শুক্রবার ২ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১৬ নভেম্বর, ২০১৮ শুক্রবার

পরমাণু ইস্যুতে ৬ জাতি চুক্তি

আবদুর রহমান: পরমাণু ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে করা ছয় জাতি চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে প্রতীয়মান হয় যে, ১৫ বছর আগে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে যে ভুল করেছিল মার্কিন প্রশাসন, সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চলেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্পের অভিযোগ, ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সমৃদ্ধ করছে এবং চুক্তি ভঙ্গ করে পাশাপাশি পরমাণু অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমও গোপনে চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি জানিয়েছেন, নিজ দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে তারা ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরি করছেন। এর সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচির কোনো সংযোগ নেই।

উল্লেখ্য, পরমাণু অস্ত্র বানাচ্ছে মর্মে ওবামা প্রশাসন ২০১২ সালে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনয়ন করে। সেই মর্মে জার্মানিসহ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের অব্যাহত কূটনৈতিক সাফল্যে ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির একটি চুক্তি সম্পাদিত হয় ২০১৫ সালে। যাতে ইরান অঙ্গীকার করে যে, তারা পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করবে এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত থাকবে। কোনো হুমকিধামকি নয়, বরং বারাক ওবামার কূটনৈতিক সাফল্যের ফসল ছিল ওই ছয় জাতি চুক্তি। গত ১৪ অক্টোবর সেই কাঙ্ক্ষিত চুক্তিটি থেকে ট্রাম্প নিজেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ায় হতবাক বিশ্ব নেতৃত্ব। এরইমধ্যে জার্মানিসহ নিরাপত্তা পরিষদের অপর স্থায়ী চার সদস্য দেশ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। পরমাণু অস্ত্র তৈরি ও সন্ত্রাসবাদে ইরানের সহায়তার অভিযোগ এনে ছয় জাতি চুক্তিটি বাতিল করার ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি চীন সফরে এসে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ যুক্তরাষ্ট্রকে ছয় জাতি চুক্তিটি বাতিল না করার পরামর্শও দিয়েছিলেন। কিন্তু বিধিবাম পরমাণু ইস্যুতে কোরিয়ার সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্প এমন একটি হঠকারী ঘোষণা দিলেন। যা নিরাপদ বিশ্বের স্বার্থে কখনই কাম্য ছিল না। যদি চুক্তিটি বাতিল হয়, সে ক্ষেত্রে ইরান চুক্তিমুক্ত হয়ে পরমাণু অস্ত্র নির্মাণে উদ্যোগ নেবে নিঃসন্দেহে। কেননা তাদের তো পরমাণু কর্মসূচি রয়েছেই। সে ক্ষেত্রে বিশে^ আরেকটি পরমাণু বোমাসমৃদ্ধ দেশের সংখ্যা যোগ হবে। তাই হলফ করে বলা যায়, পরমাণু ইস্যুতে ভুল পথেই হাঁটছে মার্কিন প্রশাসন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভুল নীতিই বিশ্বকে পারমাণবিক যুদ্ধের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। আজকের যে হাইড্রোজেন ও পরমাণু বোমাসমৃদ্ধ উত্তর কোরিয়া, এর জন্য দায়ী মূলত মার্কিন ভুল নীতি ও প্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার খায়েশ। কেননা ১৯৯৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র তৈরি বন্ধ করতে অনেক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় দ্বিপাক্ষিক একটি চুক্তি সম্পাদন করেছিল। যদিও চুক্তিটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছিল, তবুও চুক্তিটি বলবৎ থাকলে হয়তো উত্তর কোরিয়া পরমাণু বোমা নিয়ে নিজেদের আত্মপ্রকাশ থেকে পিছু হটত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটি বাতিল করায় উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে সুযোগ করে দিয়েছিল। যার ফলে আজকের দাপুটে ও বেপরোয়া উত্তর কোরিয়া। চুক্তি অমান্য করে উত্তর কোয়িরা পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে লিপ্ত থাকার অভিযোগ এনে ২০০০ সালে সে চুক্তি বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র। তাই ২০০১ সালের জানুয়ারিতে উত্তর কোরিয়া ঘোষণা দেয় যে, তারা পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। পরিশেষে ২০০৬ সালে উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে নিজেকে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়। ঠিক তখন থেকেই পরমাণু ইস্যুতে টানাপড়েন শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে।

