বৃহস্পতিবার ৯ কার্তিক, ১৪২৬ ২৪ অক্টোবর, ২০১৯ বৃহস্পতিবার

সততা দেখাও? নারায়ণগঞ্জের সব সাংবাদিকরে খাইয়া দিমু’ : মহানগর ছাত্রলীগ

অনলাইন ডেস্ক: সম্প্রতি ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী বিতর্কিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি ও সেক্রেটারি নিজে তাদের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর শক্ত অবস্থানের পরও এতোটুকু টনক নড়েনি নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগ নেতাদের। আওয়ামী লীগের চলমান শুদ্ধি অভিযানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে শনিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) এক সাংবাদিককে প্রকাশ্যে পেটান মহানগর ছাত্রলীগের কয়েক নেতা।   মহানগর ছাত্রলীগের পদধারী ওই নেতারা এক সাংবাদিককে পেটাতে পেটাতে বলতে থাকেন ‘এই কলেজেই পড়ো আবার সাংবাদিকতা করো। সততা দেখাও? নারায়ণগঞ্জের সব সাংবাদিকরে খাইয়া দিমু।’ লোকজন জমায়েতের পর এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের ওই নেতারা বীরদর্পে  মারধর করে চলে যাওয়ার আগে মারাত্মক আহত সেই সাংবাদিককে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে বলে, ‘আজকে বাঁইচা গেলি। তোর পুলিশ বাবাদের গিয়ে এই কথা বললে একেবারে জানে মাইরা ফেলমু।’

শনিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে সরকারি তোলারাম কলেজের চতুর্থ তলায় প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ৩য় বর্ষের ফরম ফিল-আপ করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জের অনলাইন পোর্টাল ‘প্রেস নারায়ণগঞ্জ’  এর চিফ রিপোর্টার সৌরভ হোসেন সিয়াম ছাত্রলীগের বিতর্কিতদের মারধর শিকার হন। চিকিৎসা নেয়া শেষে সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে মহানগর ছাত্রলীগের মারধর করার ঘটনা বর্ণনা করেন সৌরভ।

সৌরভ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কয়েকদিন আগে তোলারাম কলেজে মার্কশিট তুলতে গিয়ে এক ছাত্রকে বেধড়ক পেটানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেটি নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকা ও অনলাইনগুলোতে সংবাদ প্রকাশিত হয়। আজ ফরম ফিলাপের কাগজপত্র তৈরি করে ফরম ফিলাপের জন্য কলেজে গেলে নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক পিয়াস প্রধান, সহ সম্পাদক তামিম, উপ সাংস্কৃতিক সম্পাদক মেহেদী প্রিন্স, তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের লোক হিসেবে কলেজে পরিচিত মেহেদী হাসান প্রিন্স ও শাহরিয়ার পরশ (হৃদয়), সার্থক আহমেদ তোফা, শেখ হাবিবুর রহমান তামিমসহ অজ্ঞাতনামা আরো ১০/১২ জন ছেলে আমার ডিপার্টমেন্টের ভেতরে আসে। আমাকে দীর্ঘক্ষণ যাবৎ অনুসরন করতে থাকে। তারা আমাকে ২০১৮ সালের ২৩ এপ্রিল কলেজ ক্যাম্পাসেই  মারধর করেছিলো বিধায় তাদের উপর আমার সন্দেহ হয়। ঘটনাটা একজন শিক্ষককে জানাই। তার পরামর্শে আমি ডিপার্টমেন্ট থেকে বের না হয়ে সেখানেই বসে থাকি।  আমি ভেবেছিলাম, ওটা আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (ডিপার্টমেন্ট), সেখানে আমার পিতৃতুল্য শিক্ষকরা আছেন, শিক্ষার্থীরাও আছে। তাই সেখানে আমি নিরাপদ। এদিকে সেই ছেলেরা বারবার ডিপার্টমেন্টে আসা-যাওয়া করছিল।

