শুক্রবার ১০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ ২৪ মে, ২০১৯ শুক্রবার

ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে দেশ

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন দেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। এদিকে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরাও এই নারীর ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে ঝড় তুলেছেন। এমন নিষ্ঠুর, বর্বর, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার দাবি জানাচ্ছেন গোটা দেশবাসী। নুসরাতের মৃত্যুতে আরেকটা বড় ধাক্কা খেল বাংলাদেশ। নাড়া দিয়েছে সব বিবেকবান মানুষকে। নাগরিকরা যে যার অবস্থান থেকে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

কেউ গণমাধ্যমে লিখে, কেউ মানববন্ধন করে; আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে এ ঘটনার নিন্দা ও ঘৃণা জানাচ্ছেন। সুবিচার দাবি করছেন এ নৃশংসতার। প্রবীণ কবি নির্মললেন্দু গুণ এ লোমহর্ষক ঘটনায় বিবেকের দংশনে জর্জরিত। তিনি এর মধ্যেই ঘোষণা করেছেন নুসরাত হত্যার বিচার নিয়ে টালবাহানা হলে তিনি আমরণ অনশনে বসবেন।

পরীক্ষা কেন্দ্রে তার গায়ে আগুন দিয়ে হত্যার বিচার দাবি করার পাশাপাশি এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে আর না ঘটে সে ব্যাপারেও কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানাচ্ছেন তারা। গত ৬ এপ্রিল আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা দিতে গিয়ে সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে দগ্ধ হন নুসরাত। ওইদিন থেকেই ঘটনাটি নিয়ে সরগরম সারা দেশ। ফেসবুক খুললেই নুসরাতের শরীর ব্যান্ডেজ করা ছবি। অনেকেই নিজের প্রোফাইল ছবি বদলে দিয়েছেন নুসরাতের ওই ছবি দিয়ে। স্ট্যাটাস ও পোস্ট দিয়ে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তারা।

নুসরাত হত্যা শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের মাঝেই থেমে নেই। গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানববন্ধন করেছে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ। তবে গতকাল শুক্রবার দেশের বিভিন্ন জায়গায় সবচেয়ে বেশি মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। নুসরাতকে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাটি গোটা দেশবাসীকে নাড়া দিয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ঘটনায় জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। দেশের বিশিষ্ট নাগরিক যেমন লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, কবিরাও এ ঘটনায় ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। গতকাল দেশের অন্যতম প্রধান ও প্রবীণ কবি নির্মলেন্দু গুণ নুসরাত হত্যার বিচার চেয়ে আমরণ অনশনের ঘোষণা দিয়েছেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ : ৬ এপ্রিল নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলার চেষ্টার ঘটনার পর থেকেই প্রতিবাদ চলছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। টানা চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হার মানেন নুসরাত। তার মৃত্যুর পর প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এ ঘটনাটি যেন পুরো দেশকেই নাড়িয়ে দেয়। এ ঘটনার জন্য দায়ী করে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষের মৃত্যুদণ্ড চেয়েছেন তারা। ফেসবুকে নুসরাত হত্যার বিচার নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেন। তাদের মতে, নুসরাত হত্যার ঘটনাটিও একদিন হারিয়ে যাবে কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্টে হত্যাকাণ্ডের শিকার তনুর মতো। ফেসবুকে কেউ লিখেছেন নুসরাতের দেওয়া শেষ বক্তব্যের অংশ; কেউ লিখেছেন তার লেখা শেষ চিঠির অংশও। সবাই তার হত্যার বিচার চান। একজন ফেসবুক ব্যবহারী লিখেছে, ‘দুঃখিত নুসরাত। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘এই শোকের প্রতিবাদের মেয়াদ কয় দিন।’

শামীম আরা নীপা নামে একজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নুসরাতের প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে, তার প্রতিবাদ করে একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করব শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত’। শামীম আরা নীপার লেখায় মূলত নুসরাতের প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি হয়েছে। সোনাগাজী ইসলামী সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার নিপীড়নের শিকার হয়ে নুসরাত তার দুই বান্ধবীকে আবেগঘন চিঠি লিখেছিলেন। এতে তিনি লিখেন— শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করব। প্রতিবাদের ভাষায় হয়তো ভিন্নতা আছে; তবে সবার দাবি একটাই এই হত্যার বিচার চান তারা।

