সোমবার ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ সোমবার

মানসিক রোগের চিকিৎসা নিয়ে যত ভুল

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: মানসিক রোগের উপসর্গগুলোকে জিন-ভূতের আসর, জাদুটোনা-তাবিজ-আলগা বাতাসের প্রভাব বলেই বিশ্বাস করেন অনেকে। চিকিৎসাও করান তেলপড়া, পানিপড়া, তাবিজ, ঝাড়ফুঁক, ‘শিকল থেরাপি’ ইত্যাদির মাধ্যমে।

অনেকে মনে করেন, মানসিক রোগের উপসর্গগুলো বয়সের দোষ, বিয়ের জন্য টালবাহানা, ঢং বা ভং ধরা। এত কুসংস্কার ও অজ্ঞতার বেড়াজাল ডিঙিয়ে যারা চিকিৎসার আওতায় আসেন, তাদেরও বড় একটা অংশ ওষুধ নিয়ে নানা বিভ্রান্তিতে সঠিক চিকিৎসা করান না।

মানসিক রোগের ওষুধের ক্ষেত্রে একটি ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে, এগুলো খেলে ব্রেইন নষ্ট হয়ে যায়, মস্তিষ্ক আর কখনোই স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। যে কোনো রোগের চিকিৎসায় নতুন কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হলে নির্ধারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে মানবদেহে এটি কতটা কার্যকর ও নিরাপদ, তা পরীক্ষা করার পরই বাজারজাতকরণের অনুমতি দেয়া হয়। অন্য যে কোনো ওষুধের মতো মানসিক রোগ চিকিৎসার ওষুধগুলোও নির্ধারিত গবেষণায় সন্তোষজনক ফলের পরই ব্যবহারের জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত হয়েছে।

তবে একথা বলা হচ্ছে না যে, মানসিক রোগের ওষুধের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। আবিষ্কৃত কোনো কার্যকর ওষুধই শতভাগ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত নয়। এমনকি আমরা নিয়মিতই যে প্যারাসিটামল আর গ্যাসের ওষুধ (অ্যান্টিআলসারেন্ট) সেবন করি, সেগুলোও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াবিহীন নয়। মনে রাখতে হবে, একটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সব সেবনকারী আক্রান্ত হন না। কোনো কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নগণ্যসংখ্যকের হতে পারে।

কিছু সাধারণ, সহনীয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে অনেক সেবনকারীর। কিন্তু এসব প্রতিক্রিয়ার তুলনায় ওষুধের কার্যকর প্রভাব বেশি হওয়ায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাটুকু চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘গ্রহণযোগ্য’ বলেই ধরা হয়। মানসিক রোগের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য।

মানসিক রোগের ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে সেবনের উপদেশ মেনে চলতে অনেকে দ্বিধাবোধ করেন। ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, মৃগীরোগ, বাতজ্বর প্রভৃতির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ সেবন করতে হয়। তথ্য সরবরাহ এবং প্রচারণার কারণে রোগীরা এখন এসব রোগে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন। কিন্তু মানসিক রোগের ওষুধের ব্যাপারে সমাজের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও নেতিবাচক। কিছুদিন ওষুধ সেবনের পর যখন উপসর্গ কমে যায়, তখন রোগী বা তার আত্মীয়স্বজন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ বন্ধ করে দেন। ফলে চিকিৎসা সঠিক হয় না এবং কিছুদিন পর রোগ ফিরে আসে।

অনেকে আবার ওষুধ ছাড়া শুধু সাইকোথেরাপি অথবা কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করে দেয়ার দাবি জানান। মানসিক রোগের ধরন অনুযায়ী ওষুধ, সাইকোথেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। কিছু রোগের চিকিৎসায় যেমন সাইকোথেরাপিই প্রথম পছন্দ, আবার কিছু রোগে ওষুধ অপরিহার্য।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ রোগীর রোগ নির্ণয় করে কোনো ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, সে পরামর্শ দেবেন। ওষুধ সেবন শুরুও করতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে, বন্ধও করতে হবে তার পরামর্শ মতো।

লেখক : মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Leave A Reply

Your email address will not be published.