শনিবার ২ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ ১৬ নভেম্বর, ২০১৯ শনিবার

খেলবেন না। পারবেন না। জিয়া পারে নাই, খালেদা জিয়া পারে নাই, এরশাদ পারে নাই

অনলাইন ডেস্ক: নারায়ণগঞ্জ শহরের মিশনপাড়ায় সলিমুল্লাহ সড়কে ‘রুখে দাঁড়াও স্বাধীনতা বিরোধী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে’ আয়োজিত সমাবেশে করেন শামীম ওসমান । হঠাৎ কি কারণে সমাবেশ সেটা নিয়েই গত কয়েকদিন ধরেই ছিল নানা জল্পনা কল্পনা। কি বলবেন শামীম ওসমান। সেদিক ছিল সকলের কৌতুহল।

শনিবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশে। বিকেল সাড়ে ৩টায় সমাবেশ শুরু হলেও এর আগে থেকেই নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে লোকজন এসে জড়ো হয়।

বিকেলে নারায়ণগঞ্জ শহরের মিশনপাড়ায় সলিমুল্লাহ সড়কে ‘রুখে দাঁড়াও স্বাধীনতা বিরোধী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে’ আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমি আল্লাহ ছাড়া কারো উপর ভরসা করি না। আজকের সমাবেশ নিয়ে অনেকে প্রশ্ন কার বিরুদ্ধে সমাবেশ। এমন কোন কাজ শামীম ওসমান করবে না যাতে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। কখন কোথায় কথা বলতে হয় আমি জানি। সংসদে ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বিরুদ্ধেও কথা বলেছি।’

সমাবেশে শামীম ওসমান বলেছেন, ‘এ মিশনপাড়া এলাকাতেই একটি বাড়িতে জামায়াতের কার্যালয় ছিল। এ বাড়ি থেকেই আমার ছোট বোনকে টাকা দেওয়া হয়। কিছুদিন আগে দেখলাম একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। জামাতের নেতা আলী আহসান মুজাহিদের স্ত্রীর সঙ্গে আমাদের কার কার সম্পর্ক সেটা আছে। মুজাহিদ যখন ফাঁসির দড়ির সামনে তখন কে তার স্ত্রী পরিবারের লোকজনদের সনদ দিয়েছে। কে নামমাত্র মূল্যে আদর্শ স্কুলের জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু সময় হলে আবার নৌকার জন্য কাঁদবেন সেটা আর হবে না।’

তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে দেখলাম পত্রিকায় নারায়াণগঞ্জে রাস্তায় কিছু হকার বসেছিল বলে আপনি গাড়ি থেকে পুলিশ ও লোক পাঠিয়ে তাদের সবকিছু রাস্তায় ফেলে দিলেন। এসময় একজন বাচ্চা সাংবাদিক মোবাইলে ছবি তুলতে গেলে তার মোবাইলটিও নাকি ভেঙ্গে ফেলেছেন। এসব করবেন না মানুষের অভিশাপ আপনাকে ছাড়বেনা। গরীবের পেটে লাথি মারবেন না। তারা গরীব মানুষ হকারি করে খায়। কাজ করে খাবেনা তাহলে কি ইয়াবা বেচবে? আগে তাদের জন্য অন্য কোথাও ব্যবস্থা করেন তারপর উচ্ছেদ করেন। কারো পেটে লাথি মারবেন না।

তিনি আরও বলেন,;আমরা যারা এমপি, মন্ত্রী তাদের প্রধানমন্ত্রী একটা কথাই বলেছেন- সব মানবো, সব ছাড় দেবো কিন্তু তৃণমূলের নেতাকর্মীকে যদি কোন মন্ত্রী, এমপি অসম্মান করেন আমি ছাড় দেবো না। আমি সেই শেখ হাসিনার কর্মী। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে ছিলাম, আছি, থাকবো। যে কয়দিন শরীরে প্রাণ আছে ততদিন আপনাদের সাথে আছি।

