বৃহস্পতিবার ৫ আশ্বিন, ১৪২৫ ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বৃহস্পতিবার

সমঝোতা কোন পথে

প্রতীক ইজাজ ও গাজী শাহনেওয়াজ: সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন আয়োজিত সংলাপ শেষ হয়েছে গত মঙ্গলবার। সংলাপে রাজনৈতিক দলসহ অংশ নিয়েছিল নির্বাচনী অংশীজনরা। সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রসঙ্গ এসেছে ঘুরেফিরে। সংসদের বাইরে বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে-এমন আশাবাদ প্রকাশ করেছেন স্বয়ং প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। ১৫ অক্টোবর সংলাপ শেষে নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী ছিল বিএনপিও। কিন্তু সংলাপ শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় সেই আশাবাদ ঘিরে সংশয় দেখা দিয়েছে। আবারও সামনে চলে এসেছে নির্বাচন পদ্ধতি ও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধান দুই বিতর্ক। এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে ইসি ও সংসদের বাইরে বিরোধী দল বিএনপি।

সংলাপ শেষে গত বৃহস্পতিবার সিইসি কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, নির্বাচনী ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেখা দেওয়া রাজনৈতিক বিরোধ সমঝোতার কোনো উদ্যোগ নির্বাচন কমিশন নেবে না। সেগুলো রাজনৈতিকভাবেই সমাধান হওয়া ভালো বলেও মনে করেন সিইসি। সিইসি এমনও বলেছেন, সংলাপে আসা সুপারিশগুলোর মধ্যে যেসব সুপারিশ নির্বাচন কমিশনের নিজের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলো ইসি বাস্তবায়ন করবে। যেগুলো সুপারিশের জন্য আইন প্রণয়ন করতে হবে, সেগুলো সরকারের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে পাঠানো হবে। আর যেগুলো সংবিধানসংক্রান্ত বিষয়, সেগুলো সরকারের কাছে পাঠানো হবে। সরকার যদি এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে, তাহলে তাদের ওপর চাপ দেওয়ার বা বাধ্য করার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেছেন সিইসি।

সিইসির এমন বক্তব্যের পর বিএনপির আশাবাদে সংশয় ফুটে উঠেছে। গত বুধবার ইসির সংলাপকে ‘একটা লোক দেখানো আইওয়াশ’ বলে মন্তব্য করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে তার একদিন পরই গতকাল নির্বাচনকালীন সরকার ও সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার না থাকলেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এবিষয়ে সাংবিধানিক সংস্থাটিকেই উদ্যোগ নিতে হবে বলে জানান তিনি।

এখন নির্বাচন ঘিরে দেখা বিএনপি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যেকার বিপরীতমুখী অবস্থানের সমাধান কী হবে এবং সমঝোতার দায়িত্বই বা কে নেবে-এ নিয়ে শুরু থেকেই চলে আসা আলোচনা নতুন করে পেয়ে বসেছে। বিএনপিকে নির্বাচনে এনে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসির জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে; তেমনি বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে-আলোচনা হচ্ছে তা নিয়েও।

অবশ্য প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা শুরু থেকেই এবারের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে বলে দলের নেতাদের জানিয়ে আসছেন এবং সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সর্বশেষ গত ১৪ অক্টোবর শনিবার আওয়ামী লীগের যৌথসভায় ‘আলোচনার মাধ্যমে’ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ তৈরি, নির্বাচনে বিএনপি আসবে ও আগামী নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। অনুরূপ আশা প্রকাশ করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গত সোমবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আশা করছি বিএনপিসহ সব দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে। তিনি বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, প্লিজ ইলেকশনটা বর্জন করবেন না। জাতীয় স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে আমরা চাই আপনারা নির্বাচনে আসুন। আপনারা নির্বাচনে আসুন এটা জনগণও চায়, আমরাও চাই। তবে গতকালও রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা একটা সহায়ক সরকার চাই, সেনা মোতায়েন চাই। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। এটা আমাদের কথা নয়, এটা জনগণের কথা। তাহলে মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংকট সমাধান করে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মূল দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায় বলে মত দিয়েছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ও সংবিধান অনুযায়ী সরকারের বেধে দেওয়া পদ্ধতি অনুযায়ী নির্বাচন করবে ইসি। সেখানে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের আয়োজন করা এবং নির্বাচনকালীন সরকার, সব দলকে আস্থায় এনে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি-এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো এখতিয়ার ইসির নেই। সুতরাং এসব সংকট সমাধান করে সরকারকেই সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে।

