বৃহস্পতিবার ৯ কার্তিক, ১৪২৬ ২৪ অক্টোবর, ২০১৯ বৃহস্পতিবার

সড়ক অবরোধ করে দিনভর বিক্ষোভ: ভিসি অপসারণসহ ১০ দফা দাবিতে অনঢ় শিক্ষার্থীরা

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় উপাচার্যের অপসারণ এবং ১০ দফা দাবিতে অনঢ় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ঘটনার তৃতীয় দিনেও বুয়েট ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা।

গতকাল থেকে উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এ্যালামনাই এসোসিয়েশান সহ বুয়েট সংশ্লিষ্ট অনেকেই। হত্যার ঘটনার দুই দিন পর গতকাল সকাল ১০টায় বৈঠক বসে বুয়েট শিক্ষক সমিতির ৩ শত শিক্ষক। বৈঠক শেষ তারা নিজেদের ৮টি সিদ্ধান্তের কথা জানান। উপাচার্যের অদক্ষতা ও নানা অনিয়মে নির্লিপ্ততার প্রেক্ষিতে ভিসির পদত্যাগ চান তারা। বুয়েট ছাত্রলীগের এমন কর্মকান্ডে লজ্জা প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।

গতকাল বেলা আড়াইটায় শের-ই- বাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ ড. জাফর ইকবাল খানের পদত্যাগের ঘোষণা দেন ছাত্রকল্যান পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান। তিনি জানান, শিক্ষক সমিতির মিটিংয়ে ড. জাফর ইকবাল খান পদত্যাগপত্র জমা দেন।

গতকাল দিনভর শিক্ষার্থীরা ১০ দফা দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন। দুপুর ১২টার দিকে বকশিবাজার থেকে পলাশী মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ব্যারিকেড দিয়ে সড়ক অবরোধ করেন তারা। এতে দুর্ভোগে পড়তে হয় সাধারণ যাত্রীদের। বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজগামী এ্যাম্বুলেন্সগুলোকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। এদিকে সকালে শিক্ষার্থীরা ১০ দফা দাবি ঘোষণা করেন।

শিক্ষার্থীদের ১০ দাবি :

১. খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সিসিটিভি ফুটেজ ও জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে শনাক্তকারী খুনিদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২. বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সিসিটিভি ফুটেজ থেকে শনাক্তকৃত সবাইকে আগামী ১১ অক্টোবরের মধ্যে আজীবনের জন্য বহিষ্কার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. মামলা চলাকালীন সকল খরচ এবং আবরারের পরিবারের সব ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে। এ মর্মে অফিসিয়াল নোটিশ ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে প্রমাণ করতে হবে।
৪. দায়ের করা মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে স্বল্পতম সময়ে নিষ্পত্তি করার জন্য প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বুয়েট প্রশাসনকে সক্রিয় থেকে সব প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং নিয়মিত ছাত্রদের আপডেট করতে হবে। ৫. অবিলম্বে চার্জশিটের কপিসহ অফিসিয়াল নোটিশ দিতে হবে।
৬. বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে দীর্ঘদিন ধরে বুয়েটে হলে হলে ত্রাসের রাজনীতি কায়েম করে রাখা হয়েছে। মোস্ট জুনিয়র ব্যাচকে সবসময় ভয়ভীতি প্রদর্শনপূর্বক জোর করে রাজনৈতিক মিছিল মিটিংয়ে যুক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেকোনও সময় যেকোনও হল থেকে সাধারণ ছাত্রদের জোরপূর্বক হল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে হলে হলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংগঠনের এহেন কর্মকাণ্ডে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ। তাই আগামী ৭ দিনের (১৫ অক্টোবর) মধ্যে বুয়েটে সব রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম স্থায়িভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।
৭. বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হবার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি এবং পরবর্তীতে ৩৮ ঘণ্টা পরে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেন এবং কোনও প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্থান ত্যাগ করেন, তাকে সশরীরে ক্যাম্পাসে এসে বুধবার দুপুর ২টার মধ্যে জবাবদিহি করতে হবে।
৮. আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগিংয়ের নামে এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সব প্রকার শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং এ ধরনের সন্ত্রাসে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে। এইসঙ্গে আহসানউল্লাহ হল এবং সোহরাওয়ার্দী হলের পূর্বের ঘটনাগুলোতে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল শুক্রবারের (১১ অক্টোবর) বিকাল ৫টার মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে।
৯. পূর্বে ঘটে যাওয়া এধরনের ঘটনা প্রকাশ এবং পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া যেকোনও ঘটনা প্রকাশের জন্য একটা কমন প্ল্যাটফর্ম (কোনও সাইট বা ফর্ম) থাকতে হবে এবং নিয়মিত প্রকাশিত ঘটনা রিভিউ করে দ্রুততম সময়ে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। এই প্লাটফর্ম হিসেবে বুয়েটের বিআইআইএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হবে এবং ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রদর্শন করতে হবে এবং পরবর্তী একমাসের মধ্যে কার্যক্রম পূর্ণরূপে শুরু করতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে সব হলের প্রত্যেক ফ্লোরের দুপাশে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করতে হবে।
১০. রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে অজ্ঞ থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হওয়ায় শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে। হত্যার রাজনীতি চাইনা : সকাল ১০টায় আবরার ফাহাদের বিভাগ তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক ও সহপাঠীরা মৌন মিছিল করেছে। মিছিল শেষে বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘এখন যে ছাত্ররাজনীতি হচ্ছে, তা মানুষকে কাঁদাচ্ছে, মেরে ফেলছে। আসলে এই রাজনীতি কি শিক্ষার্থীদের কোনো উপকার হচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয়ে যে রাজনীতি হচ্ছে, তা শিক্ষার্থীদের কোনো উপকারে আসছে না। যে ছাত্ররাজনীতি মানুষ করে, সেই রাজনীতি আমরা চাই না।’ তিনি মনে করেন, বুয়েটে যে ছাত্র রাজনীতি চলছে, তা না থাকাই ভালো। তা বন্ধের ব্যাপারে এখনই উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’ বুধবার সকাল ১০টায় বুয়েট ক্যাম্পাসের ভেতরেই এই মিছিল করেন তাঁরা।

উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি বুয়েট অ্যালামনাইয়ের :

হত্যার ঘটনা এবং উপাচার্যের অদক্ষতাকে দোষারুপ করে উপাচার্যের পদত্যাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে বুয়েট অ্যালামনাই এসোসিয়েশান। বেলা সাড়ে ১২টায় বুয়েট ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে এক সমাবেশ থেকে বুয়েট অ্যালামনাই এ সব দাবি জানায়। বুয়েট অ্যালামনাইয়ের সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী সাত দফার লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন। তাদের দাবিগুলো হলো- হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত সকলকে বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনাল এর আওতায় এনে দ্রুততম সময়ে বিচার করা, হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত সকল ছাত্রকে অতিদ্রুত আজীবনের জন্য বহিষ্কার, বুয়েট ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলসমূহের অঙ্গ সংগঠন ভিত্তিক ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা, প্রশাসনকে ঐতিহ্য পরিপন্থী যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও প্রভাব মুক্ত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, উপাচার্যের অপসারণসহ প্রশাসনের আমূল পরিবর্তন করা, র‌্যাগিং এবং অন্যান্য অজুহাতে ছাত্র-ছাত্রী নির্যাতন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা, ইতিপূর্বে সাংঘটিত অন্যান্য ছাত্র নির্যাতনের ঘটনাবলির ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ বিচার কার্য অবিলম্বে সম্পন্ন করে।

প্রাধ্যক্ষ জানান ‘একটি মার্ডার হয়েছে’ : শিক্ষার্থীদের জেরার মুখে আবরার হত্যার রাতের ব্যাখ্যা দেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘রোববার রাত পৌনে ৩টার দিকে শেরেবাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ এবং সহকারী প্রাধ্যক্ষ তার বাসায় যান। তারা এসে দরজা ধাক্কা দেন। দরজা খোলার পর তিনি দেখেন, দুজন সিঁড়ির ওপর বসে আছে।

