মঙ্গলবার ১৪ আশ্বিন, ১৪২৭ ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ মঙ্গলবার

সিনহা কিলিং মিশন কার্যকর কেন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল? বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য!

অনলাইন ডেস্ক: সিনহাকে হত্যার পরই দ্রুততম সময়ে নীলিমা রিসোর্টে সিনহার কক্ষ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক ও ক্যামেরা। সূত্র বলেছে, এসব তথ্যপ্রমান এখন তদন্ত সংশ্লিষ্টের হাতে।

আঁটঘাট বেঁধে এগুচ্ছে তদন্ত কমিটি। ফাঁকফোকর বন্ধ করে মূল উৎপাটনই মূখ্য উদ্দেশ্য। গ্রেফতার আতঙ্কে অনেক রুইকাতলারাও। মেজর সিনহা ছিলেন দেশের সম্ভাবণাময় স্বপ্নবাজ মেধাবী এক তরূণ। তাঁর এই মর্মান্তিক অকাল পরিণতি নাড়া দিয়েছে সবাইকে।

‘জাস্ট গো’ নামে নিজের একটি ইউটিউব চ্যানেলের জন্য তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে আসেন টেকনাফে। সমূদ্র ঘেরা পাহাড়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে এসে অনুসন্ধিৎসু চৌকস সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর(অবঃ) সিনহা মুহম্মদ রাশেদ খান পেয়ে যান অন্ধকার জগতের অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্যপ্রমান। যা তাঁর জন্য কাল হলো? সিনহাকে হত্যার পরপরই নীলিমা রিসোর্টে সিনহার কক্ষে থাকা কম্পিউটার হার্ডডিস্ক ও অন্যান্য তথ্য প্রমান সরিয়ে ফেলা সন্দেহকে আরো ঘনিভূত করে?

তবে, হত্যাকারীদের সকল নীলনকশাই ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ত্বরিত হস্তক্ষেপের ফলে। অভিযুক্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাস ও এসআই লিয়াকত সহ ৭ আসামী এখন রিমান্ডে র্যাব হেফাজতে।

উল্লেখ্য, পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সেনাবাহিনী থেকে ২০১৮ সালে স্বেচ্ছায় অবসর নেয়ার পরই মেধাবী তরুণ মেজর সিনহা মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় এ্যাডভেঞ্চার ও প্রকৃতির নানা বিষয়ের উপর তথ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেন।

মুক্তমনা কর্মঠ সৃষ্টিশীল প্রকৃতির মেজর সিনহার পিতা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপ-সচিব মোঃ এরশাদ খান একজন মুক্তিযোদ্ধা। মেজর সিনহার বাড়ি যশোর জেলায়। তিনি বি.এম.এ লং কোর্সের ৫১ তম ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন। সেনাবাহিনী ছাড়াও এস.এস.এফ এ কাজ করেছেন।

গত ৩ রা জুলাই অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা ইউটিউবের ট্রাভেল ভিডিও ‘জাস্ট গো’ তৈরি করতে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে আসেন। সাথে ছিলেন ডিরেক্টর শিপ্রা, ক্যামেরাম্যান সিফাত এবং আরো একজন। উঠেন নৈসর্গিকতার চাদরে মোড়ানো টেকনাফের নীলিমা রিসোর্টে।

অচেনা দুর্গম পাহাড়,রাতের সমূদ্রের সঙ্গে সখ্যতা গড়তে লেগে যায় কিছুটা সময়। ভোর থেকে দিনব্যাপী শুটিং নিয়ে আনন্দে ব্যাস্ততম সময় কাটে তাদের। একদিন রাতের পাহাড় ও সমূদ্র ভ্রমনে বেরিয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে হঠাৎ রাতের সমূদ্রে ও আশেপাশে মানুষের অস্বাভাবিক তৎপরতা দেখে খটকা লাগে অনুসন্ধিৎসু সাবেক মেজর সিনহার।

তারপরই মোড় নেয় পরিকল্পনায়। তথ্যচিত্র নির্মাণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিবর্তন আনা হয়। শুরু হয় সমূদ্রাঞ্চলে অন্ধকার জগতের পেছনে সিনহার টিমের গোয়েন্দা তৎপরতা। তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর সন্দেহজনক তৎপরতার চালচিত্র। তথ্যভাণ্ডারও সমৃদ্ধ হয়।

