বৃহস্পতিবার ১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১৫ নভেম্বর, ২০১৮ বৃহস্পতিবার

জিহ্বাতে মেতে আছি, প্রাণহানিতে কষ্টে নেই

  • কবির য়াহমদ

রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে দেড়শতাধিক লোকের প্রাণহানী হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন অনেকেই। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। অসংখ্য বাড়িঘর বিধ্বস্ত, বিদ্যুৎ নেই, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন; যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবে নিত্যব্যবহার্য পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি পড়েছে। ফলে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে হু-হু করে। পাহাড়ধসের কারণে আক্রান্ত মানুষদের বাইরেও যারা তারাও পড়েছেন সংকটে।

পাহাড়ধসের সরকারি উদ্ধার অভিযানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে শুক্রবার। সরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ১৫৬। এর বাইরেও নিখোঁজ আছেন অনেকেই। প্রশাসন নিখোঁজের ব্যাপারটি অস্বীকার করছে না, বলছে তারা খবর পেলে ফের উদ্ধার অভিযানে নামবে। ফলে ধারণা করা যায়, মৃতের সংখ্যা উদ্ধার হওয়া লাশের চাইতে বেশি হতে পারে।

পাহাড়ধসের প্রথম দিনেই উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া চার সেনাসদস্য মাটিচাপা পড়ে মারা যান। আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সেনাসদস্যদের নিহতের খবর নিশ্চিত করার সাথে সাথেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী সুইডেনে উদ্দেশ্যে লন্ডন হয়ে ঢাকা ছাড়ার সময়ে এ দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ হলেও শোক প্রকাশ করেছেন। ধারণা করা যায়, এটা প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের রুটিন এক্টিভিটি; তাই বিমানে থাকলেও শোকের বার্তা দেওয়া সম্ভব। জানি না, প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাহাড়ধসের ঘটনা পরিপূর্ণভাবে জানানো হয়েছিল কীনা? জানানো হয়েছিল কীনা সেখানকার মানবিক বিপর্যয়ের প্রকৃত চিত্র? তবে অনুমান করা যায়, যতখানি জেনেছেন ততখানি প্রকৃতের চেয়ে কিছুটা হলেও কম।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এহেন এক্টিভিটি সম্পর্কে কেন সন্দিহান তার পেছনে সুস্পষ্ট কারণ বিদ্যমান। প্রধানমন্ত্রী সুইডেনের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছেন ১৩ জুন। লন্ডনে ছিল তাঁর যাত্রাবিরতি, সেখানে তিনি ব্রিটিশ কমন্সসভার নবনির্বাচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দুই এমপি রোশনারা আলী ও টিউলিপ সিদ্দিককে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এছাড়াও লন্ডনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনি মিলিত হয়েছেন। ১৩ জুন থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত এত প্রাণহানির পরেও প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা ওই শোকপ্রকাশই! এরবাইরে সরকারপ্রধানের এক্টিভিটি দেখে মনে হয় নি দেশে এতবড় এক দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, দেড়শতাধিক লোক প্রাণ হারিয়েছেন, নিখোঁজ আরও অনেকেই, প্রশাসন আপ্রাণ চেষ্টা করছে জীবিত-মৃত সকলকে উদ্ধার করতে।

স্বাভাবিকভাবেই আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আমাদের নেতা-নেত্রী, সরকার, প্রশাসন মানবিক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মানবিক। কিন্তু মানবিক একজন প্রধানমন্ত্রী কীভাবে এমন নির্বিকার থেকে পারিবারিক পুনর্মিলনকে উপভোগ করতে থাকেন? দেশে লাশের পাহাড় রেখে, অথবা সেটাকে ডিঙিয়ে বিদেশ সফরে যেতে পারেন? এখানে হয়ত ‘কম্যুনিকেটিভ গ্যাপ’ হয়ে গেছে, প্রকৃত তথ্য যাচ্ছে না, যায় নি প্রধানমন্ত্রীর কাছে! যদি সত্য হয় এ আশঙ্কা তবে কারা করছে, কেন করছে, কীইবা তাদের উদ্দেশ্য?

প্রধানমন্ত্রী যতক্ষণ লন্ডন ছিলেন ততক্ষণে লাশের সংখ্যা দেড়শ ছাড়িয়ে গেছে। ততক্ষণে অসহায় মানুষের আর্তচিৎকার, হাহাকারে ভারী হয়েছে প্রতিবেশ; তবু কেন তাঁর ভূমিকা স্রেফ এক শোকবাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল?

