শনিবার ৪ ফাল্গুন, ১৪২৫ ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ শনিবার

১৯৭৪ সালে বাসন্তিকে জাল পড়িয়ে ছবি তুলে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা দুই কারিগর

 

 

 টপিু চৌধুরী: ১৯৭৪ এ বাসন্তী-দুর্গতি নাটকের মইনুল কারাগারে, আফতাব আহমেদ পরপারে কুড়িগ্রাম জেলার প্রত্যন্ত এলাকা চিলমারীর জেলে পাড়ার বাক প্রতিবন্ধী বাসন্তী ও তার কাকাতো বোন দুর্গতির জাল পরিহিত লজ্জা নিবারণের একটি ছবি ১৯৭৪ সালে ব্যারিষ্টার মইনুল হোসেন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। অভাবের তাড়নায় সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারছিল না বলে ছবিটিতে দেখানো হয়।

সেই বহুল আলোচিত ছবির ফটোগ্রাফার ছিলেন ইত্তেফাকেরই নিজস্ব আলোক চিত্রি, রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া থানার মহিপুরের আফতাব আহমদ। পরবর্তীতে বেরিয়ে আসে ছবিটি ছিল সম্পূর্ণ সাজানো। বঙ্গবন্ধুকে ব্যর্থ প্রমান করতে বাসন্তী ও দুর্গতিকে নিয়ে প্রকাশিত সাজানো সেই ছবিটি ছিল হলুদ সাংবাদিকতা ও নোংরা রাজনীতির খেলা। যে খেলার মুখোশ উম্মোচিত হলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অনেক প্রতিবেদনও ছাপা হয়।

১৯৯৬ সালের ৫ অক্টোবর দৈনিক খবর-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়, ❝চিলমারীর বন্দর থেকে কয়েকশ গজ দূরে বেশকিছু কুঁড়ে ঘর। এখানেই বাসন্তীদের আবাস। জেলেপাড়ায় ঢুকতেই একটি মনোহারি দোকান। দোকানের মালিক ধীরেন বাবুর সঙ্গে কথা হলো। তিনি জানালেন, ‘৭৪-এর অনেক কথা। যেদিন বাসন্তীদের ছবি তোলা হয়, সেদিনও তার পরনে কাপড় ছিল। কিন্তু ছেঁড়া জাল পড়িয়ে কৌশলে তাদের ছবি তোলা হয়। এটা এক ধরনের চক্রান্ত ছাড়া কিছুই নয় বলে মনে করেন অনেকেই।❞

১৯৯৬ সালের ১২ অক্টোবর দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে লেখা হয় ❝বাসন্তী জন্ম অবধি বোবা তাই বাসন্তীর কাছে সেই কাহিনী জানা যায়নি। তবে সে ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী বাসন্তীর কাকা বুদুরাম দাশ (৮০)। ব্রহ্মপুত্র নদে একটা নৌকায় বসে তাঁর পুরানা দিনের নানা স্তরে ঢাকা স্মৃতির পাতা হাতড়িয়ে জানালেন সেদিনের কাহিনী।

সঠিক ভাবে দিন-তারিখ মনে নেই। একদিন বাসন্তী ও তাঁর কাকাতো বোন দুর্গাতিসহ পরিবারের আরও কয়েকজন মিলে ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁধের ওপর বসেছিলেন। তখন দুপুর গড়িয়েছে। এমন সময় ইউপি চেয়ারম্যান আনসার আলি বেপারি (এক সময়ের মুসলিম লীগ ও পরে আওয়ামীলীগের মাঠ পর্যায়ের নেতা) কয়েকজন রাজনৈতিক দলের নেতাসহ একজন সাংবাদিককে (আফতাব আহমেদ, আলোকচিত্রি, দৈনিক ইত্তেফাক) নিয়ে আসেন মাঝি পাড়ায়। তারা বাসন্তী ও দুর্গাতির ছবি তুলতে চান।