তিনি বলেন, ‘আজকের সমাবেশ অন্য কোন সাবজেক্ট না। গত কোরবানীর ঈদে মাংস বিতরণের নামে একটি এনজিও রোহিঙ্গাদের মাঝে অস্ত্র বিতরণ করেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহা নামের এক নারী গিয়ে অনেক কিছু বলে আসছে। ড. কামাল, মির্জা ফখরুলরা বিদেশীদের জন্য মিটিং করছেন। মনে রাখতে হবে এ দেশের মানুষ বিদেশীরা। দেশের বাইরেও বাংলাদেশকে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এটা যখন শুনলাম তখনই এ সভার প্রস্তুতি নিলাম। যদি শেখ হাসিনা ডাকেন ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে, স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে তাহলে আবারো একাত্তরের মত মাঠে নামতে হবে। এজন্যই মিটিং ডাকা।’

তিনি আরো বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারকে ডেকেছিলাম। অনেক চৌকষ পুলিশ অফিসার। সিদ্ধিরগঞ্জের ঘটনার পর আমি কথা বলেছিলাম। ঘটনা ঘটেছে ১নং ওয়ার্ডে। মামলার আসামী দেওয়া হলো ১ হতে ১০নং ওয়ার্ডে। ৭৫ জনের নাম উল্লেখ সহ ৪৯৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলো। তাদের সকলেই আওয়ামী লীগের সাচ্চা কর্মী ও ব্যবসায়ী। সিদ্ধিরগঞ্জ হলো নারায়ণগঞ্জের গোপালগঞ্জ। পুলিশ সুপার আশ্বাস দিয়েছেন নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হবে না। অতি উৎসাহী পুলিশ অফিসার ষড়যন্ত্র করছে। অনেক পুলিশ অফিসার অনেক নেতার বিরুদ্ধে নিউজ করতে সাংবাদিকদের কারো কারো টেক্সট করে।’

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা এখন চাইলে নারায়ণগঞ্জকে অবরুদ্ধ করে করতে পারি। সুতরাং আমাদের সঙ্গে খেলবেন না। কাকে খেলা শেখাবেন। আমরা তো অনেক ছোট বেলার খেলোয়াড়। যাদের এসএ আরএস সিএস পর্চার আওয়ামী লীগ তাদেরকে খাস বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে আর যারা খাস ছিলো তারা আজকে আওয়ামী লীগ। এসব যখন দেখি তখন কষ্ট লাগে। খুব কষ্ট লাগে।’

প্রশাসনের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘শুদ্ধি অভিযান চালান প্রশাসনের ভেতরে। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ মানেই আগুন নিয়ে খেলা। সুতরাং খেলবেন না। পারবেন না। জিয়া পারে নাই, খালেদা জিয়া পারে নাই, এরশাদ পারে নাই। শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে বলেছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ হলে কাউকে ছাড় দিব না। আমি সেই শেখ হাসিনার কর্মী।

জিয়ার গাড়ি আটকানো নিয়ে তিনি বলেন, ‘জাতির পিতার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বার বার নারায়ণগঞ্জের নাম উল্লেখ আছে। নারায়ণগঞ্জের বায়তুল আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে, স্বাধীনতার সনদ লেখা হয়েছে।’

শামীম ওসমান বলেন, ‘আমি জীবনেও নেতা হতে পারবো না কারণ আমার স্বার্থ আছে। আর মুজিবের সৈনিক কর্মীদের চাওয়া পাওয়া নাই নিঃস্বার্থবান।’

তিনি বলেন, ‘১৯৭৯ সাল। নেত্রী তখনো দেশে ফিরে নাই। বঙ্গবন্ধু হত্যার নীল নকশাকারী জিয়াউর রহমান নারায়ণগঞ্জে আসবেন খবর আসলো। আমরা চাষাঢ়াতে অবস্থান নিলাম। জিয়াউর রহমানের গাড়ি আটকে দিলাম। স্লোগান দিলাম খুনী জিয়া খুনী জিয়া। তখন বিএনপির জন্ম হয়নি। জাগো দলের হুমড়া চোমড়ারা আমাদের উপর এ্যাটাক করলো। ৭ জন ছেলে ছিলাম। কিন্তু কেউ দৌড় দিলাম না। আমরা সেই খেলোয়াড়।’

শেখ হাসিনার জন্য জীবন দিতে পারি ‘বাবা মায়ের পর যদি কাউকে মানি কারো জন্য জীবন দিতে পারি তাহলে তিনি হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৭৫ এর পর যারা রাজনীতিতে এসেছি আমরা শেখ হাসিনাকে স্বপ্নের মা রাজনৈতিক মা মনে করি।’

