মঙ্গলবার ৫ ভাদ্র, ১৪২৬ ২০ আগস্ট, ২০১৯ মঙ্গলবার

তিন বছরে ৪০ দেশ ভ্রমণ

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: ঢাকা থেকে দুবাইগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ ছিনতাইচেষ্টার পর কমান্ডো অভিযানে নিহত তরুণ পলাশ আহমেদকে ঘিরে রহস্য ঘনিভূত হচ্ছে। রবিবার সন্ধ্যায় ওই ঘটনার পর তার নাম মাহাদী বলে জানিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী; কিন্তু পরে জানা যায় ওই তরুণের নাম পলাশ আহমেদ। তবে তার ফেসবুক আইডিতে পরিচয় দেওয়া আছে মাহীবি জাহান।

র‌্যাবও জানিয়েছে, পলাশের আঙুলের ছাপ তাদের ডাটাবেজে থাকা এক অপরাধীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। তিনি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের দুধঘাটা এলাকার পিয়ার জাহান সরদারের ছেলে। তার নামে ২০১২ সালে এক নারীকে অপহরণের মামলা রয়েছে। ওই সময় তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।

ইমিগ্রেশন পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পলাশের পরিচয় উদ্ধার করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য মিলেছে।

দেখা গেছে, গত তিন বছরে পলাশ ৪০টিরও বেশি দেশে যাতায়াত করেছেন। শুধু গত বছরই এই তরুণ দুবাই যান চারবার। প্রত্যেকবার দুদিনের বেশি সেখানে থাকেননি। একই বছর তিনি মালয়েশিয়া ও ভারতেও তিনবার করে যাতায়াত করেন। সর্বশেষ গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর দুবাই গিয়ে মাত্র দুদিন পর ২৮ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন পলাশ।

এর আগে গত বছরের ১১ মে, ২ জুন, ১৯ আগস্ট তিন দফা তিনি দুবাই যান। গতকাল র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, পলাশের আঙুলের ছাপ ও চোখের মণি পরীক্ষা করে আমাদের ডাটাবেজে থাকা এক অপরাধীর সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। সেই অনুযায়ী নিহতের বিমানের টিকিট ও পাসপোর্টের তথ্যে সব মিল পাওয়া গেছে।

তিনি আরও জানান, উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারী পলাশ ২০১২ সালে এক নারীকে অপহরণ করে ৮ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। তখন তাকে এক সহযোগীসহ আটক করে র‌্যাব-১১। একইসঙ্গে সেই নারীকেও উদ্ধার করা হয়। র‌্যাবের ডাটাবেজ অনুযায়ী ২০১২ সালে তিনি বিবাহিত ছিলেন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা দাখিল পাস। বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখছি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পলাশ আহমেদের পাসপোর্ট নম্বর বিএন ০৯৫০৮৮২। এই পাসপোর্টের সূত্র ধরেই তার বিদেশ যাতায়াতের তথ্য বেরিয়ে আসে। গত তিন বছরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, মালয়েশিয়া, নেপাল, ভুটান, সিঙ্গাপুরসহ অন্তত ৪০টি দেশে গিয়েছেন। তবে পলাশ সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করেছেন দুবাই। কেন তিনি বারবার দুবাই যেতেন তা এখন খতিয়ে দেখছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, একজন মানুষের স্বাভাবিক বিদেশ যাতায়াতের চিত্রের সঙ্গে পলাশ আহমেদের বিদেশ ভ্রমণের মিল নেই। তার কার্মকাণ্ড এক অস্বাভাবিক। তার পুরো জীবনযাপন রহস্যেঘেরা। কখনও তিনি নিজেকে আইটি এক্সপার্ট, আবার কখনও স্বল্প দৈর্ঘ্য সিনেমার নায়ক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেন। তিনি এতবার বিদেশে কেন যেতেন তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে।

কে এই পলাশ?