এরই মধ্যে ১৪ তারিখে লন্ডন থেকে স্টকহোমে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী ও রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সুইডেনে বাংলাদেশিদের এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহবান জানিয়েছেন, আগামীতে বিএনপি পূর্বের মত নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার মত সিদ্ধান্ত নেবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু একবারও রাঙামাটি সহ পাঁচ জেলায় পাহাড়ধসে নিহতদের প্রতি একটি বাক্যও উচ্চারণ করেছেন বলে কোনো গণমাধ্যমে সংবাদ আসে নি। ফলে স্বাভাবিক প্রশ্ন এসে যায়, তাহলে তিনি কি পাহাড়ের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত নন?

বলা হতে পারে, বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে কেউ কোনো তথ্য জানবে না তা অসম্ভব। কিন্তু এর বাইরে সত্য হলো আমরা যতই ডিজিটাল বাংলাদেশ, তথ্য-প্রযুক্তির বিশ্ব বলি না কেন এসব নীতিনির্ধারকদের কাছে এখনও স্রেফ কাগুজে বিজ্ঞাপন। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়া আওয়ামী লীগ সরকার তথ্য-প্রযুক্তির দিক থেকে বাংলাদেশকে অনেকখানি এগিয়ে দিলেও সরকারের মন্ত্রী, এমপিগণ এখনও এ থেকে বেশ খানিকটা দূরেই অবস্থান করছেন। ফলে তথ্য-প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তথ্যের সন্নিবেশ কিংবা তথ্য সংগ্রহের সুফল উপভোগে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিগণ নিজ থেকে আগ্রহী নন; এক্ষেত্রে এখনও তারা অন্যের উপর নির্ভরশীল। একারণে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাঁকে যে এবং যতটুকু তথ্য দিচ্ছেন সেটাই হয়ে যাচ্ছে সর্বশেষ তথ্য। পাহাড়ধসের কারণে দেড়শতাধিক লোকের প্রাণহানি এবং অগণন মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি এর কবলে পড়ে গেছে বলে আশঙ্কা করছি।

প্রধানমন্ত্রী লন্ডনের ব্যক্তিগত এবং সুইডেনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে শনিবার দেশে ফিরেছেন। এই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চলেছে, শেষও হয়েছে। এই চারদিনে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশায় সেখানে রীতিমত মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। খাদ্য ও পানীয় জলের অভাব, ত্রাণের অপ্রতুলতা সবকিছু মিলিয়ে দুর্দশার কবলে পাহাড় অধ্যুষিত রাঙামাটি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও সেখানে বিশেষ ব্যবস্থায় খাদ্য ও পানীয় পাঠানো হয়েছে এমন কোন খবরও আসেনি। এমন পরিস্থিতি, এতবড় এক দুর্ঘটনার শুরুর পর থেকে পুরোটা সময় পর্যন্ত তিনি দেশে ছিলেন না- এটা একজন মানবিক প্রধানমন্ত্রীর জন্যে মোটেই মানানসই কিছু নয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুইডেন সফর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দেশের পাঁচ জেলায় ভয়াবহ এ দুর্ঘটনার পরেও তিনি কীভাবে বিদেশ সফর করতে পারেন- এ নিয়ে প্রশ্ন তাদের? বিএনপি এ সফরকে আনন্দভ্রমণ হিসেবে আখ্যাও দিয়েছে। বিএনপির এসব প্রশ্নের মধ্যে আনন্দভ্রমণ নামের যে শব্দ রয়েছে সেখানে আপত্তি থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর দেশে থাকার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখের বিষয়টি নিঃসন্দেহে যৌক্তিক। সুইডেনে বাংলাদেশের যেকোনো সরকারপ্রধানের প্রথম সফর হওয়ার কারণে এসফরটি যে গুরুত্বপূর্ণ সেটা অস্বীকার করার উপায় নাই। এ সফরের মাধ্যমে সুইডেনের ব্যবসায়িরা হয়ত বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহও পাবে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী চাইলে নিশ্চয়ই এসফর কিছুটা হলেও সংক্ষিপ্ত অথবা পিছিয়ে দেওয়া যেত। আশা করা যায়, বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে এবং সভ্য দেশ হিসেবে সুইডেন এমন সিদ্ধান্তকেও সমর্থন করত। কারণ নিজ দেশের মানবিক বিপর্যয়, দুর্ঘটনার কারণে অনেক সরকারপ্রধানই এধরনের সফর পিছিয়ে দিয়েও থাকেন; এটা নজিরবিহীন কিছু নয়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী সেটা করেন নি। পাহাড়ে মানবিক বিপর্যয়, অগণন লোকের প্রাণহানির চাইতে সরকারের সাফল্যের খাতায় আরও এক পালক যোগ করে দিতে সুইডেন সফর অব্যাহত রেখেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এ সুইডেন সফরের প্রাপ্তি কী সেটা এখনই অনুধাবন করা সম্ভব না হলেও সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি তাঁর মানবিক চরিত্রকে খানিকটা হলেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন বলে সমালোচনা হচ্ছে। আর অন্যদিকে, দেশের সচেতন মানুষদের বাইরে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিও সরকারপ্রধানকে পাহাড়ের মানুষদের পাশে না দাঁড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত করছে কিন্তু এই সময়ে তারা কী করেছে? স্রেফ এক সংবাদ সম্মেলন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় দলটির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভির রুটিন বক্তৃতা। এর বাইরে বিএনপিরও কোন অনুভূতি নেই, পাহাড়ের মানুষদের জন্যে সংবাদমাধ্যমের সামনে তাদের কথার সমূহ ফুলঝুরি স্রেফ রাজনৈতিক বক্তব্য, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের প্রতি তাদেরও কোনো দরদ প্রকাশিত হয় নি।