হয়তো এরই শেষধাপে ৩১ জুলাই রাত ১০ টার সময় মেজর সিনহা ও সিফাত বাহারছড়া ইউনিয়নে ৭নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়ে আসেন রাতের ভিডিও ধারন করতে। এ খবর ওসি প্রদীপের কানে পৌঁছে যায়! বাঁধে বিপত্তি।

সেই রাতেই গুলিতে প্রাণ হারান নতুন ধারার এ্যাডভেনঞ্চার কাহিনীর নায়ক মেজর সিনহা। পেশাদার সাংবাদিকরা যা পারেননি,হয়তো এমন কিছু অজানা তথ্য সিনহার গোয়েন্দা ক্যামেরায় ধারন করা হয়েছিল!

যা ষাটের দশকে জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক রোমেনা আফাজের গোয়েন্দা কাহিনীর মিল খোঁজে পাওয়া যেতে পারতো? এসব তথ্য নিয়ে সাংবাদিক সাইদুর রহমান রিমনের অনুসন্ধানী এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে “মুখোশধারী এক বসের ঈশারায় ত্রিমুখী নিশ্ছিদ্র ছকে মেজর সিনহার নৃশংস হত্যাকান্ড”।

সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা টানা কয়েকদিন ইয়াবা বাণিজ্যের নেপথ্য কাহিনী নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরিকালেও ‌বিপদমুক্ত’ ছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমারের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করাটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

ক্রসফায়ারের নামে নৃশংসভাবে খুন করা অসংখ্য মানুষের রক্তে রঞ্জিত প্রদীপ কুমারও ভিডিও সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় বারবারই কেঁপে উঠেন। মেজর সিনহা’র তথ্যবহুল প্রশ্নের পর প্রশ্নে চরম অস্বস্তিতে পড়েন ওসি। নানা অজুহাতে ভিডিও সাক্ষাৎকার এড়ানোর সব কৌশল খাটিয়েও ব্যর্থ ওসি প্রদীপ বাধ্য হয়েই প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে থাকেন, ভিডিওচিত্রে মেজরের উদঘাটন করা নানা তথ্যের সামনে সীমাহীন নাস্তানাবুদ হন তিনি। মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের দিন বিকেল চারটার দিকে টেকনাফের বহুল বিতর্কিত ওসি প্রদীপ কুমার দাস ওই ডকুমেন্টারি ভিডিও সাক্ষাৎকারের ফাঁদে পড়েন।

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক সূত্র জানায়, ক্রসফায়ারে অতিমাত্রায় উৎসাহী ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগিরা ইয়াবা বাজারজাত ও পাচারের ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকার কথা স্বীকার করতেও বাধ্য হন। সফল সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেই মেজর সিনহা আর একদণ্ড সময় ক্ষেপণ করেননি।

ঝড়ের বেগে থানা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের গাড়িতে উঠে বসেন। তার সঙ্গে ভিডিও রেকর্ডিংয়ে ব্যস্ত থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাতও ক্যামেরা, ট্রাইপড, ব্যাগ গোছাতে গোছাতেই ছুটে গিয়ে গাড়িতে উঠতেই টেকনাফ সদর ছেড়ে গাড়িটি ছুটতে থাকে উত্তর দিকে, বাহারছড়ার পথে। বাহারছড়া সংলগ্ন মারিসঘোণা এলাকাতেই বসবাস করেন চলচ্চিত্রের ফাইটিং গ্রুপ পরিচালনাকারী ইলিয়াস কোবরা। হঠাত তার টেলিফোনে করা আমন্ত্রণ পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারেননি মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান।

এদিকে থানা থেকে মেজর সিনহা বেরিয়ে যেতেই ওসি প্রদীপ অচিরেই বড় রকমের বিপদের আশঙ্কায় তৎক্ষনাত কক্সবাজারের (বস্ কে) এসপি মাসুদকে ফোন করে বিস্তারিত জানিয়ে দেন। সব শুনে বস্ (এসপি) নিজেও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কয়েক মিনিটেই বসের (এসপির) নির্দেশনায় তৈরি হয় ‌মেজর সিনহা’র নৃশংস হত্যার নিশ্ছিদ্র পরিকল্পনা।