বিশ্লেষকরা আরো বলেন, এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সংলাপ ও সংলাপে উঠে আসা বিভিন্ন প্রস্তাব প্রসঙ্গে সিইসির মন্তব্যের মধ্য দিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের দায়িত্ব কিছুটা বেড়ে গেল। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় ইসিকে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করেই নির্বাচনে যেতে হবে; সে ক্ষেত্রে ইসিকে ক্ষমতা প্রয়োগের কতটুকু সুযোগ দেবে সরকার, তার ওপর নির্ভর করছে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা এমনও মনে করছেন, নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংকট সমাধানের দায়িত্ব কেবল সরকারের একার নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোরও। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে সরকারের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, সিইসি সংবিধান অনুযায়ী ও সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে সংলাপে উঠে আসা প্রস্তাব গ্রহণ ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে কথা বলেছেন, তা যথার্থ। এতে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের দায়িত্ব বাড়ল। কারণ ইসি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী হলেই যে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, তা নয়। সরকারেরও সদিচ্ছা থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে ইসি গঠনের আগে রাষ্ট্রপতি যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করলেন, প্রধানমন্ত্রীরও উচিত হবে রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে নিরপেক্ষ নির্বাচনের আবহ তৈরি করা। পাশাপাশি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে বিএনপির দায়িত্ব বাড়ল বলেও মনে করেই এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তার মতে, বিএনপির উচিত হবে যুক্তিসংগত কথাবার্তা বলা ও যুক্তির মধ্যে থেকে সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া।

কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কী ভাবছে-জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুুর রাজ্জাক বলেন, নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি। এ নিয়ে নতুন করে আর কিছু বলার নেই। সংবিধানে যেভাবে বলা আছে, সরকার সেভাবেই নির্বাচন করবে। নির্বাচনকালীন সরকার প্রধান হবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার অধীনেই নির্বাচন হবে।

এ ব্যাপারে দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কোন বিষয়ে কতটুকু দায়িত্ব সংস্থাটি পালন করতে পারবে, কোন বিষয়ে তাদের এখতিয়ার কতটুকু, সেসব আইনে উল্লেখ আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার জন্য মধ্যস্থতা করার সাংবিধানিক ক্ষমতা কমিশনের নেই। কমিশন সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানাতে পারে। তিনি আরো বলেন, সব রাজনৈতিক দল যেন আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়, এ বিষয়ে সরকারের যা দায়িত্ব, সরকার তা যথার্থভাবে পালন করছে। বিভিন্ন পদক্ষেপও নিয়েছে সরকার। সরকার গত নির্বাচনের সময়ও চেয়েছে, এখনো চাইছে-সব দল অংশ নিক। গত সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে বিএনপির চেয়ারপারসনকে ফোন করেছেন, নির্বাচনে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বিএনপি সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেয়নি। তারা নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছে। এর জন্য সরকার বা নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করার কোনো সুযোগ নেই।

তবে নির্বাচন সুষ্ঠু করা ইসির একার পক্ষে সম্ভব নয়-বলে মত দিয়েছেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. শামসুল হুদা। তিনি বলেন, পলিটিক্যাল পার্টিগুলোরও নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্যে দায়িত্ব আছে। গত নির্বাচনে (দশম জাতীয় সংসদ) যেমন কালচার অব বয়কট হয়েছে; সুতরাং এবার পলিটিক্যাল পার্টিগুলোকে সজাগ থাকতে হবে, সবাই যেন নির্বাচন করেন। সে মনোবৃত্তি যেন হয়। বিএনপি যদি এবারও নির্বাচন বর্জন করে, তা হলে মুশকিল আছে। এবার সব পার্টিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাতে হবে।

অবশ্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, কীভাবে নির্বাচন হবে, সেটি কিন্তু সংবিধানের ১১৮ থেকে ১২৬ অনুচ্ছেদের মধ্যে রয়েছে। নির্বাহী বিভাগ ইসিকে সহযোগিতা করবে। এটি তাদের দায়িত্ব নয়, কর্তব্য। করতেই হবে। নতুবা অপরাধ বলে গণ্য হবে। ইসি স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন করবে। সংবিধানেই বলা আছে, নির্বাচনের সময় কী ধরনের সরকার হবে। সেনা মোতায়েন হবে কি না-তা বর্তমান আরপিওতে উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং সংলাপে যেসব প্রস্তাব এসেছে, সেগুলো পরস্পরবিরোধী হতে পারে, কিন্তু সংবিধানবহির্ভূত না । সুতরাং উদ্বেগের কিছু নেই। তবে সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: খোলা বাতায়ন,রাজনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.