এ সময় তারা বাঁধের ওপর মাঝিদের রোদে শুকোতে দেয়া জাল তুলে এনে তা বাসন্তীর ছেঁড়া শাড়ির ওপর পরিয়ে ছবি তোলেন। বুদুরাম এভাবে ছবি তুলতে আপত্তি জানিয়ে নিষেধ করেছিলেন। তবুও তারা শোনেননি। এ প্রসঙ্গে বুদুরাম দাশ তার ভাষায় জানায়, ‘চেয়ারম্যান সাব ছেঁড়া হউক আর ফারা হউক একনাতো শাড়ি আছে উয়ার উপরত ফির জাল খান ক্যা পরান, ইয়ার মানে কি? (চেয়ারম্যান সাহেব। ছেঁড়া হোক একটা শাড়ি তো আছে, তার ওপর জাল কেন পরান; এর কারণ কি? তখন সাইবদের মইদ্যে একজন কয় ইয়ার পরোত আরো কত কিছু হইবে…. তখন একজন সাহেব জানায় এরপর আরো অনেক কিছু হবে…..।❞

দৈনিক সংবাদের ওপর একটি প্রতিবেদনে ছাপা হয় ❝তেইশ বছর কেটে গেছে বাসন্তীর ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি❞ শিরোনামে। সেই রিপোর্টে বলা হয় ❝জেলেপাড়ার মানুষ জন এখন অনেক সচেতন। সাংবাদিক পরিচয় পেলেই সাবধান হয়ে যায়, ভাবে আবার না জানি কোন ফন্দি ফিকির নিয়ে আসলো। গ্রামের কাছাকাছি গেলেই গ্রামবাসীর উৎসুক দৃষ্টি। বাসন্তীর ছবি তুলতে গেলে গ্রামবাসী দুই যুবক বাঁধা দেয়।

একজন মুখ আড়াল করে অশ্লীল শব্দ ছুঁড়ে দেয়। একজন বিক্ষুব্ধ হয়ে বলে, ‘‘৭৪ এর মঙ্গা থাকি হামরা দেখপার নাগছি হামার বাসন্তীর ফটোক তুলি কত কি হইল। বাসন্তীক জাল পরেয়া ফটোক তুলি আর কত ব্যবসা করমেন তোমরা গুলা? ম্যালা হইছে এ্যালা ছাড় আর ফটোক তুলবার দিবার নাই। বাসন্তীক জাল পরেয়া ফটোক তুলি কি হইল? মঙ্গাত মানুষ মইল, শ্যাখের ব্যাটাক (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব) মারি ফেলাইল। তাতে হামার কি হইল ? বাসন্তীর প্যাটোত এ্যালাও ভোক, পরনোত শাড়ি জোটে না, ব্যালাউজ নাই, ভাতের জন্যি খালি কান্দে।❞

১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ পীড়িত চিলমারি বাসন্তী ও দুর্গতির ছবির জন্য ২০০৬ সালে আফতাব আহমদেকে একুশে পদক প্রদান করে পুরস্কৃত করেন তৎকালীন সরকার।এর কিছুদিন পরইবাসার দারোয়ানের হাতে নির্মমভাবে খুন হন ফটোগ্রাফার আফতার আহমেদ।

তথ্য সূত্র :-
১: মঙ্গার আলেখ্য – মাহবুব রহমান
২: চিলমারীর এক যুগ – মোনাজাত উদ্দিন।
৩: পথ থেকে পথে – মোনাজাত উদ্দিন।
৪: দৈনিক খবর – ১৯৯৬ সাল।
৫: দৈনিক ইত্তেফাক – ১৯৯৮ সাল।
৬: দৈনিক সংবাদ – ১৯৯৮ সাল।

কার্টেসী # রতন কুমার মজুমদার

 

 

বিষেরবাঁশী.কম/ডেস্ক/নিঃতঃ

Categories: খোলা বাতায়ন

Leave A Reply

Your email address will not be published.