শুক্রবার ৬ আশ্বিন, ১৪২৫ ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শুক্রবার

ঘরে ঘরে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ

 

  • আফিফ ফারুকী অভি

রাজধানীতে প্রতি ঘরে ঘরে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। হঠাৎ করে এ রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মাঝে এক আতঙ্ক বিরাজ করছে। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের ভিড় বাড়ছে। বর্ষাকালের আগে থেকেই হঠাৎ হঠাৎ অতিবৃষ্টি হওয়ায় যেখানে-সেখানে পানি জমে থাকায় মশা ডিম পাড়ছে। আর এই অতিরিক্ত মশার কারণে হঠাৎ করেই বেড়েছে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের প্রকোপ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, সম্প্রতি চিকুনগুনিয়া নামে একটি ভাইরাসজনিত রোগ মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ডেঙ্গু রোগের ভাইরাস যে মশা বহন করে, সেই এডিসই চিকুনগুনিয়া ভাইরাসও বহন করে। জ্বর মানেই ‘চিকুনগুনিয়া’ নয়। চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মাথাব্যথা, সর্দি, বমি বমি ভাব, হাত-পা ও আঙুলের গিঁটে গিঁটে ব্যথা, ফোসকা পড়া ছাড়াও শরীর বেঁকে যেতে পারে। চিকুনগুনিয়া জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এ রোগের চিকিৎসা বাসা-বাড়িতেই সম্ভব। সাধারণত এডিসের কামড়ানোর পাঁচদিন পর থেকে শরীরে লক্ষণগুলো ফুটে ওঠে। বাংলাদেশে এতে আক্রান্তদের মধ্যে কারো মৃত্যুর ঘটনা নেই তবে যারা আগে থেকেই ডায়াবেটিক ও হৃদরোগসহ নানা ধরণের পুবনো রোগে ভুগছেন তাদের মৃত্যুঝুঁকি থাকছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু জ্বরের সঙ্গে চিকুনগুনিয়ার অনেক পার্থক্য রয়েছে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সাধারণত এত দীর্ঘ সময় ধরে শরীর ব্যথা বা অন্য লক্ষণগুলো থাকে না। যদিও জ্বর ভালো হয়ে গেলে কয়েকদিন দুর্বলতা বা ক্লান্তি লাগতে পারে। চিকুনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত হলে কেউ মারা যায় না, তবে যে ব্যক্তি আগে থেকেই বিভিন্না রোগে ভুগছেন তাদের যদি চিকুনগুনিয়া হয় তাহলে তার ঝুঁকিটা থাকছে। এছাড়া এ রোগে দীর্ঘদিনের জন্য অনেকেই স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। তিনি বলেন, চিকুনগুনিয়া সন্দেহ হলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তা নিশ্চিত হওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে রোগীর রক্তে ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া এন্টিবডি পরীক্ষা করে দেখা হয়। রোগীর আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে শুধু শুধু এ পরীক্ষা করার কোনো দরকার নেই। কেননা, এতে চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো লাভ হবে না। তিনি আরো বলেন, এর চিকিৎসা মূলত রোগের উপসর্গগুলোকে নিরাময় করা। সে অনুযায়ী ওষুধ দেয়া যায়। এ জ্বরে রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে এবং প্রচুর পানি বা অন্যান্য তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে। চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা না করে জ্বর হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। এর সঙ্গে সঙ্গে পানি দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। তীব্র ব্যথার জন্য অন্য ভালো ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে, তবে এসপিরিন না ব্যবহার করাই ভালো। রোগীকে আবার যেন মশা না কামড়ায় এ জন্য তাকে মশারির ভেতরে রাখাই ভালো। কারণ, আক্রান্ত রোগীকে মশায় কামড় দিয়ে অন্য কোনো সুস্থ লোককে সেই মশা কামড়ালে ওই ব্যক্তিও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। এছাড়া চিকুনগুনিয়া জ্বরের কোনো প্রতিষেধক নেই, কোনো ভ্যাক্সিন বা টিকাও নেই। তাই রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো এডিস মশা প্রতিরোধ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনে ঢাকা শহরের ২৩টি এলাকাকে চিকুনগুনিয়ার জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। এলাকাগুলো হচ্ছে- ধানমন্ডি ৩২, ধানমন্ডি ৯/এ, উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টর, মধ্যবাড্ডা, গুলশান-১, লালমাটিয়া, পল্লবী, মগবাজার, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, রামপুরা, তেজগাঁও, বনানী, নয়াটোলা, কুড়িল, পীরেরবাগ, রায়েরবাজার, শ্যামলী, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর, মণিপুরিপাড়া, মোহাম্মদপুর, মহাখালী, মিরপুর-১ ও কড়াইল বস্তি। গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর এ ২৩টি এলাকায় চিকুনগুনিয়ার বাহক মশার ঘনত্ব বেশি। তাই এসব এলাকায় মশক নিধন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাবের কোনো আশঙ্কা নেই। এ নিয়ে আতঙ্ক হওয়ার কিছুই নেই। আমরা সিটি কর্পোরেশনে মশক নিধন কর্মসূচি জোরদার করার কথা বলেছি। তবে চিকুনগুনিয়া থেকে সবাইকে সচেতন হতে হবে। অনেক সময় বাড়িঘরের মধ্য অনেকদিন পানি জমে থাকে। ফলে সেখানে এডিস মশার উৎপত্তি হতে পারে। তাই বাড়ির ভেতরে, বাড়ির ছাদে যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে জনগণকে খেয়াল রাখাতে হবে। তিনি বলেন, চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে আতঙ্ক না ছড়িয়ে গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকার এ ক্ষেত্রে বরাবরের মতোই প্রস্তুত। চিকুনগুনিয়া জীবনঘাতী কোনো রোগ নয়। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে আমরা তারাবির নামাজের আগে ও জুমার নামাজে এ রোগ সম্পর্কে ধারণা দিতে বলেছি। চিকুনগুনিয়া রোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিভিন্ন রকম প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বচেতনতা ছাড়া এ রোগ নির্মূল সম্ভব নয়।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক সাবরিনা ফ্লোরা বলেন, বিশ্বে গত ৫০ বছরে চিকুনগুনিয়া রোগের প্রকোপ ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এটি একটি বাহকবাহিত রোগ। প্রতি বছর বিশ্বে বাহকবাহিত রোগে এক কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়। গত বছর ভারতে প্রায় ১২ লাখ মানুষ এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়। এ রোগে আক্রান্তদের মধ্যে ৯২ শতাংশের জ্বর ও ৮২ শতাংশের ক্ষেত্রে গিঁটে ব্যথার লক্ষণ সুস্পষ্ট। ঢাকা ছাড়া দেশের আর কোনো স্থানে এ ধরনের রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়নি।