আমাদের সোনারগাঁও প্রতিনিধি জানান, ২০১১ সালের দিকে স্থানীয় তাহেরপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন পলাশ। পরে সোনারগাঁও ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও এক পর্যায়ে পড়াশোনা বন্ধ করে দেন।

পলাশকে নিজের অবাধ্য সন্তান দাবি করে বাবা পিয়ার জাহান বলেন, আমি ১৯৯০ সাল থেকে বিদেশে থাকতাম। প্রথমে কুয়েত এবং পরে সৌদি আরবে ছিলাম দীর্ঘদিন। পলাশ আমার চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। আমার পাঠানো টাকা নিয়ে পলাশ উশৃঙ্খল জীবনযাপন করত। একটা সময় সে বাসা ছেড়ে ঢাকায় চলে যায়। এর মধ্যে নাচ-গান থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় ‘কবর’ নামে একটি নাটক তৈরি ও বেশ কয়েকটি গানের অডিও ক্যাসেটও বের করে। এমনিতে পলাশ বাড়িতে তেমন আসত না। শুধু টাকার প্রয়োজন হলেই বাড়িতে আসত। ফেসবুকের মাধ্যমে জেনেছি, আমার ছেলের সঙ্গে নায়িকা সিমলার বিয়ে হয়েছে। সিমলাকে নিয়ে সে কয়েকবার আমাদের বাড়িতেও এসেছিল। সিমলা ছিল তার দ্বিতীয় স্ত্রী।

এর আগে ২০১৪ সালে বগুড়া সদর উপজেলার সাতমাথা ভাই পাগলা মাজারের পাশে মেঘলা নামের এক মেয়েকে পলাশ বিয়ে করেছিল। সেখানে তার আয়ান নামে এক ছেলে রয়েছে। বিয়ের এক বছর পর মেঘলার সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। মুদি দোকান দিয়ে জীবিকানির্বাহ করা পলাশের বাবা আরও বলেন, ২০-২৫ দিন আগে আমার ছেলে হঠাৎ বাড়িতে আসে। এ সময় তার মধ্যে দেখা দেয় পরিবর্তন।

নিয়মিত মসজিদে যাতায়াত ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও শুরু করে, এমনকি আজানও দিয়েছে। গত শুক্রবার দুবাই যাওয়ার কথা বলে সে বাসা থেকে বেড়িয়ে যায়। এদিকে আমাদের বগুড়া অফিসের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, পলাশের আগের স্ত্রী নুসরাত জাহান মেঘলা দাবি করেছেন, তার সাবেক স্বামী একজন ছদ্মবেশী প্রতারক।

তিনি জানান, তার বাবা আইনজীবী এবং মা সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। ২০১৩ সালে অনার্স পড়ার সময় ফেসবুকে পলাশের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মাত্র ৬ মাসের পরিচয়ে বাবা-মায়ের অমতে পালিয়ে তিনি পলাশকে বিয়ে করেছিলেন। পলাশ বলেছিল, তার বাবা বিদেশে থাকেন। তাদের ঢাকায় বাড়ি রয়েছে। সেখানেই মেঘলাকে রাখবে; কিন্তু পালিয়ে ঢাকায় গিয়ে বিয়ের পর মেঘলাকে নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণগঞ্জের বাড়িতে।

মেঘলা জানান, শুরুতেই পলাশের খামখেয়ালিপনা তার কাছে ধরা পড়ে। তার বাণ্ডুলে স্বভাব এবং বাজে খরচের বিষয়টি জানার পরও তিনি চেষ্টা করেছিলেন পলাশকে সুপথে ফিরিয়ে আনতে; কিন্তুু পলাশ এবং তার বাবা-মায়ের লোভ ছিল শ্বশুরবাড়ির টাকার প্রতি। এ জন্য তাকে নির্যাতন করা হতো। ফলে তার সঙ্গে তিন মাসের বেশি সংসার করতে পারেননি। এর মধ্যে পলাশের অনেক অনৈতিক সম্পর্কের বিষয় জানা যায়।

২০১৭ সালের প্রথম দিকে তাদের ছেলে আয়ানের জন্ম হয়। ওই সময় বগুড়ায় সর্বশেষ এসেছিল পলাশ। ছেলে হওয়ার সংবাদ পেয়ে পলাশ এবং তার বাবা-মা টাকা দেওয়ার জন্য আমার পরিবারের ওপর আরও বেশি চাপ দিতে থাকে। মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মেঘলা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় সে যাত্রায় বেঁচে যায়।

২০১৮ সালের শুরুর দিকে নিজের ফেসবুকে পলাশ চিত্রনায়িকা সিমলাকে বিয়ে করার সংবাদ দেয়। এর পর গত মার্চে পলাশকে মেঘলা ডিভোর্স দেয়।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: জাতীয়,নারায়ণগঞ্জের খবর,সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.