সোমবার ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ সোমবার

কাস্টমস কর্মকর্তার বাড়িতে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে নির্মম নির্যাতন (ভিডিও)

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তার বাড়িতে চোর সন্দেহে এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে বেঁধে নির্মম ও অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঈদের পরের দিন সকালে ওই কর্মকর্তার নির্দেশে এ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। যুবকের কান্না আর আহাজারিতেও মন গলেনি ওই কর্মকর্তার। তার লোকজন প্রকাশ্যে অন্তত ১০-১৫মিনিট নির্যাতন চালায় যুবকের ওপর। পরে স্বজনদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় যুবককে। এ ঘটনায় ব্যথিত ও হতবাক এলাকাবাসী বিচার দাবি করেছে ওই কর্মকর্তার ।

কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার তাড়াইল-সাচাইল ইউনিয়নের শামুকজানি গ্রামের পশু চিকিৎসক কেন্তু মিয়ার ছেলে মোশাররফ। দুই-তিন মাস আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলায় বাড়িতে আটকে রাখা হতো। কিছুটা সুস্থ হয়ে যাওয়ায় ঈদের দিন থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ঈদের পরের দিন সকালে ভুলে পাশের গ্রাম পূর্ব দড়ি জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা মুখলেসুর রহমান খান শাহানের বাড়িতে ঢুকে যায় সে। এ সময় শাহানের বাড়ির লোকজন চোর সন্দেহে তাকে ধরে ফেলে। পরে দড়ি দিয়ে বেঁধে শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে বাড়ির সামনে অকথ্য নির্যাতন চালায় মোশাররফের ওপর। যুবকের চিৎকার, কান্না আর আহাজারিতেও কারো মন গলে নি কারও। ভয়ে উপস্থিত কেউ প্রতিবাদের সাহসও দেখায়নি। বাড়ির মালিক সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা মুখলেছুর রহমান শাহানের নির্দেশ চলতে থাকে থেমে থেমে নির্যাতন। এসময় তিনি একটি চেয়ারে বসে নির্যাতনকারীদের নানা নির্দেশনা দিচ্ছিলেন।

খবর পেয়ে এলাকার লোকজনকে নিয়ে স্বজনরা ছুটে যান ওই বাড়িতে। তাদের সামনেও চলে আরেক দফা নির্যাতন। পরে দুপুরের দিকে মোশারফের ভাই ও বাবার কাছ থেকে জোর করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় যুবককে।

মোশররফের ভাই সাদ্দাম হোসেন বলেন, খবর পেয়ে তারা এলাকার লোকজনকে নিয়ে শাহানের বাড়িতে যান। গিয়ে দেখেন তাকে মারধর করা হচ্ছে। পরে হাতেপায়ে ধরে আমার ভাইকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করি। কিন্তু বাড়ির মালিক কিছুতেই ছাড়া হবে না বলে জানিয়ে দেন। এরপর এলাকাবাসীর অনুরোধে জোর করে একটি কাগজে আমার বাবা ও আমার সই নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমি এ ঘটনার বিচার দাবি করছি।

এ নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও করে কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দিলে বিষয়টি জানাজানি হয়। ক্ষিপ্ত এলাকাবাসী বিকেলে ওই প্রভাবশালী সাবেক কর্মকর্তার বাড়ির সামনে গিয়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সময় তিনি বাসা থেকে বের হয়ে লোকজনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। একই সঙ্গে বারবার মোশাররফকে চোর বলে তিনি দাবি করেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা মুখলেছুর রহমান খান শাহানকে একটি চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়। আর তার বাড়ির কেয়ারটেকার সাজ্জাদ হোসেন হিটলারকে লাঠি দিয়ে মারধর করতে দেখা যায়। এ সময় আলম মিয়াসহ আরও কয়েকজনকে এ নির্যাতনে সহযোগিতা করতে দেখা গেছে।

এলাকার লোকজন জানায়, ছেলেটি যে মানসিক ভারসাম্যহীন এটা সবাই জানে। তাকে (মালিককে) এটি বলার পরও তিনি তাকে চোর বলতে থাকেন। এ ধরণের নির্যাতন কোনো সুস্থ মানুষ করতে পারে না।

অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই মা খুদেজা খাতুন ছেলেটিকে আরও বেশি আদরযতœ করতেন। আদরের ছেলেটিকে এভাবে নিষ্ঠুর নির্যাতনের বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তার চোখের পানি আর কান্না দেখে কাঁদলেন এলাকার লোকজন। এই অপমান ও নির্যাতন কিছুতেই মানতে পারছে না স্বজনরা।

মা খুদেজা খাতুন বলেন, আমার পাগল ছেলেটাকে বিনা কারণে মারছে। আমি এরার বিচার চাই।

অভিযুক্ত মুখলেসুর রহমান খান শাহানের সঙ্গে তার বাড়িতে কথা হলে তিনি দাবি করেন, এলাকায় তার শত্রু রয়েছে। সে ঘরে ঢুকে আমার বাড়ির পানির পাইপ ভেঙ্গে ফেলেছে। তিনি মোশাররফকে মাদকাসক্ত দাবি করে বলেন, এ কারণে তাকে কিছু মারধর করেছে তার লোকজন। তিনি দাবি করেন, ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে ভিডিও করে তার শত্রুরা ভাইরাল করেছে। আমি তো ছেলেটা চিকিৎসার জন্য টাকাও দিয়েছি। তুচ্ছ ঘটনাটি বড় করার পেছনে শত্রুদের হাত রয়েছে।

ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গতকাল সন্ধ্যায় তাড়াইল উপজেলা প্রশাসন ও থানা প্রশাসন বিষয়টির খোঁজখবর নিয়ে নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত সাজ্জাদ হোসেন হিটলারকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। একই সঙ্গে নির্যাতনের শিকার মানসিক ভারসাম্যহীন মোশাররফের বাড়িতে গিয়ে তাদের স্বজনদের সান্ত¡না দেন তাড়াইলের সহকারী কমিশনার ভূমি মোশাররফ হোসেন এবং ওসি মো. মুজিবুর রহমান।

তাড়াইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান বলেন, এ নির্যাতনের ঘটনায় গতকাল রাতে তিন জনকে আসামি করে তাড়াইল থানায় মোশাররফের ভাই সাদ্দাম হোসেন বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। বাড়ির কেয়ারটেকার সাজ্জাদ হোসেন হিটলারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Leave A Reply

Your email address will not be published.