বৃহস্পতিবার ৯ কার্তিক, ১৪২৬ ২৪ অক্টোবর, ২০১৯ বৃহস্পতিবার

আ.লীগ ও জোটের সমীকরণে আসন পুনরুদ্ধারে বিএনপি

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: লক্ষ্মীপুর জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের রাজনীতি এবং অর্থনীতির দিক থেকে বিখ্যাত একটি শহর। লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত লক্ষ্মীপুর-১ আসন। আসনটি এক সময় বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে পুরো রাজনীতি আওয়ামী লীগের দখলে। নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও লক্ষ্মীপুর-১ আসন ছিল বিএনপির দখল। তখন এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন বিএনপি প্রার্থী আলহাজ নাজিম উদ্দিন আহম্মেদ। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দল, হামলা-মামলা সাংগঠনিকভাবে এখন অনেকটাই দুর্বল বিএনপি।

দশম সংসদ নির্বাচনে এখানে এমপি নির্বাচিত হন ১৪ দলের প্রার্থী তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব লায়ন এম এ আউয়াল। তিনি এরই মধ্যে এ উপজেলায় অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকা- পরিচালনা করেছেন। একাদশ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল থেকে মনোনয়ন পাবেন বলে আশাবাদী।

এদিকে সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনী উত্তেজনা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। লক্ষ্মীপুর-১ রামগঞ্জ আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী ছাড়াও জোটের শরিক দলের প্রার্থীদের পদচারণায় নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। মানুষের মুখে ফিরছে নির্বাচন ও আলোচিত প্রার্থীদের নাম। নির্বাচনী মাঠ দখল এবং মনোনয়ন নিশ্চিত করতে এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি কেন্দ্রেও চালাচ্ছেন লবিং। পাশাপাশি ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাধারণ ভোটারদের কাছেও। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।

এদিকে বিএনপি সমর্থিতরা মনে করছেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হলে এ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জয়লাভ করবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা বলছেন, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে নৌকা প্রতীক নিয়ে যেই নির্বাচন করুক ভোটাররা তাকেই জয়ী করবেন।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি থেকে জোটের প্রার্থীসহ দলীয় একাধিক প্রার্থীর নাম শোনা গেলেও মূল আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন কয়েকজন। তারা হলেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দল বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব ও ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিভ অ্যালায়েন্সেস (আইডিএ) মুখপাত্র ও কো-চেয়ারম্যান বর্তমান সংসদ সদস্য লায়ন এম এ আউয়াল। প্রতিদিনের সংবাদকে এম এ আউয়াল বলেন, ‘আমি বিগত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করে এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। জাতীয় রাজনীতির প্রয়োজনে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য আগামী নির্বাচনেও এ আসন থেকে জোটের প্রার্থী হিসেবে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে আশাবাদী।’

তবে ক্ষমতাসীন দলীয় প্রার্থী হিসেবে পুরো উপজেলায় আলোচনায় রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি বিশিষ্ট শিল্পপতি ও আনোয়ার খান মর্ডান মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন খান। তৃণমূল নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ সমর্থন দিচ্ছেন তাকে। আ.লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী আনোয়ার খান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আমাকে মনোনয়ন দিলে বিজয়ী হয়ে মানুষের সেবায় কাজ করব। তাছাড়া দলের দুর্দিনে নেতাকর্মীর পাশে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব। বেশির ভাগ নেতাকর্মীই আমাকেই সমর্থন দিচ্ছেন।’

আলোচনায় আছেন রামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিক মাহমুদ পিন্টু। ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি ১/১১-এর সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা জেলে থাকার সময় আইনি মোকাবিলায় আইনজীবী প্যানেলের সদস্য ছিলেন। এছাড়া পিন্টু সুখে-দুঃখে নেতাদের পাশে ছিলেন সব সময়। প্রতিদিনের সংবাদকে অ্যাডভোকেট পিন্টু বলেন, ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছি। সুখে-দুঃখে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম, আছি এবং থাকব। আমাকে মনোনয়ন দিলে আসনটি আওয়ামী লীগকে উপহার দিতে পারব।’

