শনিবার ২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ শনিবার

জঙ্গিদের ফাঁসির রায়ে নিহতদের স্বজনদের সন্তুষ্টি প্রকাশ

অনলাইন ডেস্ক: হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার রায় ঘোষণার পর নিহত শেফ (পিৎজা কারিগর) সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের মা সমমেহের বেগম (৭০) প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন ‘মৃত্যুর পর আমার ছেলের লাশটাও দেখতে পারলাম না। তয় জারা আমার ছেলেকে হত্যা করিছে আমি তাদের কঠোর শাস্তি, ফাঁসি চাইছিলাম। জঙ্গিদের ফাঁসির রায় হইছে। আমি খুশি। এখন মরেও শান্তি পাব। যেন আর কারো মায়ের কোল খালি করবার না পারে জঙ্গিরা।’

ঠিক একইভাবে এসি রবিউল করিমের ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামস বড় ভাই হারানোর বেদনা নিয়ে বলেন, এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। আশা করছি, দ্রুত এই রায় কার্যকর হবে।

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার যে জিরো টলারেন্স তা এই রায়ের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। দেশবাসীর মতো আমরাও এই রায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। রবিউল করিমের পরিবারের বিষয়ে তিনি বলেন, ভাইয়ের স্ত্রী চাকরি করছেন। বাচ্চারা বড় হচ্ছে। এমনিতে ওরা ভালো আছে।

রবিউল করিমের স্ত্রী উম্মে সালমা বলেন, ‘বিচারে হামলাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হয়েছে। স্বামীর হত্যাকারীদের ফাঁসি হবে। এখন আমি, আমার সন্তান এবং পরিবারের সবাই এই রায়ে খুশি।’

হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলায় মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে তৎকালীন বনানী থানার ওসি ও গোপালগঞ্জের সন্তান নিহত সালাহউদ্দিন খান এর পরিবার। রায় ঘোষণার পর আজ বুধবার (২৭ তারিখ) দুপুরে গোপালগঞ্জের ব্যাংকপাড়ার বাড়িতে গণমাধ্যমের জিজ্ঞাসায় সালাউদ্দিনের পরিবার ও স্বজনরা এই প্রতিক্রিয়া জানান।

এ রায়ে সালাউদ্দিনের বড়ভাই রাজু উদ্দিন খান রাজু সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমার ভাই বনানী থানায় ওসির দায়িত্বে থাকাকালীন সময় এই হামলা হয়। সেখানে জঙ্গিদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে আমার ভাই শহীদ হয়। রায়ে জঙ্গিদের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। এই রায়ে আমি ও আমার পরিবার খুশি। আমি আশা করবো, উচ্চ আদালত থেকে যেন এই রায় দ্রুত কার্যকর হয়।’

একই কথা বলেছেন ওসি সালাউদ্দিন খানের স্ত্রী কিম খানসহ তার পরিবারের অন্যরা। কিম খান বলেন, ‘ হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের নিয়ে অনেক কস্টে বেঁচে আছি। এই রায়ের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। এখন রায় হয়েছে। আমি ও আমার সন্তানরা এই রায়ে খুশি।’

ওদিকে, রায় ঘোষণার পর নিহত জাকির হোসেন শাওনের বোন সোনিয়া বেগম বলেন, ‘আমার ভাইতো নির্দোষ ছিল। তদন্তেও সেটা প্রমাণ হয়েছে। কিন্তু আমার ভাইটা মইরা যাওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ খোঁজ নেয় নি। আমার বাবা আব্দুস সাত্তার ও মা মাকসুদা বেগম বিনা চিকিৎসায় আজ মৃত্যু পথযাত্রী। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছোট ভাই শাওনকে হারিয়ে আজ আমরা পথে বসেছি। শুধু হলি আর্টিজানের মালিক আমাদের খোঁজ খবর নেন। জঙ্গিদের ফাঁসির রায় হলেও আমাদের পরিবারের ভবিষ্যত আগের মতই অন্ধকারে আছে।’

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম ও সালাউদ্দিন খান নিজের জীবন বিপন্ন করে মানুষকে বাঁচানোর কর্তব্য পালন করতে হলি আর্টিজানে ছুটে গিয়েছিলেন। তারা দুজনই জঙ্গিদের ছোড়া বোমায় নিহত হন।

একই ঘটনায় নিহত হন হলি আর্টিজান রেস্তোরার পাচক সাইফুল ইসলাম। সে সময় রহস্যজনক কারনে জঙ্গিদের সঙ্গে সরকারি ব্যাবস্থাপনায় দাফন করা হয় তার লাশ। বারবার কতৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সাইফুলে পরিবার তার লাশ ফেরৎ পায়নি। জীবনের তাগিতেই ওই রেস্তোরায় বাবুর্চির কাজ করতেন সাইফুল। এখনো পরিবারে চলছে কান্না আর আহাজারি। সাইফুল ইসলাম শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কোলকাঠি গ্রামের মৃত হাসেম চৌকিদারের ছেলে।

নিহত সাইফুলের পরিবার জানায়, নিহতের সময় ছয় মাসের অন্তঃসত্তা থাকা সাইফুলের স্ত্রীর কোলজুরে জন্ম নিয়েছে একটি ছেলে সন্তান। পরিবারের সদস্যরা ওই শিশুটির নাম রেখেছে মোহাম্মদ হাসান। বাবার মৃত্যুর চার মাস পরে জন্ম নিয়েছেন হাসান।

কান্না জড়িত কণ্ঠে সানিয়া বেগম বলেন, ‘বাবাকে দেখা হলোনা আমার বাছার। আমার সন্তানদের আমি দেশ প্রেমী করে গড়ে তুলতে চাই। আমার স্বামীকে যারা হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দেওয়ায় আমি খুশি।’

হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার সাড়ে তিন বছরের মধ্যে কেউ শাওন ও সাইফুলের পরিবারের খোঁজ নেয়নি। জঙ্গি হামলার পর কমান্ডো অভিযানে ৫ জঙ্গি নিহত হন। ওই ৫ জনের সঙ্গে আরো একজনকে জঙ্গি অভিযোগ করে ৬ জঙ্গি বলা হয়। তিনি হচ্ছেন হলি আর্টিজানের শেফ সাইফুল ইসলাম চৌকিদার। নিহত ৫ জঙ্গির সঙ্গে তার লাশটিও জুরাইন কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসাবে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে এ ঘটনায় সিটিটিসি তদন্ত করে সাইফুলের সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

এখনও সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের পরিবার শরিয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ তার পরিবারের খোঁজ নেয়নি।

অপর পরিবারটি হলো র‌্যাবের হাতে আটক হলি আর্টিজানের ডিশ ক্লিনার জাকির হোসেন শাওনের পরিবার। ঐ বছরের ৮ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শাওন।

পরিবার থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রশাসনের লোকজন শাওনকে জঙ্গি সন্দেহে আটক করে পিটিয়ে হত্যা করেছে। শাওনের বিরুদ্ধে কোন জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পায় হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।

বিষেরবাঁশি.কম/ডেস্ক/মৌ দাস/আহসান শিপু

Categories: আইন-আদালত,জাতীয়

Leave A Reply

Your email address will not be published.