রবিবার ২ আষাঢ়, ১৪২৬ ১৬ জুন, ২০১৯ রবিবার

নতুন মেরূকরণের পথে রাজনীতি!

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ার প্রশ্নে সরকার সবাইকে নিয়ে যেমন কাজ করতে চায়, অন্যদিকে মাঠের বিরোধী দলগুলোও সরকারের সঙ্গে আপাতত কোনো ‘বিরোধে’ জড়াতে চায় না। সরকার ও বিরোধী জোটে এমন চিন্তার ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে মাসখানিকের মধ্যে অনেক গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সরকারি জোট ও বিরোধী জোটের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে এরই মধ্যে যোগাযোগ শুরু করেছে। নির্বাচনের পর এমন রাজনৈতিক মেরূকরণ বা সমঝোতার পথে দুটি দলেরই কিছু দাবি-দাওয়ার বিষয়ে পর্দার আড়ালে দেনদরবারের খবরাখবর রাজনৈতিক অঙ্গনে চাউর হয়েছে।

বিএনপি জোট গত নির্বাচনে অংশ নিয়ে আটটি আসনে জয়লাভ করলেও দলটি ফল প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সংসদে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও তাতে সায় দেয়নি বিএনপি। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এমপিদের সংসদে নেওয়ার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো চেষ্টা অব্যাহত আছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। জানা গেছে, প্রয়োজনে ঐক্যফ্রন্টের দু-একজনকে মন্ত্রিসভায় স্থান দিতেও রাজি সরকার। এ ব্যাপারে সরকারি দলের নেতারা এরই মধ্যে বলেছেন, সংখ্যা দিয়ে ঐক্যফ্রন্টকে বিবেচনা করা হবে না। সংসদে যোগ দিয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দুই সংসদ সদস্য এরই মধ্যে শপথ গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া বিএনপি থেকে নির্বাচিত ছয়জন এমপি সংসদে যেতে চান বলে জানা গেছে। তবে বিএনপির হাইকমান্ড থেকে এখনো সবুজসংকেত মেলেনি।

জানা গেছে, শপথ নিয়ে সংসদে গেলে ফ্রন্টের অন্তত দুজনকে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে থাকার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও জাতীয় সংসদের বিভিন্ন পদে তাদের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনাও আছে সরকারের।

সরকারবিরোধীদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করার লক্ষ্যে এমন চিন্তাভাবনা করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিএনপিদলীয় এমপিরা শপথ নিতে পারেন এমন একটি প্রচারণা দলের মধ্যে অনেকে দিন থেকেই আছে। তবে দলটি এ মুহূর্তে তাদের প্রধান নেতা চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে জোর দিচ্ছে। আন্দোলন করে অথবা আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তির নিশ্চয়তা দলটির বর্তমান নেতৃত্ব দিতে পারছে না। আবার দীর্ঘদিন জেলখানায় থেকে খালেদা জিয়াও নানা রোগে ভুগছেন। এ নিয়ে তিনি তার কষ্টের কথা বলেছেন নেতাদের কাছেও। তাই তাকে মুক্ত করতে বিএনপি নেতারা সরকারের সঙ্গে দেনবার করছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি নিয়েই বিএনপির সঙ্গে কথা বলেছেন সরকারের দুজন প্রভাশালী ব্যক্তি। খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করলেই বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব চূড়ান্ত করা হতে পারে বলে নিশ্চিত করেছে একটি সূত্র। তবে এ সমঝোতার অংশ হিসেবে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার শর্তও থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র এক নেতা।

দলটির নেতারা মনে করেন, আইনি প্রক্রিয়ায় চেয়ারপারসনের মুক্তি আরো বিলম্ব হতে পারে। তা ছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আইনি প্রক্রিয়ায় কিংবা রাজপথের কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলে চেয়ারপারসনকে মুক্ত করা কঠিন।

এতে তার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই যেকোনো মূল্যে চেয়ারপারসনের সুচিকিৎসার উদ্যোগ নিচ্ছেন তারা। এর অংশ হিসেবে নেপথ্যে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন বিএনপির দুই নেতা। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে।

এসব বৈঠকে খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানা গেছে। এদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও চিকিৎসার বিষয়ে দলের করণীয় চূড়ান্তে সোমবার রাতে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে সরকার প্রথম থেকেই ইতিবাচক। অসুস্থ হওয়ার আগে গত বছর ৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বিএনপি চাইলে বিদেশে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমাদের মূল দাবি হচ্ছে চেয়ারপারসনের উন্নত চিকিৎসা। তার চিকিৎসার ব্যাপারে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। এ জন্য যা যা করা প্রয়োজন, আমরা তাই করব।

তিনি আরো বলেন, প্যারোলে মুক্তি নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া নির্ভর করে রোগীর ওপর। তিনি প্যারোল চাইবেন কী চাইবেন না—সেটা একান্ত তার নিজস্ব ব্যাপার। আমরা আগ বাড়িয়ে এটা বলতে পারি না।

সূত্র জানায়, সরকার এবং বিএনপির অভ্যন্তরে এক ধরনের ছাড় দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। একদিকে খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি পাবেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাবেন। অন্যদিকে বিএনপির সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন। যদিও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ৭ মার্চ শপথ নেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জয়ী গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও গণফোরামের মোকাব্বির খান। ওই দিনই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করার পাশাপাশি তার সদস্যপদ বাতিলের অনুরোধ জানিয়ে স্পিকার এবং সিইসিকে চিঠি দেওয়ার কথা গণফোরামের। কিন্তু ‘দিই, দেব করে এ চিঠি এখনো দেওয়া হয়নি।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন বলেই এ চিঠি দেওয়া হচ্ছে না। রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে ‘ধীরে চলো নীতি’ অবলম্বন করছেন তারা। এ কারণে কোনো কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও সক্রিয় নেই বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। একইভাবে রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবেই কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার নিয়ে যাওয়া হয়েছে খালেদা জিয়াকে। উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উন্নত চিকিৎসার জন্য।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: রাজনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.