আলাপ আলোচনা শেষে বস-ওসি এমনভাবেই ত্রিমুখী মার্ডার মিশন সাজিয়েছিল- সেই ফাঁদ থেকে মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের প্রাণে বাঁচার কোন সুযোগই ছিল না। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলচ্চিত্রের ফাইটিং গ্রুপের পরিচালক ইলিয়াস কোবরএক দায়িত্ব দেওয়া হয়, আতিথেয়তার নামে নানা কৌশলে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেজর সিনহাকে তার নিভৃত পাহাড়ি গ্রামে আট্কে রাখার।

এই কোবরা সাবেক ওসি প্রদীপ কুমারের ফাঁদে পা দিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন (চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার পরিচিতি থাকলেও ইলিয়াস কোবরা ইদানিং ‌‍’ক্রসফায়ার মিট মিমাংসার দালালি’ কাজেই সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। ক্রসফায়ারের তালিকায় নাম থাকার গুজব ছড়িয়ে অসংখ্য মানুষকে গোপনে ওসি প্রদীপের সঙ্গে সমঝোতা করিয়ে দিয়ে টেকনাফের শীর্ষ দালাল হিসেবে বেশ নামডাক ছড়িয়ে পড়েছে কোবরার। তবে ক্রসফায়ারের কবল থেকে জীবন বাঁচানোর সমঝোতায় ওসি প্রদীপ হাতিয়ে নিয়েছেন ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে দালালির কমিশন হিসেবে ইলিয়াস কোবরাকেও মাথাপিছু এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পাইয়ে দিয়েছেন প্রদীপ।)

ওসিসহ পুলিশ প্রশাসনের কাছে পরীক্ষিত দালাল ইলিয়াস কোবরা ঠিকই তার উপর অর্পিত দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। মারিসঘোণায় নিজের বাগানবাড়ি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার নামে ইলিয়াস কোবরা সেদিন বিকেল সাড়ে চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত নির্জন পাহাড়েই নিজ হেফাজতে রেখেছিলেন মেজর সিনহাকে। এসময় মেজরের অবস্থান, কতক্ষণ পর কোন রাস্তায় কোথায় যাবেন সেসব তথ্য জানিয়ে কোবরা ৯টি এসএমএস পাঠান ওসিকে।

*প্রথম প্ল্যান ছিল গণপিটুনিতে হত্যা মিশন কার্যকর করা।
গণপিটুনিতে হত্যার জন্য প্রস্তুতও রাখা হয় গ্রামবাসীকে, ওসি বাহিনী অবস্থান নেয় দক্ষিণের বড়ডিল পয়েন্টে- আর উত্তরদিকের শামলাপুর চেকপোস্টে ওৎ পেতেছিলেন খুনি লিয়াকতের বাহিনী। মেজর সিনহার প্রাণ নিয়ে ফেরার কোনো উপায় ছিল না। পরিকল্পনা মাফিক সন্ধ্যা ৭ টার দিকেই টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস তার পছন্দের দুই এসআই ও দুই কনস্টেবল নিয়ে নিজের সাদা নোহায় এবং আরো ৫/৭ জন পুলিশ সদস্য অপর একটি মাইক্রোবাসে হন্তদন্ত অবস্থায় থানা থেকে মেরিন ড্রাইভওয়ে ধরে উত্তর দিকে ছুটতে থাকে।

ওসি বাহিনী বাহারছড়া-কক্সবাজারের পথে শামলাপুর পুলিশ ক্যাম্পে যাওয়ার পথেই ইলিয়াস কোবরার নতুন খবর আসে। ওসি প্রদীপকে ফোন করে তিনি জানান, এ মুহূর্তে মেজর সিনহা ও তার ভিডিওম্যান সিফাত মারিসঘোণার পাহাড় চূড়ায় উঠছেন।

পাহাড়ের উপর থেকে মেরিন ড্রাইভওয়ে, টেকনাফ সদর, নাফ নদী-মিয়ানমার সীমান্ত এবং দক্ষিণ দিকে সমুদ্রের বিস্তির্ণ অংশ দেখা যায়। গভীর সমুদ্রের দিক থেকে ছোট বড় ইঞ্জিনবোটগুলো সার্চ লাইটের আলো ফেলে ফেলে সমুদ্র সৈকতের দিকে আসতে থাকে, আবার ডজন ডজন ইঞ্জিনবোট সমুদ্র সৈকত ছেড়ে গভীর সমুদ্রের দিকেও যেতে থাকে। পুরো দৃশ্যপটের ভিডিওচিত্র ধারন করাটাই হচ্ছে তার ডকুমেন্টারির শেষ দৃশ্য।