পরমাণু ইস্যুতে উভয় দেশের উত্তেজনা চরমে পৌঁছে উত্তর কোরিয়া কর্তৃক হোয়াসং-১২ নামের হাইড্রোজেন বোমাসমৃদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কারণে। যেটি হিরোশিমায় আঘাত হানা বোমার চেয়েও ১০ গুণ শক্তিসম্পন্ন ও ৪৫০০ কিলোমিটার দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম। এদিকে নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক ষষ্ঠবারের মতো অবরোধের শিকার হলো উত্তর কোরিয়া। যুক্তরাষ্ট্রও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উনের মধ্যে শুরু হয় তুমুল বাগযুদ্ধ। এদিকে পরমাণু ওয়ার হেড বহনে সক্ষম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে উত্তর কোরিয়া-এমনটা জানিয়েছেন সম্প্রতি উ. কোরিয়া ভ্রমণকারী তিন রাশিয়ান কূটনীতিক। যেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানতে সক্ষম। আর সেজন্যই চরম উদ্বেগে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন এবং হুমকি দিয়েছে উত্তর কোরিয়ায় পরমাণু বোমা হামলা চালানোর। সেইসঙ্গে উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলায় প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি গুয়াম ও হাওয়াই-এ তারা মোতায়েন করেছে ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী প্রযুক্তি থার্ড। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়াতেও মোতায়েন করেছে একই প্রযুক্তি। নতুন করে অবরোধ আরোপে ও ট্রাম্পের হুমকিতে স্পষ্ট প্রতীয়মান যে, কোরীয় সংকট আরো ঘনীভূত হয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি অবশ্যম্ভাবী করে তুলবে। যা বিশ্বয়নের যুগে অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিরাট চ্যালেঞ্জ।

অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা যে উত্তর কোরিয়া থোরাই কেয়ার করে তার প্রমাণ তারা আগেই দিয়েছে। তাছাড়া দূরপ্রাচ্যে মার্কিন আগ্রাসন নীতি, চিরবৈরী জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ার হাত থেকে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন করেছে। কেননা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সংঘটিত কোরীয় যুদ্ধে (১৯৫০-৫৩) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রত্যক্ষ সামরিক-অর্থনৈতিক সহযোগিতা করেছিল দ.কোরিয়াকে। সে সময় ভারত-জাপানও সমভাবে সমর্থন দিয়েছিল দ.কোরিয়াকে। সে যুদ্ধে চীন-রাশিয়াকে পাশে পেয়ে সার্বভৌমত্ব টিকিয়েছিল উ. কোরিয়া। যুদ্ধপরবর্তীতে দ. কোরিয়া ও জাপানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। লক্ষ্য উ.কোরিয়াকে নিশ্চিহ্ন করে আধিপত্য বাড়িয়ে চীনসহ এশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা। তখন থেকেই নিজ ভূখণ্ড রক্ষা করতে চীন-রাশিয়ার পরোক্ষ সহযোগিতায় পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের কাজে হাত দেয় উ.কোরিয়া। অব্যাহত পশ্চিমা হুমকিধামকিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রথমবারের মতো ২০০৬ সালে পরমাণু বোমা পরীক্ষা চালিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। তাই কোরীয় সংকটে দায়ী মার্কিন আগ্রাসননীতি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এশিয়ায় আধিপত্য খর্ব করতে উত্তর কোরিয়াকেই ট্রাম্প কার্ড হিসেবে বেছে নিয়েছে চীন-রাশিয়া। তাই উত্তর কোরিয়াকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে উক্ত দুই বন্ধুপ্রতিম সমাজতান্ত্রিক আদর্শিক দেশ। কিম জং উনও ভালো করেই জানেন যত দিন চীন-রাশিয়া পাশে আছে তত দিন তাদের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর সাহস পাবে না মার্কিন প্রশাসন। উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা অর্জনে ওই দুই দেশের ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য। কেননা চীন-রাশিয়ার কাছ থেকেই উত্তর কোরিয়া অস্ত্র আমদানি করে। আবার উত্তর কোরিয়ার জ্বালানি চাহিদার নব্বই শতাংশ তেল রফতানি করে চীন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক ও পরমাণু হামলা করেই বসে, তবে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে বিশে^র জন্য। কেননা উ.কোরিয়া তখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেবে দ.কোরিয়া, জাপান এমনকি ভারতেও চালাতে পারে হামলা। আর কোরীয় উপদ্বীপে আগুন জ্বললে তার আঁচ বাংলাদেশেও এসে পড়বে। চীন-রাশিয়াও তখন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। এহেন পরিস্থিতিতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা বেড়ে যাবে। এতে ব্যাহত হবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা। পাল্টে যাবে বিশ্ব রাজনৈতিক মেরুকরণ। সে যুদ্ধে আমেরিকার জয়ী হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে জানিয়েছেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক প্রধান মাইকেল মোরেল। তিনি মার্কিন প্রশাসনের উদ্দেশ্যে বলেন, ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে—এক. উ.কোরিয়ায় সরাসরি সামরিক হামলা চালানো, কিন্তু সেক্ষেত্রে জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ এবং তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। দুই. উ. কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি মেনে নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এ ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত যুদ্ধ এড়িয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকট উত্তরণে দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে করা ছয় জাতি চুক্তিটি বাতিল না করে কূটনৈতিকভাবে সমাধানে এগিয়ে গেলেই ইরান বিরত থাকবে পরমাণু বোমা নিয়ে আত্মপ্রকাশ থেকে। যা নিরাপদ বিশ্বের জন্য ও মানবিক বিপর্যয় এড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
mdlabu.journalist@gmail.com

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: খোলা বাতায়ন

Leave A Reply

Your email address will not be published.