আনুমানিক সোয়া বারোটায় পিয়াস প্রধান, শাহরিয়ার পরশ, মেহেদী. তোফা ও তামিমসহ অন্যান্যরা  এসে আমাকে ডিপার্টমেন্টের ভেতরেই ঘিরে ধরে। তাদের মধ্য থেকে একজন আমাকে বলে, চল নিচে আয়। উত্তরে আমি বলি, আমি নিচে যাবো কেন? কিছু বলার থাকলে এখানেই বলো। আমি যেতে না চাইলে তারা আমাকে টেনে নিচে নিয়ে যেতে চায়। এক পর্যায়ে আমি স্যারদের ডাকাডাকি করলে ওরা ডিপার্টমেন্টের ভেতরেই আমাকে এলোপাথারি কিল-ঘুষি-লাথি মারতে থাকে। মারতে মারতে তারা বলে, এই কলেজেই পড়ো আবার সাংবাদিকতা করো। সততা দেখাও? নারায়ণগঞ্জের সব সাংবাদিকরে খাইয়া দিমু। একথা বলতে বলতে তারা মারতে মারতে তারা আমাকে ডিপার্টমেন্টের বাথরুমের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইলে আমি চিৎকার করতে থাকি। এক পর্যায়ে ওরা মারধর করে চলে যাওয়ার আগে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে বলে, আজকে বাঁইচা গেলি। তোর পুলিশ বাবাদের গিয়ে এই কথা বললে একেবারে জানে মাইরা ফেলমু। এক শিক্ষকের সহায়তায় আমি সেখান থেকে বের হয়ে আসি। পরবর্তীতে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। লিখিত অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সৌরভ আরো বলেন, এর আগেও গত বছরের ২৩ এপ্রিল সংবাদ প্রকাশের জেরে তোলারাম কলেজের ছাত্রছাত্রী সংসদ কক্ষের ভেতরে নিয়ে গিয়ে আমাকের বেধরক মারধর করে। পিয়াস প্রধান, পরশ, মেহেদী। এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল। আজ কোন কারণ ছাড়াই তারা আমাকে মারধর করে। কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, এতে করে ঐতিহ্যবাহী তোলারাম কলেজের সুনাম ক্ষুন্নসহ শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে সাহসী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হচ্ছে। এমন অবস্থায় আমি জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি পাশাপাশি তোলারাম কলেজের শিক্ষার পরিবেশ ও নারায়ণগঞ্জের সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছি।

ছাত্রলীগ নেতাদের এমন বেপরোয়া ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপে নিন্দার ঝড় উঠেছে সাংবাদিক সমাজে। অবিলম্বে এবিষয়ে ব্যবস্থা না নেয়া হলে কঠিন কর্মসূচি তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।

এ বিষয়ে মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ও তোলারাম কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ বলেন, ‘কলেজের ছাত্র হলে সে সাংবাদিক হতে পারবেনা। আর মারধরের কোন তথ্য আমাদের কাছে আসেনি। প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে আজ শিক্ষকদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। সবাই ব্যস্ত ছিলো। সাংবাদিকতা করলেও কলেজে সেটা কোন মুখ্য বিষয়না। ক্যাম্পাসে সে সাংবাদিক পরিচয় দিতে পারবেনা। তার পেশার পরিচয় থাকলে কলেজে সে পরিচিত হতে পারবেনা। এধরণের রুল জারি করা আছে ক্যাম্পাসে। এ নোটিশ জারির প্রেক্ষিতে যদি কোন ছাত্রের অভিযোগ থাকে তবে সে অধ্যক্ষ কিংবা কলেজ সংসদ বরাবর অভিযোগ জানাতে পারে। এরকম কোন ঘটনায় আমার কাছে কেউ কোন বিচার দেয় নাই। তথ্য দিলে আমি বিষয়টা দেখবো।

সরকারি তোলারাম কলেজের অধ্যক্ষ বেলা রানি সিংহ বলেন, আমি এবিষয়টি শুনেছি তাও পুলিশের কাছ থেকে। তারপরেও সেই ছাত্র আমার কাছে অভিযোগ জানালে আমি বিষয়টি দেখবো।  কোন শিক্ষার্থী চাকুরীজীবী হলে ফলাফল খারাপ করতে পারে এই চিন্তা করে চাকুরীজীবী শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যাপারে কড়াকড়ি আছে। তবে এধরণের কোন নোটিশ টানানো নেই। আমার কাছে শিক্ষার্থীদের কোন বিচার আসলে আমি তাদের ছাত্র হিসেবেই দেখবো। তবে বড় কোন ঘটনা ঘটলে পুলিশে অভিযোগ করাটা কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

বিষেরবাঁশি.কম/সংবাদদাতা/নাদিম

Categories: নারায়ণগঞ্জের খবর,শিক্ষা,সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.