এ দৃশ্যপটের সঙ্গে নেপথ্য কন্ঠ জুড়ে দিতে চান মেজর সিনহা। তিনি বলতে চান রাত যত গভীর হয়, আধারে নিমজ্জিত হয় সমুদ্রের মাইলের পর মাইল জলরাশি, ঠিক তখনই টেকনাফ সীমান্ত ঘেষা জনপদের কয়েকশ’ মানুষ জেগে উঠেন, তারা মেতে উঠেন অন্যরকম কর্মযজ্ঞে। শত শত ইঞ্জিনবোট হঠাত করেই যেন সমুদ্রের পানি ফুঁড়ে উঠে আসে উপরে, এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করেই ট্রলারগুলো অজ্ঞাত গন্তব্যে ছুটে যায় ইঞ্জনের কর্কশ শব্দ তুলে, ধোঁয়া ছেড়ে। তখন এসব ট্রলারের প্রতিটাই হয়ে উঠে কোটি কোটি টাকার দামি।

কোনো ট্রলারে থাকে পাচারের শিকার নারী-পুরুষ, কোনোটা আবার ভরাট হয় লাখ লাখ পিস ইয়াবায়। আবার গভীর সমুদ্রে অপেক্ষমাণ মাদার ভেসেল থেকে কোনো কোনো ট্রলারে নামিয়ে আনা হয় একে-৪৭ রাইফেল, থাকে আরজিএস গ্রেনেডের ছড়াছড়ি…

ইলিয়াস কোবরা ফোনে ওসিকে জানান, মেজর সাহেব পাহাড় থেকে নেমে কিছু সময়ের জন্য মেরিন ড্রাইভওয়ে ব্যবহার করে টেকনাফের দিকে যেতে পারেন-তারপর সেখান থেকে ফিরে যাবেন হিমছড়ির রিসোর্টে। এটুকু শুনেই ওসি প্রদীপ তার গাড়ি থামিয়ে দেন বাহারছড়া পৌঁছানোর আগেই। মারিসঘোণা থেকে টেকনাফ যাওয়ার পথে তিন কিলোমিটার দূরের বড়ডিল নামক স্থানে ওসি ও তার সঙ্গীদের দুটি মাইক্রো থামিয়ে পূর্ণ প্রস্তুতিতে অপেক্ষশাণ থাকেন সবাই।

কুখ্যাত একদল সন্ত্রাসীকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল এরমধ্যেই ওসি প্রদীপ কুমার মরিসঘোণা এলাকার দুই জন সোর্স ছাড়াও ক্রসফায়ার বাণিজ্যের টাকা সংগ্রহকারী এজেন্ট বলে কথিত আব্দুল গফুর মেম্বার, হাজী ইসলাম, মুফতি কেফায়েতউল্লাহ ও হায়দার আলীকে ফোন করে জানান, মারিসঘোণা পাহাড়ের চূড়ায় বেশ কয়েকজন ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জড়ো হয়েছে।

তারা কেউ পাহাড় থেকে নামার চেষ্টা করলেই যেন এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে ডাকাত ডাকাত চিৎকার জুড়ে দেয়া হয় এবং যাদেরকে হাতেনাতে পাবে তাদেরকেই যেন গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হয়। বাকি সবকিছু ওসি দেখবেন এবং এজন্য তিনি মারিসঘোণার দিকে রওনা দিয়েছেন বলেও জানানো হয় তাদের। ওসির কাছ থেকে পাওয়া এমন খবর ওসির এজেন্টরা পাহাড় সংলগ্ন চারপাশের বেশ কয়েকটি বাড়িঘরে ছড়িয়ে দিয়ে লাঠিসোটায় সজ্জিত হয়ে তারা অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু চৌকষ সেনা অফিসার সিনহা পাহাড়ের চুড়ায় থাকাবস্থায়ই চারপাশে সাজ সাজ রব দেখে সতর্ক হয়ে উঠেন এবং এ কারণেই টর্চ লাইট না জ্বালিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই ধীরলয়ে পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসেন। ঠিক তখনই বেশ সংখ্যক গ্রামবাসী ডাকাত ডাকাত চিৎকার জুড়ে দিয়ে তাদের চারপাশ থেকেই ধাওয়া দিতে থাকে। কিন্তু মেজর সিনহা তার সহযেগির হাত চেপে ধরে প্রশিক্ষণের দক্ষতা অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই প্রায় আধা কিলোমিটার জায়গা পেরিয়ে পাকা সড়কে পৌঁছে যান এবং দ্রুত নিজের গাড়িতে উঠেই উত্তরদিকে হিমছড়ির দিকে রওনা হন।

