রবিবার ৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১৮ নভেম্বর, ২০১৮ রবিবার

দেশে আবার সোয়াইন ফ্লু

  • অনলাইন ডেস্ক

দেশজুড়ে চিকুনগুনিয়ার ব্যাপক বিস্তার এবং ডেঙ্গু ও ডায়রিয়ার প্রকোপের মধ্যে উদ্বেগজনক তথ্য মিলেছে অপেক্ষাকৃত ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী ইনফ্লুয়েঞ্জা সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার। এইচওয়ানএনওয়ান ভাইরাসের মাধ্যমে হওয়া এ রোগে আক্রান্ত কমপক্ষে ১৯ রোগী গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশের কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে বলে সরকারি সূত্রেই জানা গেছে। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত কারো মৃত্যু ঘটেছে কি না জানা যায়নি।

এর আগে ২০০৯ সালের জুন থেকে গত বছর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত কয়েকজনের মৃত্যু ঘটে। ওই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০ হাজারের বেশি। এমনকি এ বছরও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ কয়েকটি দেশে সোয়াইন ফ্লুর প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বিভিন্ন দেশে।সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) হাসপাতালভিত্তিক হিউম্যান ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভেইল্যান্স রিপোর্ট ঘেঁটে দেখা যায়, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ঢাকা, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ ও নরসিংদীতে ৯ জন এবং কেবল এপ্রিল মাসে ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বরিশাল ও দিনাজপুরে আরো ১০ জন সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। জ্বরের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্ত করতে গিয়ে সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। ওই রোগীরা বিশেষ টিমের পর্যবেক্ষণে থাকলেও তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি নীতিগত কারণে। যদিও এপ্রিলের পরে গত দুই মাসে সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত আর কোনো রোগী পাওয়া গেছে কি না তা জানা যায়নি। এ ছাড়া ওই সময়ের আইইডিসিআরের রিপোর্টও চূড়ান্ত হয়নি।

আইইডিসিআরের প্রতিবেদন অনুসারে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত ১৯ জনের মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চারজন করে, দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দুজন এবং ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একজন করে ভর্তি ছিল। একই প্রতিষ্ঠানের ন্যাশনাল সার্ভেইল্যান্সের আওতায় আরেক চিত্রে ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ ও নরসিংদীতে আরো একজন করে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চিকুনগুনিয়া আর ডেঙ্গু নিয়ে আমরা বেশি ব্যস্ত থাকায় অন্যদিকে খুব একটা নজর দিতে পারিনি। তবে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক রুটিন হসপিটাল সার্ভেইল্যান্সের আওতায় কয়েকটি জায়গায় সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্তসহ আরো কয়েকটি ইনফ্লুয়েঞ্জার নমুনা মিলেছে। যদিও এ বিষয়ে সব হাসপাতালে সর্তকতামূলক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা আছে। ’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, হসপিটাল সার্ভেইল্যান্স সাধারণত খুবই সীমিত আকারে হয়ে থাকে। তাই সারা দেশে অন্যান্য হাসপাতালে সোয়াইন ফ্লুর কী পরিস্থিতি, তা বোঝা মুশকিল। এমনকি জ্বরের প্রভাব নিয়ে কেউ মারা গেলেও তা অন্য জটিলতায় মৃত্যু হয়েছে বলে সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়ায় প্রকৃত বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। তাই এখন জরুরি হয়ে পড়েছে যেকোনো জটিলতা বা যেকোনো রোগের সঙ্গে জ্বরের উপসর্গ থাকলে তার প্রতি আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

লক্ষণ ও সতর্কতা : স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রোগটিতে সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো লক্ষণ দেখা দিলেও জটিলতার আশঙ্কা বেশি থাকে। তবে সতর্ক থাকলে সোয়াইন ফ্লু এবং এর জটিলতা থেকে বাঁচা সম্ভব। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সর্দি, কাশি, জ্বর, শারীরিক দুর্বলতা, মাথাব্যথা, গলাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দেয়। জ্বর ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা এর চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে। শ্বাসকষ্ট, র‌্যাশ, কাঁপুনি, বমি ভাব ও পাতলা পায়খানাও হতে পারে। সাধারণত এক-দুই সপ্তাহ পর্যন্ত এসব লক্ষণ স্থায়ী হয়। তবে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিসহ যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো বেশি সময় ধরে থাকে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে এ রোগকে আলাদা করা যায়। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী মা, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস, লিভারের অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তিসহ যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের জন্য রোগটি ঝুঁকিপূর্ণ।

যে কারণে গোপন রাখার চেষ্টা : ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার চেয়েও ভয়ানক কিছু ভাইরাস বিভিন্ন সময় নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ২০০৯ সাল থেকেই সোয়াইন ফ্লুর সংক্রমণ ঘটে আসছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান নিজেরা ভেতরে ভেতরে এটি নিয়ে কাজ করলেও মানুষের মধ্যে যাতে আতঙ্ক না ছড়ায়, সে জন্য এগুলো গোপন রাখার চেষ্টা করে থাকে। ফলে এ বছর যে ১৯ জন সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত মানুষ কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে, তা অনেকেরই জানা নেই। এমনকি কোথাও কোথাও আক্রান্ত রোগীকেও জানানো হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ প্রকাশিত মৃত্যুর তথ্য অনুসারে ২০১৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জের শাখা ব্যবস্থাপক মারুফ মঈন জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। সিঙ্গাপুরের ওই হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যু সনদে মারা যাওয়ার কারণ হিসেবে নিউমোনিয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এর আগে সন্দেহজনকভাবে সোয়াইন ফ্লুর পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছিল। মঈনের মৃত্যুর পরদিন পাওয়া রিপোর্টে দেখা যায়, তিনি সোয়াইন ফ্লুতেও আক্রান্ত ছিলেন।

সূত্র মতে, ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লুর ঝুঁকি দেখা দেওয়ায় দেশের ৬৪ জেলা হাসপাতালে সংরক্ষিত ইউনিট খোলা হয়েছিল। কিন্তু পরে এ রোগের প্রকোপ না থাকায় এগুলো অব্যবহৃত হয়ে পড়ে। পরে অন্য রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া যে ওষুধ ছিল তারও বেশির ভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ বলেন, সোয়াইন ফ্লু হচ্ছে মানবদেহের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মতোই এক ধরনের ভাইরাস, যা প্রধানত শূকরের দেহে দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে? শূকরের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য মানবদেহের সঙ্গে বেশ মিল থাকায় এ ভাইরাসটি পাখির চেয়ে বেশি দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে মানুষের দেহে। এটি একটি মহামারি ভাইরাস। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সর্বশেষ এর নাম দিয়েছে পিডিএম০৯। এটি ২০০৯ সাল থেকেই দেশে কম বেশি আছে। এবারও দেশের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে।

দেশে প্রথম সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হয় যুক্তরাষ্ট্র ফেরত ১৭ বছরের এক তরুণ ২০০৯ সালের ১৮ জুন। আর এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যু ঘটে ২০০৯ সালের ৩০ আগস্ট মিতা চক্রবর্তী নামের এক রোগীর ল্যাবএইড হাসপাতালে।

 

বি.বা/ডেস্ক/ক্যানি

Categories: সারাদেশ,স্বাস্থ্য

Leave A Reply

Your email address will not be published.