রাঙামাটি সহ পাঁচ জেলায় পাহাড়ধসে নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা ও আহতদের পরিবারকে ৫ হাজার টাকা ও ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে- সেটা পর্যাপ্ত কীনা সেটা প্রশ্নে যাচ্ছি না। বলছি, আমাদের রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের দরদের কথা সেখানে আমরা আশাহত। প্রধানমন্ত্রী দেশে থেকে, সংসদের বিরোধিদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ঢাকায় বসে সংবাদ সম্মেলনের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গেলে কম লোক মারা যেত তা না, কিন্তু অন্তত সেখানকার অসহায় মানুষেরা কিছুটা হলেও সাহস পেত। ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় মানুষদের পাশে সামান্য এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানও দাঁড়ালে মানুষেরা কত সাহস পায় সেতো অন্য অনেক ঘটনায় নিজ চোখেই দেখা। সেক্ষেত্রে একজন প্রধানমন্ত্রী, একজন মন্ত্রী, একজন সংসদ সদস্য, একজন বিরোধিদলীয় নেত্রী এবং বিএনপির মত বড় একটি দলের মহাসচিব কিংবা চেয়ারপারসন দাঁড়ালে মানুষেরা কতখানি শক্তি সঞ্চয় করতে পারত সেটা বলাই বাহুল্য!

পাহাড়ে জীবনক্ষয়ের এমন অবস্থায় আমাদের জীবন কি থেমে যাবে? না, যাবে না; যাওয়ারও নয়! এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। ঘটনা-দুর্ঘটনা নিয়েই জীবন। অন্য অনেককিছুর মত আমাদের জীবনও চলছে। ইত্যবসরে, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে অভাবিত সাফল্য পেয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মত ক্রিকেটবিশ্বের প্রতিষ্ঠিত দুই শক্তিকে পেছনে ফেলে খেলেছে সেমিফাইনাল। সেমিফাইনালে শক্তিশালি ভারতের কাছে হেরে স্বপ্নযাত্রার ছেদ পড়েছে। ওই ম্যাচে ভারত অধিনায়ক ভিরাট কোহলি বাংলাদেশের মুশফিকুর রহিমের ক্যাচ ধরে জিহ্বা বের করে তাঁর দলের সাফল্যকে উদযাপন করেছেন। কোহলির এ উদযাপন আবার সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে। ভাবখানা এমন যে, কোহলি বাংলাদেশকে অপমান করেছেন, কিন্তু বিশ্বক্রিকেট, ফুটবল এবং অন্যান্য খেলার খবর যারা রাখেন তারা জানেন প্রায় সবখেলায়ই এমনসহ অসংখ্য কিম্ভূত উদযাপনের নজির রয়েছে। অধুনা ফুটবলের দুই জনপ্রিয় ফুটবলার লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কি এমন জিহ্বা বের করে সাফল্য উদযাপন করেন নি? করেছেন। তাহলে!

ভিরাট কোহলির কিম্ভুত উদযাপনের বিষয়টি এখন সকল পর্যায়ে আলোচনার বিষয়। পক্ষে-বিপক্ষে-তৃতীয় পক্ষে অনেকেই বিভক্ত। জিহ্বাতে মেতে আছে অনেকে, জিহ্বা নিয়ে মাতামাতি অনেকের। হায়, আমরা ভিরাটের জিহ্বাতে যতটা মেতে আছি, দেড়শ লোকের প্রাণহানিতে ততটা নয়! অথচ আমরা দাবি জানাতে পারতাম, পাহাড় রক্ষার; পাহাড়ের পরিবেশ রক্ষার। মানবসৃষ্ট কারণে পাহাড়ে যে বিপর্যয় ঘটেছে সেটা রোধ করার! -চ্যানেল আই

ডেস্ক/ক্যানি

Categories: খোলা বাতায়ন

Leave A Reply

Your email address will not be published.