উত্তরে সহকারী প্রাধ্যক্ষ জানান, হলে একটি মার্ডার (হত্যা) হয়েছে। মিজানুর রহমান বলেন, তখন তার পোশাক বাইরে বের হওয়ার উপযোগী না থাকায়, কাপড় বদলে আসার জন্য ভেতরে যান। এরপর প্রাধ্যক্ষ এবং সহকারী প্রাধ্যক্ষকে নিয়ে তিনি শেরেবাংলা হলে যান। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘যাদের ছবি তোমরা দেখাচ্ছ, তারা সবাই ওখানে ছিল। তাদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। সাদা পাঞ্জাবি পরা লোকটি ডাক্তার। তোমরা যদি এ ছবির ব্যাখ্যা চাও, তাহলে বলছি।

ডাক্তার আবরারের নাকে, বুকে হাত দিয়ে বলেন, ছেলেটা অনেকক্ষণ আগে মারা গেছে। এ সময় যারা উপস্থিত ছিল, তারা ডাক্তারকে চাপ দেয়, লাশ যেন এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ডাক্তার জানিয়ে দেন, তার একার পক্ষে ডেডবডি (লাশ) নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’

এ সময় উপস্থিত ছাত্ররা চিৎকার করে জানতে চান, কারা ডাক্তারকে লাশ সরিয়ে নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার কোনো দুর্বলতা থাকলে তো এখানে আসতাম না, আমি ব্যাখ্যা দিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘ডাক্তার যখন বললেন আবরার মারা গেছে, তখন ছেলেরা আমাদের লাশ সরিয়ে নেয়ার জন্য প্রেশার দিচ্ছিল। আমি বললাম, এটা পুলিশ কেস, আমি লাশ সরাতে পারব না। এদের মধ্যে আমি শুধু রাসেলকে চিনি। ও চাপ দিচ্ছিল। বাকিরা কোনো কথা বলছিল না। আমি ভিসিকে ফোন করি। অনেক রাত হলেও তিনি ফোন ধরেন। তাকে বললাম, এই অবস্থা। উনি বললেন, পুলিশকে ফোন কর। পুলিশ যেভাবে বলবে, সেভাবে কাজ করতে হবে।’

ভিসির সঙ্গে কথা বলে মিজানুর রহমান উপস্থিত ছাত্রদের জানিয়ে দেন, এটা যেহেতু মার্ডার কেস, লাশ তিনি সরাতে পারবেন না। এরপর প্রধান সিকিউরিটি গার্ড আসেন। চকবাজার থানায় খবর দেয়া হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আসেন। পুলিশের সঙ্গে একজন ডাক্তার ছিলেন। তারা লাশের সুরতহালের কাজ শুরু করেন।

মিজানুর রহমান বলেন, ‘আবরারের ট্রাউজারের একটা অংশ যখন ওঠানো হয়, তখনই বুঝতে পারি আবরারের গায়ে মারের দাগ আছে। সেই ছবি তোমরা দেখেছ। ছবিতে মারের দাগ স্পষ্ট ছিল। ডাক্তার তখন বলেন, শরীরের ওপরের অংশেও দাগ থাকতে পারে। কিন্তু ওই জায়গায় তা পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। কাজেই লাশটা তখন হলের ক্যান্টিনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরীক্ষা করে দেখা হয়। সুরতহাল যারা তৈরি করছিলেন, তারা তখন লাশের ছবি নেন।’

তিনি বলেন, ‘সুরতহাল কমপ্লিট করার জন্য লাশের বিস্তারিত তথ্যের দরকার ছিল। বাবার নাম, বাড়ি কোথায় এসব লাগত। ওদের মধ্যেই কেউ একজন আবরারের ফোন এনে দেয়। আমি জানি না, ওরা কারা। সিকিউরিটি গার্ড আবরারের কললিস্ট থেকে বাবা-বা মার নাম দেখে ফোন করে। তখন তাদের নাম, বাড়ির ঠিকানা পাওয়া যায়। সুরতহাল তৈরি করার সময় হলের প্রাধ্যক্ষ, সহকারী প্রাধ্যক্ষ, ডাক্তারের সঙ্গে আমিও ছিলাম। আমাদের সামনে রেখে লাশের ছবি তোলা হয়। আমাদের সবার স্বাক্ষর নেয়া হয়। তখনো হয়তো পুলিশের কাজ শেষ হয়নি। কখন লাশ নিতে পারবে সে ব্যাপারে ওপর থেকে নির্দেশনা চাচ্ছিল তারা। কিছুক্ষণ পর পুলিশের গাড়িতে আরেকজন সিনিয়র কর্মকর্তা আসেন। পুলিশের গাড়িতে লাশ তুলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।

