মঙ্গলবার ২৪ চৈত্র, ১৪২৬ ৭ এপ্রিল, ২০২০ মঙ্গলবার

এক বছরেও চকবাজারের অগ্নিকান্ডের কেউ ক্ষতিপূরুণ পায়নি

বিষেরবাঁশি.কম: ২০ ফেব্রুয়ারী, চকবাজার ট্রাজেটির এক বছর পূরণ হলো আজ। এক বছর পরও পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। আগুনে নিহত ৭০ জন নারী-পুরুষের পরিবার কোনো ক্ষতিপুরণ পায়নি। পরিবারগুলো তাদের দু:সহ স্মৃতি নিয়ে নিদারুণভাবে দিন কাটাচ্ছে। ওই ঘটনায় নিহতদের মধ্যে প্রায় ৬০ জনের ময়নাতদন্ত এক বছরেও শেষ করতে পারেনি ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ার অজুহাতে মামলার তদন্ত চলছে ঢিলে ঢালা ভাবে। তদন্ত কর্মকর্তা অপেক্ষায় আছেন সবগুলো মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের। কবে সেসব পাওয়া যাবে, তাও নিশ্চিত করে কেউ জানাতে পারেননি। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টার ৬৪, নন্দকুমার দত্ত রোডের ওয়াহেদ ম্যানসনের দোতালার কেমিকেল গোডাউনের বিস্ফোরণ থেকে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ৭০ জন নিহত ও ২০ জন আহত হন। অগ্নিকান্ডের ঘটনার দুই দিন পর স্থানীয় বাসিন্দা আসিফ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় একই উদ্দেশ্যে অবহেলাপূর্বক অগ্নিসংযোগের কারণে মৃত্যু ঘটানোসহ ক্ষতিসাধনের অপরাধে পেনাল কোডের ৩০৪(ক)/৪৩৬/৪২৭/৩৪ ধারা উলেখ করা হয়। মামলার বাদী আসিফের বাবা জুম্মন (৫০) অগ্নিকান্ডে নিহত হন। মামলায় মৃত হাজী ওয়াহেদের দুই ছেলে মো. হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদসহ অজ্ঞাত ১২ জনকে আসামি করা হয়। অগ্নিকান্ডের উৎস স্থল সেই কেমিকেল গোডাউনের মালিককে পুলিশ এখনও শনাক্ত করতে পারেনি। পুলিশ বলছে, গোডাউনটির মালিক জনৈক ইমতিয়াজ আহমেদ। কিন্তু নাম ছাড়া তেমন কোন তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি। ওয়াহেদ ম্যানসনের দোতালায় বিস্ফোরিত হওয়া কেমিকেল গোডাউনে পড়ে থাকা বডিস্প্রের ক্যানে লেখা ছিল ‘পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’। এই পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ভারত, দুবাই, তুরস্ক, ফ্রান্স ও জার্মানী থেকে পারফিউম ও বডি স্প্রে আমদানি করে। ঠিকানা রয়েছে, ৬৪ নন্দ কুমার দত্ত রোড়, চকবাজার। এটিই মূলত ওয়াহেদ ম্যানশন। হাতিরপুলে একটি ভবনে পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের অফিস ছিল। অগ্নিকান্ডের পর ওই অফিসের সাইনবোর্ড, অফিসের কাগজপত্র ও মালামাল নিয়ে উধাও হয়ে যায়। পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের আমদানি করা প্রসাধনীতে মিলেছে বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত স্টিকার। পুলিশ বিএসটিআইয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, সেখানকার আবেদনপত্রে ঠিকানা দেয়া আছে, ৬৬ মৌলভীবাজার, চকবাজার, ঢাকা। কিন্তু এই ঠিকানায় পুলিশ পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে কোন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পায়নি। পুলিশ বলছে, ইমতিয়াজ আহমেদ পার্ল ট্রেডের পরিচালক। এর মালিকের নাম খুব সম্ভবত আবুল কাশেম। গত এক বছর ধরে পুলিশের খাতায় ইমতিয়াজ ও আবুল কাশেম পলাতক রয়েছেন। জাতীয় পরিচয় পত্রের সার্ভার থেকে তাদের নাম-পরিচয় পুলিশ বের করতে পারেনি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবীর হোসেন বলেন, চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৭০ জন মৃত ব্যক্তির ময়নাতদন্ত শেষ করতে পারেননি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ। তাই আমি প্রতিবেদনও পায়নি। এ ছাড়া আরো কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলেও তাদের ঠিকানা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় হাজী ওয়াহেদ ম্যানসনের মালিকের দুই ছেলে হাসান ও সোহেলকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তারা আদালতের নির্দেশে জামিনে রয়েছেন। তবে মামলার অপর আসামীদের কোনো ঠিকানা পাওয়া যায়নি। আদালত সূত্র জানায়, তদন্ত প্রতিবেদন জমার জন্য নয়টি তারিখ পার হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৬ ফেব্র“য়ারি তারিখ ধার্য রয়েছে। মামলার বাদীও অভিযোগ করেছেন, তাকে মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানানো হয়না। