মঙ্গলবার ২৮ কার্তিক, ১৪২৬ ১২ নভেম্বর, ২০১৯ মঙ্গলবার

অমিত সাহা ও মিজানই আবরারকে শিবির বলে সন্দেহ করেছিলো

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার আরো এক আসামি বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাংগাঠনিক সম্পাদক মেহেদি হাসান রবিন ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে সেই রাতের ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।

গত সোমবার (১৪ অক্টোবর) তিনি আদালতে বলেন, ‘আবরারের রুমমেট মিজান ও বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের উপ-আইন বিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহা তাকে জানিয়েছিলেন আবরার শিবির করে। ওর সঙ্গে শিবিরের সংশ্লিষ্টতা আছে। ওর ফেসবুক বা মোবাইল ফোন চেক করলেই এটা নিশ্চিত হওয়া যাবে। সে অনুযায়ি ঘটনার দিন ৬ অক্টোবর রাত ৮ টার দিকে আবরারকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে আনা হয়।’

আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মেহেদী বলেন, আবরারকে প্রথম দফায় তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তুই শিবির করিস’। আবরার অস্বীকার করে। পরে ইফতি ও তানভীরকে আবরারের কক্ষে পাঠিয়ে দেই আমরা। তারা আবরারের কক্ষ থেকে তার দুইটি মোবাইল ফোন ও ল্যাবটপ নিয়ে আসে। অনিক একটি মোবাইল ফোনে আবরারের ফেসবুক ঘেঁটে কিছু উস্কানিমূলক বক্তব্য পায়। তখন অনিক জিজ্ঞাসা করে, ‘ক্যাম্পাসে কারা শিবির করে? তুই তাদের নাম বল?’ আবরার চুপ থাকে। তখন অনিক তাকে কিল ঘুষি মারে। তখন আমিও আবরারকে চড় থাপ্পড় মারি। একটা পর্যায়ে ক্রিকেটের স্টাম্প দিয়ে তাকে পেটাই। কিছু সময় পর আমি অনিককে বলি যে ওকে পিটিয়ে শিবিরের নামগুলো বের করতে হবে। এরপর আমি চানখার পুল যাই খেতে। চানখার পুলে হোটেল খাওয়া দাওয়ার সময় ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে দেখতে পাই যে আবরারের অবস্থা খুবই খারাপ। তখন আমি হলে চলে আসি। এসে শুনি যে আবরারকে অমিতের কক্ষ থেকে বের করে পাশের ২০০৫ নম্বর কক্ষে নেয়া হয়েছে। ওই কক্ষে আবরার বমি করে। তখন আমি আবরারকে পুলিশের হাতে দেওয়ার জন্য নিচে নামাতে বলি।

এরপর জেমি, মোয়াজ ও শামীমসহ ৩/৪ জন তাকে কোলে করে সিঁড়ি ঘরের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর পুলিশ ও চিকিৎসকদের খবর দেওয়া হয়। এরপর চিকিৎসক এসে তাকে মৃত ঘোষণা করে।

এদিকে শিবির সন্দেহে পেঠানোর কারনেই আবরারের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম। গত সোমবার সকালে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে চার জনের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এসেছে যে, তারা শিবির সন্দেহে আবরারকে ডেকে নিয়ে মারপিট করছিল। একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়।’

এ সময় অপর এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, বাকিদের জবানবন্দির পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির বিশেষণ ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে যে, তারা আবরারকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারপিট করেছিল নাকি মারপিটের জন্য মারপিট করছিল।’

ওই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ব্যাখ্যা দিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ পুলিশ রাত ২টায় নয়, ৩টার পরে গিয়েছিল বুয়েট ক্যাম্পাসে, কিন্তু পুলিশকে তখনো বলেছে, ভেতরে কোনো সমস্যা নাই। সমস্যা থাকলে, কেউ (কর্তৃপক্ষ) জানালে তখন পুলিশ ঢুকে। সমস্যা না থাকলে হলে ভেতরে যাওয়ার রেওয়াজটা ওইভাবে নাই।’

ওই রাতে সে এলাকায় টহলের তিনজন পুলিশ সদস্য ছিল জানিয়ে মনিরুল বলেন, হলে গোলমাল হয়েছে জেনে সেখানে গিয়েও কোনো চিহ্ন পায়নি তারা। তবে জিজ্ঞাসাবাদে আমরা যেটা পেয়েছি, কেউ কেউ বলছে, পুলিশ যাওয়ার আগেই আবরার মারা গিয়েছিল।’

আগামী মাসে আদালতে এই মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ তবে আমরা আশ্বস্ত করতে চাই, আগামী মাসের শুরুতে বিজ্ঞ আদালত যে তারিখ দিয়েছে তার আগেই- অর্থাৎ আমরা আশা করছি, আগামী মাসের শুরুর দিকে- এই মামলার তদন্ত কাজ শেষ হবে। তখন আমরা একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্র দিতে পারব।”

বুয়েটের তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে গত ৬ অক্টোবর রাতে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। আববার হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের মধ্যে ১১ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ৮ জনকে এখন জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি। ১১ জনের মধ্যে ১০ জনকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আর গত সোমবার একজনকে আদালতে পাঠানোর পর তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। তাকেও কাশিমপুর কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া সম্ভাবনা রয়েছে বলে এখনকার সূত্রে জানা গেছে।

ডিবি সূত্র জানিয়েছে, আবরার হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে এ পর্যন্ত চারজন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হলেন, বুয়েটের ছাত্র ইফতি মোশাররফ সকাল, মেফতাহুল ইসলাম জিওন, অনিক সরকার ও মো. মোজাহিদুর। এদের মধ্যে রবিনকে রিমান্ড শেষে গত সোমবার আদালতে পাঠানো হলে কার্যবিধির ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি দেন।

জানা গেছে, আবরার হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত গ্রেপ্তারকৃত ১৯ জনের মধ্যে ১৫ জনই এজাহারভুক্ত আসামি। বাকি চারজন এজাহারবহির্ভুত। এজাহারভুক্ত ১৯ জনের মধ্যে চারজন এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। এরা হলেন, মো. জিসান, মো. শাদাত, মো. মোর্শেদ ও মো. তানিম। এরা সবাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িত রয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

ঘটনায় কার কি ভুমিকা ছিল তদন্তে সে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে জানিয়ে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, আবরারের ওপর যে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে তার বর্ণনা উঠে এসেছে অনিক ও অন্যদের জবানবন্দিতে। এর আগে এই হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন ইফতি মোশাররফ সকাল ও মেফতাহুল ইসলাম জিওন। ইফতি জানিয়েছিলেন, আবরারের হাঁটু, পা, পায়ের তালু ও বাহুতে পিটিয়েছিলেন অনিক সরকার। একই কায়দায় অন্তত ২২ জন দফায় দফায় আবরারকে পেটান। ক্যান্টিনে রাতের খাবার খেয়ে এসে আবরারকে নিস্তেজ অবস্থায়ও ফের পেটানো হয়। রাত ১১টার দিকে অনিক স্টাম্প দিয়ে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এলোপাতাড়ি পেটান।

বিষেরবাঁশি.কম/ডেস্ক/মৌ দাস/আহসান শিপু

Categories: জাতীয়

Leave A Reply

Your email address will not be published.