আ.লীগের আলোচনায় রয়েছেন লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি সফিকুল ইসলাম। দলের দুর্দিনে সফিকুল ইসলাম দলের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এরই মধ্যে তার অবস্থান কেন্দ্রে ও তৃণমূলে শক্ত অবস্থানে রয়েছে বলে সূত্রে জানায়। এছাড়াও আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হচ্ছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ মো. শাহজাহান, কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক এম এ মোমিন পাটোয়ারী, জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দ মোজাম্মেল হক মিলন, জেলা যুবলীগের সাবেক সদস্য মাহবুবুল আলম ।

বিএনপি থেকে আলোচনায় আছেন রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি আলহাজ মো. নাজিম উদ্দিন আহম্মেদ। গত নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবিতেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাবেক এ এমপি নাজিম উদ্দিন জানিয়েছেন, দল এবারও তাকেই মনোনয়ন দেবে। তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে আমি এমপি থাকাকালে এলাকার অনেক উন্নয়ন করেছি। তাছাড়া এ আসনটি মূলত বিএনপির-ই আসন। এখানে ধানের শীষের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।’

এদিকে ঢাকা সিটি ৩৩নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার ও বর্তমান মতিঝিল থানা বিএপির সভাপতি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক হারুন অর রশিদকে এলাকায় অনেকবারই গণসংযোগ করতে দেখা গেছে। তৃণমূলের বেশিরভাগ নেতাকর্মীই সমর্থন দিচ্ছেন। তিনি এরই মধ্যে কয়েকবারই কারাবরণ করায় দলীয় নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জন করেছেন। বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশা করে রশিদ বলেন, ‘বিএনপির দুর্দিনে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম। দলের জন্য ত্যাগ স্বীকারসহ অনেকবারই কারাবরণ করেছি। দল সেই বিবেচনায় আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে আশা করি।’ মনোনয়ন দিলে সব স্তরের নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ করে কাজ করবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এছাড়াও আলোচনায় আছেন, ২০ দলীয় জোটের শরিক দল এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহাদাত হোসেন সেলিম। ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এই নেতাকে কয়েকবারই গণসংযোগ করতে দেখা গিয়েছে। এ সম্পর্কে প্রতিদিনের সংবাদকে সেলিম বলেন, রামগঞ্জ আসনে জোটের পক্ষ থেকে এবার আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি দলমত নির্বিশেষে ভোট পাব। জোটের পক্ষ থেকে এ আসনে আমাকে মনোনয়ন দেওয়ার সবুজ সংকেত দেয়া হয়েছে। তাই আমি এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছি।

বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী বাকিরা হলেন কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আলী, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) সভাপতি অধ্যাপক ড. মামুন হোসেন, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মনির আহম্মেদ, কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা ইমাম হোসেন ও স্থানীয় নেতা আবদুর রহীম (ভিপি)। এদিকে জামায়াত থেকে উপজেলা সেক্রেটারি মাওলানা আমিনুল ইসলামের নামও শোনা যাচ্ছে।

জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির যুব বিষয়ক সম্পাদক ও স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সদস্য সচিব মো. বেলাল হোসেন, ১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী ও বর্তমান রামগঞ্জ উপজেলার সভাপতি আলহাজ সিরাজুল ইসলাম পাটয়ারী। জাপা প্রার্থী সিরাজুল পাটয়ারী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘১৯৯১ সালে দলের দুর্দিনে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছি। গত ৫ বছর থেকে দলকে সুসংগঠিত করতে এলাকায় ব্যাপক কাজ করেছি। সব নেতাকর্মী আমার সঙ্গেই ঐক্যবদ্ধ। আমি আশাবাদী দলের চেয়ারম্যান আমাকেই মনোনয়ন দেবেন।’

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম পীর সাহেব চরমোনাই গত অক্টোবরের শেষের দিকে রামগঞ্জে আয়োজিত সমাবেশে দলের উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি ডা. রফিক উল্লাহকে একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। জানতে চাইলে রফিক উল্লাহ বলেন, ‘উপজেলায় আমাদের অবস্থান শক্ত। দল আমাকে একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। জয়ের ব্যাপারে আমি অনেক আশাবাদী।’ জাসদ থেকে আলোচনায় আছেন, কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক এমপি এম এ গোফরান, কয়েকবারের মনোনীত প্রার্থী রামগঞ্জ উপজেলা সভাপতি ও সাংবাদিক আবু সায়েদ মোহন। সব মিলিয়ে আগামী নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে লড়াই হবে প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের মধ্যে।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: রাজনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.