বাহারছড়ার মারিসঘোণা থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরেই শামলাপুরের সেই পুলিশ চেকপোস্ট। ওসির নির্দেশে যেখানে এসআই লিয়াকতসহ একদল পুলিশ আরো আগে থেকেই ওৎ পেতে অপেক্ষায় ছিল-সেখানেই পৌঁছে যায় মেজর সিনহার গাড়িটি। গাড়িটির খুব কাছে অস্ত্র তাক করে মেজরকে হাত তুলে সামনের দিকে মুখে করে সামনে আসার নির্দেশ দেন তিনি। আর গাড়ি থেকে নামতেই অব্যর্থ নিশানায় লিয়াকত পর পর চারটি বুলেট বিদ্ধ করেন মেজর সিনহার দেহে। ফলে লুটিয়ে পড়েন তিনি।

এদিকে বড়ডিল এলাকায় অপেক্ষমান ওসি বাহিনী মেজরের উত্তরদিকে রওনা দেয়ার খবর শুনেই শামলাপুর ক্যাম্পের দিকে রওনা দেন। যে কারণে লিযাকতের গুলিতে মেজর মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ১৫/১৬ মিনিটের মধ্যেই ওসি বাহিনী সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হন। কারণ, টেকনাফ থানা থেকে শামলাপুর চেকপোস্ট পর্যন্ত যেতে প্রাইভেটকারে ৪০/৪৫ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু তিনি মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরের বড়ডিল এলাকায় থাকায় ১৫/১৬ মিনিটেই চেকপোস্টে পৌঁছেই মেজর সিনহার লুটিয়ে পড়া দেহখানাকে পা দিয়ে চেপে ধরে নিজের আগ্নেয়াস্ত্র থেকে পর পর দুটি গুলি বর্ষণ করে লাথি মেরে নিথর দেহখানাকে রাস্তার ধারে ফেলে দেন।

ত্রিমুখী হত্যা মিশনের ব্যাখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একদিকে মারিসঘোণা গ্রামে ওসি প্রদীপের নিজস্ব এজেন্টদের দ্বারা ডাকাত ডাকাত চিৎকার জুড়ে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়।

কিন্তু সেখান থেকে জীবন বাঁচিয়ে মেজর সিনহা যদি টেকনাফের দিকে রওনা হতেন তাহলে তিন কিলোমিটার সামনে বড়ডিলে পৌঁছেই তিনি ওসি বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে বেঘোরে জীবন হারাতেন। অন্যদিকে মেজর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে হিমছড়ি রিসোর্টের দিকে রওনা দিলেও শামলাপুরে তার জীবন কেড়ে নিতে এসআই লিয়াকতের টিমকেও পূর্ণ প্রস্তুতিতে রাখা হয়। আসলে কোনো বিকল্প উপায় অবলম্বন করেই মেজর সিনহা যাতে প্রাণ নিয়ে ফিরতে না পারেন তা ১০০ ভাগ নিশ্চিত করেন বসের সহযোগিতায় ওসি প্রদীপ ও তার দল*।

শেষকথাঃ টেকনাম-মিয়ানমার সীমান্ত ও বিস্তির্ণ এলাকার মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান বন্ধের দায়িত্ব অর্পন করতে হবে সৎ লোকদের হাতে। অন্যথা দেশ ও যুবসমাজ উচ্ছন্নে যেতে বাধ্য।

Categories: অপরাধ ও দুর্নীতি,জাতীয়,শীর্ষ সংবাদ,সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.