শিক্ষার্থীদের নিরপত্তা দিতে পারেনি বুয়েট :

বুয়েট শিক্ষার্থীদের নিরপত্তা দিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি একে এম মাসুদ। তিনি বলেন, আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দিতে পারিনি। আমরা অপরাধী। বুয়েট শিক্ষক সমাজ আবরারের বাবা-মার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। তবে হত্যাকান্ডে জড়িতদের বুয়েট থেকে আজীবন বহিষ্কার করতে যাচ্ছি আমরা।

তিনি আরও বলেন, একজন অদক্ষ ভিসির কারণে আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠানকে নষ্ট হতে দেব না। হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে চলমান পরিস্থিতিতে বৈঠক বসেন বুয়েট শিক্ষক সমিতির ৩শত শিক্ষক। বৈঠক শেষে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় বৈঠকে বসেন বুয়েট শিক্ষক সমিতির তিনশ শিক্ষক। বৈঠক শেষে দুপুর আড়াইটায় শিক্ষার্থীদের সামনে এসে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, তিনশ শিক্ষকের সমন্বয়ে মিটিং হয়েছে। সে মিটিংয়ে নেয়া সিদ্ধান্ত আমরা লিখিত আকারে সুপারিশ করবো। এছাড়া বুয়েটের স্বার্থে কোনো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পরোক্ষ রাজনীতিতে জড়িত হবে না বলেও বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সময় ভিসির পদত্যাগসহ আট দফা তুলে ধরেন তিনি। শিক্ষকদের ৮ দফা : বুয়েট শিক্ষক সমিতির ৩ শত শিক্ষকের সমন্বয়ে মিটিং বসে সকাল ১০টায়। পরে বেলা আড়াইটায় বুয়েট শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে নিজেদের আটদফা দাবি তুলে ধরেন তারা।

শিক্ষকদের আটদফা দাবি হলো:

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার নিশ্চিত করা; হত্যাকারীদের বুয়েট থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করতে হবে; ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে; বুয়েটের সব আবাসিক হল থেকে বহিরাগতদের সরিয়ে হলের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা; বুয়েটের শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের পরোক্ষ রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে; র‌্যাগিং ও নির্যাতন বন্ধে আগের সব র‌্যাগিং ও নির্যাতনের সুষ্ঠু তদন্ত এবং শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে; বুয়েটের ওয়েবসাইটে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ করার ব্যবস্থা করা; উপাচার্যের অদক্ষতা ও নির্লিপ্ততায় প্রশাসনিক কাজে পূর্ণ সহায়তা না পাওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আবরার হত্যার দায় তার। এ দায় নিয়ে বুয়েট থেকে তাকে পদত্যাগ করা। স্বেচ্ছায় তিনি পদত্যাগ না করলে অপসারণের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানানো হয়। ছাত্রলীগের লজ্জা প্রকাশ : হত্যাকান্ডের সঙ্গে বুয়েট ছাত্রলীগের পোস্টেড নেতা- কর্মী থাকায় লজ্জা প্রকাশ করেছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান।

এসময় তিনি জড়িতদের দ্রুত বিচার দাবি করেছেন। দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ‘আবরার হত্যার দ্রুত বিচারের’ দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের এ অবস্থান জানায়।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা আবরার হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার দাবি করছি। আপনারা দেখেছেন, শুরু থেকেই আমরা অপরাধীদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছি। কারণ আমরা বলেছি কোনও অপরাধীর স্থান বাংলাদেশ ছাত্রলীগে হবে না। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা ১১ জনকে স্থায়ী বহিষ্কার করেছি। আপনারা জানেন, কোনও ঘটনার জন্য এই প্রথম এতো দ্রুত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি এবং সাংগঠনিকভাব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এই হত্যাকা-ের জন্য আমরা লজ্জা প্রকাশ করছি।’

সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় সংবাদ সম্মেলনে আবরার হত্যাকান্ডের পর তাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। ছাত্রলীগ এ ধরনের সহিংসতাকে জায়গা দেবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঘটনার পরপরই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের ১১ জনকে বহিষ্কার করি। দ্রুততম সময়ে হত্যাকান্ডে জড়িত এজাহারভুক্ত ১৯ জনের মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেফতার করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানাই।

পলাতকদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতারের আহ্বান জানাই। একইসঙ্গে এজাহারের বাইরে হত্যাকান্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসারও আহ্বান জানাই। এক্ষেত্রে ছাত্রলীগ সব ধরনের সহযোগিতা করবে।’

জয় বলেন, ‘সাংগঠনিকভাবে ছাত্রলীগ কখনোই কোনও প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকা-কে প্রশ্রয় কিংবা উৎসাহ প্রদান করে না। সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করে অতি উৎসাহী কোনও কর্মকা-কে ছাত্রলীগ অতীতের মতো ভবিষ্যতেও প্রশ্রয় দেবে না। সম্প্রতি আবরার হত্যাকা-ের ছাত্রলীগের পদক্ষেপে আবারও তা প্রমাণ পেয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা নজিরবিহীন। ছাত্রলীগের সব নেতাকর্মীর প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, কারও কর্মকান্ডে উন্নয়নের ধারা যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমার চোখে সব অপরাধী সমান, আবরার হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত কেউ ছাড় পাবে না।’

উল্লেখ্য, রবিবার রাত ৩টার দিকে বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। জাবি সংবাদদাতা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার হতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এসময় শিক্ষার্থীরা প্রায় আধা ঘন্টা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে। এতে সড়কের দু’পাশে যানজটের সৃষ্টি হয়।

সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী জয়নাল আবেদিন শিশির বলেন, ‘দেশপ্রেমের কারনে আবরারকে হত্যা করেছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। এভাবে আমাদেরও মরতে হতে পারে। শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত দেশকে রক্ষায় ছাত্রসমাজ সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। আবরার হত্যায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

মহাসড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীদের সমাবেশ চলাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয় শিক্ষার্থীরা। পরে বিক্ষোভ মিছিলটি ক্যাম্পাসের ভিতরে প্রবেশ করে নতুন কলা ভবনে এসে শেষ হয়।

ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের বিক্ষোভে ছাত্রলীগ নেতার ধাওয়া:

এদিকে আবরার হত্যায় জড়িতদের শাস্তির দাবি ও ভারতের সাথে দেশ বিরোধী চুক্তির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাবি শাখা ছাত্রদল। বুধবার সকাল ১০ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকেন ছাত্রদলের প্রায় ২৫ জন নেতাকর্মী। মিছিলটি অমর একুশের পাদদেশে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। এ সময় শাখা ছাত্রলীগের এক নেতা তাদেরকে ধাওয়া দিলে ক্যাম্পাস ছাড়েন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, কমসূচির শেষের দিকে শাখা ছাত্রলীগের পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক মাহবুবুল হক রাফা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেয়। এ সময় ব্যানার কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। পরে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা দৌড়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।

মিছিলে ধাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম সৈকত বলেন, ‘আমরা কোন সহিংসতা চালাতে ক্যাম্পাসে আসিনি। একটি হত্যার বিচার চাইতে এসেছিলাম। কিন্তু সেখানেও ছাত্রলীগ বাঁধা দিয়েছে। আমরা চাইলে পাল্টা হামলা চালাতে পারতাম। কিন্তু আমরা সহাবস্থান চাই, তাই পাল্টা হামলা চালাইনি। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সাথে কথা হয়েছে। তারা বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস জানিয়েছে।’

এবিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান বলেন, ‘গতকাল রাতে আমার সাথে কথা হয়েছে। আমি বলেছি, যে কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়িয়ে চলতে এবং কোন অছাত্র যাতে ক্যাম্পাসে না আসে। কারণ অছাত্রদের দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নেবে না।’

বিষেরবাঁশি.কম/ডেস্ক/মৌ দাস.

Categories: জাতীয়

Leave A Reply

Your email address will not be published.