রাজধানী ঢাকার মশা নিধনের দায়িত্ব মশক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের। কিন্তু এই দপ্তরের ব্যর্থতার পর এ কাজ চলছে যৌথভাবে। অধিদপ্তরের মোট জনবলের সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু জনবল যুক্ত করে যৌথভাবেই নগরীর মশা নিধনের কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। তবে রাজধানীতে সিটি কর্পোরেশনের ময়লা পরিষ্কারে উদাসীনতা ও মশক নিধন কর্মসূচি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই রোগের বাহক মশার বিস্তার বৃদ্ধি পেয়েছে।

এদিকে রাজধানীর মশা নিধনে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সফলতা দেখাতে পারেনি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন সোয়া ২৩ কোটি টাকা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সাড়ে ১১ কোটি টাকাসহ মোট ৩৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখে। অথচ এ পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে রাজধানীর মশা নিধনে সফলতা দেখাতে পারেনি কোনো সিটি কর্পোরেশনই।

এই ব্যর্থতার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। তারা অভিযোগ করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাড়ি মালিকদের কাছে ওষুধ বিক্রি করে দিচ্ছেন মশক কর্মীরা। আবার অনেকেই টাকা নিয়ে বিত্তশালীদের বাড়িতে স্প্রে করছেন। মশা উৎপাদনের স্থানগুলোর আশপাশে ছিটানো হচ্ছে না ওষুধ। এতে দিন দিন বাড়ছে মশার উৎপাত আর মশাবাহিত নানা রোগ। বর্তমানে রাজধানীতে মশাবাহিত চিকুনগুনিয়া রোগ বিস্তার হয়েছে সিটি কর্পোরেশেনের ব্যর্থতার কারণে। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠো ফোনে বারবার যোগযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

চিকুনগুনিয়ার জন্ম ১৯৫২ সালে আফ্রিকায়। প্রথম তানজানিয়ায় রোগটি শনাক্ত হয়। তবে এখন বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে রোগটি দেখা যায়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এই রোগের কোনো নির্দিষ্ট প্রতিকার নেই। লক্ষণ দেখে চিকিৎসা ঠিক করা হয়।

ডেস্ক/ক্যানি

Categories: স্বাস্থ্য

Leave A Reply

Your email address will not be published.