‘আমরা যখন চিৎকার করলাম তখন কেউ চিৎকার করে নাই। এ মিশনপাড়া এলাকাতেই একটি বাড়িতে জামায়াতের কার্যালয় ছিল। এ বাড়িতেই গোলাম আজমরা এসে থাকতো। আমরাই প্রথম নারায়ণগঞ্জে গোলাম আজমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলাম। সাইনবোর্ড এলাকাতে সাইনবোর্ড সাটিয়ে দেওয়া হলো নারায়ণগঞ্জে গোলাম আজম কুকুরদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। মজলিশের সূরার কমিটিতে আমাদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া হলো। আমরা শুরু করেছিলাম সেটা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদীতেও প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলো। আমাকে শেখ হাসিনা ডেকে বলেছিল তোমাকে হত্যা করা হবে। বলেছিলাম সামনা সামনি যুদ্ধ হবে। কারণ ওরা আসবে ১ হাজার আর আমরা দুইজনই যথেষ্ট। কিন্ত বুঝতে পারি নাই কাপুরুষের মতো পেছন থেকে হামলা করবে। ১৬ জুন চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলা করা হলো। মারা হলো একে একে সবাইকে। তখন রক্তের উপর শোয়া ছিলাম। দেখেছি অনুভব করেছি রক্ত কত গরম।’

ফোন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী প্রতিশোধ নেই নাই। ঘটনার পর আমার স্ত্রীকে ফোন করে বলা হয়েছিল মনে করিস না বেঁচে যাবে। ওকে আমার মারবো। আমাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। আমাদের মাতৃতুল্য নেত্রী বার বার ফোন করছিল। বলছিল দ্রুত নারায়ণগঞ্জ থেকে সরাতে। এক পর্যায়ে সাংবাদিকেরা বললো কিছু বলবেন। উত্তর দিলাম শেখ হাসিনাকে বাঁচান।’

শামীম ওসমান বলেন, ‘২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলো। আমার ভাইয়ের ফ্যাক্টরিতে হামলা করে ৩০০ গরুর বান কেটে দেওয়া হলো। রাজহাসের অর্ধেক গলা কাটা হলো। বাড়িতে গুলি হলো। আমার মা এক কাপড়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু আমরা তো ক্ষমতায় এসে প্রতিশোধ নেই নাই। কারণ আমরা স্বাধীনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া একেএম সামসুজ্জোহার ছেলে।’

‘২০০৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর আমি নারায়ণগঞ্জ এসেছিলাম। সেদিন লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল। আমাকে তখন সদর থানার ওসি ও এএসপি জানালেন আমাকে নাকি মেরে ফেলা হবে। গ্রেপ্তার করা হবে। সে রাতেই সেনাবাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করতে ঘেরাও করেছিল। অন্তত ৫ হাজার সমাগম। চাষাঢ়ায় হীরা মহলে প্রবেশ করলাম। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলো। এলাকার সবাই চলে আসলো আমার জন্য। মাত্র ৪০ মিনিটের মধ্যে লাখ মানুষ চলে আসলো। ১৭দিন আমি এলাকাতে ছিলাম। কেউ ঢুকতে পারে নাই।’

সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. আবু জাফর চৌধুরী বিরু, সাংগঠনিক সম্পাদক মীর সোহেল আলী, মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, সহ সভাপতি রবিউল হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন, সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সামসুল ইসলাম ভূইয়া, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাঈফ উল্লাহ বাদল, সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শাহাদাত হোসেন সাজনু, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসান ফেরদৌস জুয়েল, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহসীন মিয়া, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোঃ জুয়েল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধান, জেলা কৃষকলীগের সভাপতি নাজিম উদ্দিন আহমেদ, মহানগর কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জিল্লুর রহমান লিটন, মহানগর শ্রমিক লীগের সভাপতি কাজিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান মুন্না, ফতুল্লা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ফাইজুল ইসলাম, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাফায়েত আলম সানী, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সুজন, বর্তমান জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আজিজুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম রাফেল, মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হাসনাত রহমান বিন্দু প্রমুখ।

বিষেরবাঁশি.কম/ডেস্ক/নাদিম

Categories: নারায়ণগঞ্জের খবর,রাজনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.