শনিবার ৯ চৈত্র, ১৪২৫ ২৩ মার্চ, ২০১৯ শনিবার

দায় এবং দায়িত্ব

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: একটানা তৃতীয়বার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনটি অলংকৃত করেছেন শেখ হাসিনা। এবার তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব শুরুর প্রাক্কালেই তিনি বলেছেন, ‘দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে।’ তার এই বোধের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি আমরা এ কথাটি বলতে পারি যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার দায় এবং দায়িত্ব দুটোই বেড়েছে। আপনাকে আরো সচেতনতা ও সতর্কতার সাথে দেশ চালাতে হবে। কারণ দেশের উন্নয়নকে আরো এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিরোধী সব অপশক্তিকেও মোকাবিলা করতে হবে দক্ষতার সাথে। কেননা, উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আজকের বাংলাদেশকে উন্নত বাংলাদেশে রূপান্তরের কাণ্ডারি এখন একমাত্র আপনিই। দেশবাসীর সকল চাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষা এখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। আপনি সফলভাবেই উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন ও চেতনাকে দেশের জনগণের মাঝে বুনে দিয়েছেন। দেশের মানুষ এখন উন্নয়নের পক্ষে। বিশেষত আমাদের তরুণসমাজ উন্নত বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের দেখতে চায়। সে জন্য আপনার দায় এবং দায়িত্ব দুটোই বেড়েছে।

এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্যতম একটি স্লোগান—‘আমার গ্রাম আমার শহর’ যথার্থই ইতিবাচক ও সদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। তাই গ্রামমুখী বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু থেকেই পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ছোঁয়া গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। গ্রাম অনেক উন্নত হয়েছে। তারপরও বলব গ্রামের মানুষদের উপেক্ষা করে প্রকৃত উন্নয়ন অসম্ভব। গ্রামীণ পর্যায়ে বিশেষত কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এসবকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গ্রাম এলাকায় অন্তত উপজেলা পর্যায়ে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়লেই ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এলাকায় কাজ পেলে মানুষ আর শহরমুখী হবে না। শহরে মানুষের অযাচিত চাপ কমবে।

আমাদের তরুণ প্রজন্ম এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত। তাদের এই চেতনার আদর্শিক জাগরণকে ধরে রাখতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়তে হবে। আর এই চেতনার সাথে আমাদের জনপ্রতিনিধিদের জনসম্পৃক্ততা আরো বাড়াতে হবে। জনপ্রতিনিধিরা যেন দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি সামাজিক অবক্ষয় রোধে তরুণ প্রজন্ম সব সময় চেতনায় উজ্জীবিত রাখে, সেদিকে বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন। নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে, তবে জনসংখ্যার অনুপাতে তার পরিসর আরো অনেক বৃদ্ধি করা জরুরি। ঘরে-বাইরে নারীদের কর্ম-উপযোগী পরিবেশ ও উদ্যম সৃষ্টি করা দরকার। সেই সাথে দরকার হাওর এবং পাহাড়ে উৎপাদনশীলতায় আরো নজর দেওয়া। কেননা, ফল ও ফসল উৎপাদনে পাহাড় এবং ফসল ও মৎস্য উৎপাদনে হাওরের গুরুত্ব অপরিসীম।

প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলেছেন। এ এক কটিন পরীক্ষা তবে অসম্ভব নয়। এ জন্য সবার আগে মন্ত্রিপরিষদকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে দুর্নীতিমুক্ত হওয়া বেশ কঠিন, অসম্ভব হলেও—দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা মুটেও কঠিন বা অসম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধু ঠিকই বলেছিলেন—যত লোভ-লালসা আর ভোগ-বিলাসের সবকিছু যেন শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই বেশি। স্বাধীনতা অর্জনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে বহুমুখী কার্যক্রম শুরু করেও বঙ্গবন্ধু পদে পদে বাধাগ্রস্ত হন দুর্নীতির কারণে। শিক্ষিত সমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শিক্ষিত সমাজের কাছে আমার একটা কথা, আমরা শতকরা কতজন শিক্ষিত লোক? আমরা শতকরা ২০ জন শিক্ষিত লোক। এর মধ্যে সত্যিকার অর্থে আমরা শতকরা পাঁচজন শিক্ষিত। আপনাদের কাছে আমার একটা প্রশ্ন—আমি এই যে, দুর্নীতির কথা বললাম, এসব কারা করে? আমার কৃষক দুর্নীতিবাজ? না। আমার শ্রমিক দুর্নীতিবাজ? না। তাহলে ঘুষ খায় কারা? ব্ল্যাক মার্কেটিং কারা করে? বিদেশে টাকা চালান দেয় কারা? এই আমরা যারা পাঁচ ভাগ শিক্ষিত। এই আমাদের মধ্যেই রয়েছে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ। আমাদের চরিত্রের সংশোধন করতে হবে। আত্মশুদ্ধি করতে হবে।’ তাহলে বোঝা গেল দুর্নীতি নামক রোগটি বাঙালি জাতির সঙ্গে মিশে আছে স্বাধীনতার আগে থেকেই। তাই দুর্নীতি নির্মূলের চেয়ে আগে গুরুত্ব দিতে লাগাম টেনে ধরার দিকে। আবার মনে রাখতে হবে আদর্শের রাজনীতি যত দিন প্রতিষ্ঠিত না হবে, তত দিন দুর্নীতি থামানো যাবে না। সে জন্য রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সবার আগে জরুরি। সব পেশার ক্ষেত্রে পেশাগত সততা থাকতে হবে।

সবার আগে দেশের স্বার্থ প্রাধান্য দিতে হবে। জনগণেল মধ্যেও এই চেতনা ও মানসিকতার জাগরণ ঘটাতে হবে। নিয়ম মানার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

গত দুই মেয়াদে তার নেতৃত্বে অনেক দূর এগিয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনেক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি উন্নত বাংলাদেশের পথে অগ্রসরমান হওয়ার আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, কৃষিজ উৎপাদন, যোগাযোগ, ডিজিটাল বাংলাদেশ, নারীর ক্ষমতায়নসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। এ কথাও অনস্বীকার্য আগের মেয়াদে দিনবদলের সনদ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান নিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালনে তিনি বিশ্বে নন্দিত হয়েছেন তিনি। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা প্রমাণে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে শেখ হাসিনার গ্রহণযোগ্যতা উচ্চ আসনে আসীন হয়েছে। বিশেষত গত দুই মেয়াদে বিডিআর বিদ্রোহ, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার এবং জঙ্গিবাদ নির্মূলে শেখ হাসিনার সাহসী ভূমিকা বাংলাদেশের শাসনকর্তা হিসেবে দেশে এবং বহির্বিশ্বে অন্যমাত্রা পেয়েছে।

শত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি দেশের সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে মনোযোগ বিচ্যুত হননি। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী জোটের পেট্রলবোমার সন্ত্রাসী আন্দোলনকে তিনি ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ে এবং প্রত্যাবাসনের বিষয়েও তিনি দূরদর্শী নেতৃত্বের ভূমিকায় বিশ্বনেতাদের সমীহ অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। এসব কারণে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব দক্ষতা নিয়ে আর নানামাত্রিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। তিনি গত দশ বছরে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করেছেন। দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে। উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে গ্রামগঞ্জেও। বাংলাদেশের আপামর জনগণ এখন উন্নত দেশের বাসিন্দা হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

লেখক : কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: জাতীয়

Leave A Reply

Your email address will not be published.