আমরণ অনশনের ঘোষণা কবি নির্মলেন্দু গুণের : নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তোলপাড় গোটা দেশ। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি সিরাজ-উদ-দৌলা ও তার সহযোগীদের দ্রুত বিচার চেয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন অনেকে। এ বিষয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন কবি নির্মলেন্দু গুণও। মূল আসামি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা ও জড়িতদের কঠিন বিচার না হলে আমরণ অনশনের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৩৭ মিনিটে নিজের ফেসবুক ওয়ালে কবি লিখেছেন, ‘রাফির ধর্ষক সিরাজ ও সিরাজকে বাঁচাতে রাফিকে যারা পুড়িয়ে মেরেছে, তাদের কঠিন বিচার হবে। না হলে আমি আমৃত্যু অনশনে বসব।’

হত্যাকাণ্ডে জড়িত পলাতক ও গ্রেফতার আসামিরা : এ মামলার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা সাত দিনের রিমান্ডে আছেন। এ ছাড়া ওই মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আফসার উদ্দিন এবং নুসরাতের সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নুর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, নুসরাতের সহপাঠী ও মামলার প্রধান আসামি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি ও আরেক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী জোবায়ের আহমেদ পাঁচ দিনের রিমান্ডে আছেন। এজাহাভুক্ত আসামিদের মধ্যে এখনো পলাতক রয়েছেন সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের ওই মাদ্রাসার ছাত্র শাহাদাত হোসেন শামীম ও হাফেজ আবদুল কাদের। তবে গতকাল শুক্রবার সকালে ময়মনসিংহয়ের ভালুকা থেকে গ্রেফতার হয়েছেন এ মামলার অন্যতম আসামি নুর উদ্দিন। এছাড়া গ্রেফতার হয়েছেন মামলার অন্যতম আসামি সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, পৌর কাউন্সিলর মোকসুদ আলমও। চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার হয়েছেন মামলার আরেক আসামি জাবেদ আহম্মদ।

বিচার চেয়ে সারা দেশে মানববন্ধন : নুসরাত হত্যা ও নারী নিপীড়নের বিচারের দাবিতে গতকাল দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধন হয়েছে। বরিশালে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে বরিশালে মানববন্ধন করেছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ও মহিলা ফোরাম। নুসরাতের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কুড়িগ্রাম জেলা শাখা মানববন্ধন করেছে। মানববন্ধন করেছে মাগুরা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। নাটোরের বাগাতিপাড়ায়ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মানববন্ধনে বক্তারা অবিলম্বে বর্বরোচিত এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

শ্লীলতাহানির ঘটনাকে নাটক বানাতে চেয়েছিলেন ওসি : অধ্যক্ষ দ্বারা শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগ করতে গিয়ে ফেনীর সোনাগাজী থানার ওসির দ্বারা আরেক দফা হয়রানির শিকার হয়েছিলেন মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত। এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। সেই ভিডিওটি করেছিলেন সোনাগাজী থানার ওসি নিজেই। ভিডিওটি প্রকাশের পর ওসির এ ধরনের আচরণের বিষয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও করার সময় নারী পুলিশের অনুপস্থিতির বিষয়েও নজর পড়েছে অনেকের। আইনজীবীরা বলছেন, যৌন হয়রানির অভিযোগ করার সময় ভিডিও ধারণের ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। ওসির এ ধরনের আচরণের বিষয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছেন, আইন না মেনে কারোর ভিডিও করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

গত ৬ এপ্রিল সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গেলে কৌশলে নুসরাতকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে ৪/৫ জন বোরকাপরা ব্যক্তি ওই ছাত্রীর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন নুসরাত ১০ এপ্রিল মারা যান। এর আগে ৮ এপ্রিল নুসরাত জাহান রাফি ‘ডাইং ডিক্লারেশন’ (মৃত্যুশয্যায় দেওয়া বক্তব্য) দেন। নুসরাত তার বক্তব্যে বলেছেন, ওড়না দিয়ে হাত বেঁধে তার শরীরে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে ওড়না পুড়ে গেলে তার হাত মুক্ত হয়। বোরকা, নেকাব ও হাতমোজা পরা যে চার নারী তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেন, তাদের একজনের নাম শম্পা বলে জানান তিনি।

ওই ছাত্রীর স্বজনরা বলেন, গত ২৭ মার্চ তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা নুসরাতকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। ওই ঘটনায় থানায় মামলা করেন তার মা। ওই মামলায় অধ্যক্ষ কারাগারে রয়েছেন। মামলা তুলে নিতে অধ্যক্ষের লোকজন হুমকি দিয়ে আসছিল বারবার। তারা জানান, আলিম পরীক্ষা চললেও আতঙ্কে স্বজনরা পরীক্ষা কেন্দ্রের কক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে দিতেন। মামলা তুলে না নেওয়াতেই ক্ষিপ্ত হয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় নুসরাতকে।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.