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, চকবাজারসহ পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এখনো অনেক কেমিক্যাল আর প্লাস্টিক-পারফিউমের কারখানা রয়েছে। চুড়িহাট্টা আগুনের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা প্রতিশ্র“তি দেয়া হলেও সেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবায়িত হয়নি। বিভিন্ন অলিগলিতে অনেকে কেমিক্যাল ভর্তি ড্রাম রেখে অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। দেখার যেন কেউ নেই। ফলে পুরান ঢাকাবাসী এখনো ঝুঁকিপূর্ণ জীপন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। জানা গেছে, ওই ঘটনায় নিহতদের মধ্যে প্রায় ৬০ জনের ময়নাতদন্ত এক বছরেও শেষ করতে পারেনি ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওযার অজুহাতে মামলার তদন্ত চলছে চরম ঢিমেতালে। তদন্ত কর্মকর্তা অপেক্ষায় আছেন সবগুলো মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের। কবে সেসব পাওয়া যাবে, তাও নিশ্চিত করে কেউ জানাতে পারেননি। নিহতের ময়নাতদন্ত শেষ না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতারের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ওই আগুনের ঘটনায় নিহতের মধ্যে ৭/৮টি মৃতদেহের ময়নাতদন্ত শেষ করেছি। বাকীগুলোর পর্যায়ক্রমে করা হচ্ছে। শেষ হতে কিছুটা সময় লাগবে। কেমিকেল গোডাউনের সেই ওয়াহেদ ম্যানসন ভবনটিতে এখন আর কেউ থাকে না। কিছু রাখাও হয় না। অগ্নিকান্ডের পর ওয়াহেদ ম্যানশন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও নিচতলার মার্কেটের দোকানগুলোতে গত কয়েক মাস আগে সংস্কার করা হয়েছে। পোড়া ইট সরিয়ে নতুন ইটের গাঁথুনি দেওয়া হয়েছে। থেমে গেছে অভিযান : ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ঢাকঢোল পিটিয়ে কেমিকেল গোডাউন সরানোর অভিযান চালায়। ৫ টি টিমের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন কেমিকেল গোডাউন সিলগালা করে। কেমিকেল গোডাউনগুলোর বাড়ির বিদ্যুত, গ্যাস ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এভাবে চলতে চলতে অভিযানটি এক পর্যায়ে গোডাউন মালিকদের বাধার সম্মুখীন হয়। এরপর থেকে এই অভিযান ঝিমিয়ে পড়ে। গত বছরের ২৮ ফেব্রয়ারি থেকে চলা এই অভিযান ওই বছরের ১ এপ্রিল থেকে বন্ধ করে দেয়। এই অবস্থায় আগের চেহেরায় ফিরে গেছে পুরান ঢাকা। এখন সেখানে কেমিকেল গোডাউনে আগের মত বেচাকেনা চলছে। ৩৩ দিন টাস্কফোর্স অভিযান চালিয়ে ১৭০ টি কেমিকেল গোডাউন সিলগালা করে। আবাসিক এলাকায় এসব কেমিকেল গোডাউনের কয়েকটি থেকে মালামাল সরিয়ে নেয়া হয়। বাকিগুলো আগের অবস্থায় রয়েছে। পুরান ঢাকায় দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্সপ্রাপ্ত আড়াই হাজার কেমিকেল গোডাউন রয়েছে। এর বাইরে আরো ১০ হাজার কেমিকেল গোডাউন রয়েছে যার কোন লাইসেন্স নেই। সব মিলিয়ে এখনো পুরান ঢাকা লাখ লাখ মানুষকে রাসায়নিক গোডাউনের মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে। এখনো প্রত্যেকটি বাড়িতে কারখানা এবং গোডাউন রয়েছে। চকবাজার এলাকায় অভিযান চালালে অন্তত হাজারের বেশি কেমিক্যাল গোডাউন পাওয়া যাবে। অনেক ছোটখাট কারখানায় কেমিকেলের গোডাউন রয়েছে। কারখানাগুলো সচল থাকলেও কেমিকেল সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়নি। বিশেষ করে জুতা, চুড়ি, কসমেটিকস ও প্লাস্টিকের খেলনার কারখানায় কেমিকেল গোডাউন রয়েছে। বিষেরবাঁশি.কম/আলমগীর হোসেন/মৌ দাস

Categories: জাতীয়

Leave A Reply

Your email address will not be published.