা এরই মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছে গেছে। অথচ এখন দৈনিক সরবরাহ পাওয়া যায় ২২৪ থেকে ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সাগরবক্ষের গ্যাসক্ষেত্র সাঙ্গু বন্ধ হওয়ার পর থেকে চট্টগ্রামে গ্যাসের আকাল চলছে। বঙ্গোপসাগরে নতুন করে কূপ খনন উদ্যোগের কোনো খবর নেই। খাগড়াছড়ির মানিকছড়ির সেমুতাং গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস আসছে একেবারেই কম। কোনো সময় দৈনিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আসে, কোনো সময় একেবারে সরবরাহ আসে না। গ্যাস ক্ষেত্রটি মূলত পরিত্যক্ত হতে চলেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
গ্যাসের ব্যাপক ঘাটতির কারণে রাউজান তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুইটি ইউনিটই এখন বন্ধ। ৪২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুই ইউনিটে দৈনিক ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার শিকলবাহা পিকিং পাওয়ার প্লান্টও গ্যাস সংকটে বন্ধ। বহুজাতির সার কারখানা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) সীমিত পরিমাণ গ্যাস নিচ্ছে। তা দৈনিক ৪ মিলিয়ন ঘনফুটের কম। চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল) গ্যাস নিচ্ছে দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। এটি এখন পুরোদমে চালু আছে।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রামের দুই সার কারখানার কোনো একটি পুরোদমে চালু হলেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাসের ঘাটতি বেড়ে যায়। এতে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। এখনও বিদ্যুতের দৈনিক গড় চাহিদা কমেনি। তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকায় লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরি বলেন, আবাসিক খাতের গ্রাহককে কোনোভাবেই বঞ্চিত করা যাবে না। এলএনজির বড় অংশ আবাসিক খাতের জন্য বরাদ্দ দিতে হবে। অন্যথায় চলমান দুর্ভোগ কমবে না।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, আন্দরকিল্লা, দেওয়ানবাজার, চকবাজার, ২ নম্বর গেট, নিউমার্কেট, বহদ্দারহাট, খতিবেরহাট, নন্দনকানন ও চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় সবখানে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। এসব এলাকায় দুপুর গড়াতেই চুলায় গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। রান্না করতে চরম দুর্ভোগে পড়েন গৃহিণীরা। অনেকে হোটেল থেকে খাবার এনে খান। কারণ, চুলা জ্বলে না। আবার অনেকে দিনের রান্নাবান্না ভোরের দিকে করে নেন।
খতিবেরহাট এলাকার বাসিন্দা মিরাজুর রহমান বলেন, দুপুর গড়াতেই চুলায় গ্যাস সংকট দেখা দেয়। প্রায় প্রতিদিন এ অবস্থা। এতে রান্না করা যায় না। আশা করছি, এলএনজি সরবরাহ শুরু হলে দুর্ভোগ কিছুটা কমবে। কিন্তু আবাসিকে এলএনজি সরবরাহ না দিয়ে শিল্প কারখানায় সরবরাহ দেয়া হলে জনদুর্ভোগ থেকেই যাবে।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: অর্থনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.