বৃহস্পতিবার ৩ শ্রাবণ, ১৪২৬ ১৮ জুলাই, ২০১৯ বৃহস্পতিবার

আশার সঞ্চার করেছে সংলাপ

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: অবশেষে শুরু হলো বহুল আলোচিত ও কাঙ্ক্ষিত সংলাপ। গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই সংলাপের মধ্য দিয়ে খুলল নির্বাচনী ইস্যুতে সরকার ও সরকারবিরোধীদের মধ্যে আলোচনার দ্বার। এই আলোচনার মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে আশার সঞ্চার হলো; তেমনি তৈরি হলো নির্বাচনে সবার সমান সুযোগ সৃষ্টির পথ।

সংলাপের মধ্য দিয়ে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মহলের মধ্যে দেখা দেওয়া সংশয়ের যেমন অবসান ঘটবে; তেমনি পারস্পরিক রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি ও বিদ্যমান অবিশ্বাসের বরফ গলবে বলেও মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী আলোচনার দরজা খোলা রাখায় নির্বাচনী নানা সংকট সমাধানের ভবিষ্যৎ পথ আরো বেশি সুগম ও সুযোগ তৈরি হলো বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

এরই অংশ হিসেবে গতকালও প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে বসেন। সেখানেও তিনি গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যাতে জনগণ তাদের নেতৃত্ব খুঁজে নিতে পারে, কীভাবে তা খুঁজে নিতে পারে সেটাই লক্ষ্য।’

বিশেষ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ থেকে সরকারের অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু নির্বাচনের সদিচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার আলোচনা থেকে স্পষ্ট, এবার সব দল নির্বাচনে অংশ নিক, এটা সরকার চায়। বিশেষ করে বিএনপিকে নির্বাচনে চায় সরকার। সরকার চাইছে নির্বাচন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হোক। এ জন্য এই নির্বাচনে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হবে না বলেও আশ্বাস মিলেছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভা-সমাবেশে বাধা না দেওয়া, গণগ্রেফতার বন্ধ করা এবং এখন থেকে আর নতুন মামলা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নির্বাচনে অংশ নিতেও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচনে তিনি কোনো হস্তক্ষেপ করবেন না। এ ছাড়া তিনি বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তালিকাও চেয়েছেন।

অবশ্য সংবিধানের মধ্য থেকেই নির্বাচনে অনুষ্ঠানের যে প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী প্রথম থেকে দিয়ে আসছেন; সংলাপেও তার প্রকাশ ঘটেছে। সংবিধান অক্ষুণœ রাখতে গিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, আলোচনা করে নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী রাজি হননি। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এগুলো সংবিধানসম্মত নয়। আর খালেদা জিয়ার মুক্তি আদালতের ব্যাপার এবং ওই মামলা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়ের করা বলে তিনি উল্লেখ করেন। সংলাপ শুরুর মধ্য দিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিও নতুন মেরূকরণ পেয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা হচ্ছে রাজনীতিতে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভেতর-বাইরে সংলাপ নিয়ে চলছে নানা বিচার-বিশ্লেষণ।

ড. কামাল হোসেন সংলাপ ‘ভালো’ হয়েছে এবং আলোচনা ‘ফলপ্রসূ হবে’ বলেও মন্তব্য করেছেন। এমনকি সংলাপ নিয়ে সন্তুষ্ট ঐক্যফ্রন্টের অন্য শরিকরাও। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাতে অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বার্তা মিলেছে। এখন প্রয়োজন এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। তবে সংলাপ নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল বিএনপি। সংলাপ থেকে বেরুনোর সময় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘সন্তুষ্ট নন’ বলে জানিয়েছেন। এমনকি গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ‘সংলাপে মানুষের মনে যে আশাবাদ জেগে উঠেছিল, সংলাপ শেষে সেই আশার মুকুল ঝরে যেতে শুরু করেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন।

অবশ্য সংলাপের মাধ্যমে যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে গরম ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে তা বিএনপিকে নষ্ট না করার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং দলের অন্যতম মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ। গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, সংবিধানের আলোকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে করণীয় সবকিছু বৃহস্পতিবারের সংলাপে ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং সংলাপের মাধ্যমে দেশে যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, দয়া করে তা কেউ নষ্ট করবেন না।

শুরু হওয়া সংলাপ নিয়ে আশাবাদী দেশের রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সংলাপ শুরুর মধ্য দিয়ে আশার সঞ্চার হয়েছে। গণতান্ত্রিক একটি ধারার বাস্তবায়ন হচ্ছে। এত দিন ধরে ক্ষমতাসীনরা সংলাপে অনীহা প্রকাশ করে এলেও নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ায় নির্বাচন নিয়ে আশার সঞ্চার হয়েছে। নির্বাচন হতে হবে অংশগ্রহণমূলক। সংলাপের মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ স্বচ্ছ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিশ্লেষকরা এ সংলাপের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহ পাবে বলে মনে করছেন। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সংবিধানের বাইরে সবকিছুই মেনে নিয়েছেন। তিনি চান নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হোক। সুতরাং আগামী নির্বাচন অবশ্যই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি নির্বাচনী নানা ইস্যুর সংকট সমাধানে সংলাপ চলমান রাখার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বলেও মনে করেন তারা।

গত বৃহস্পতিবার সংলাপ শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আরো আলোচনার দুয়ার খোলা রয়েছে। আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

সংলাপ ভালো হয়েছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এ ব্যাপারে সংলাপে অংশ নেওয়া দলের নেতারা জানান, অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের নেতারা যে যা বলতে চেয়েছেন, দলের সভাপতি শেখ হাসিনা মনোযোগ দিয়ে সবার বক্তব্য শুনেছেন। সংবিধানের বাইরের সব দাবি তিনি মেনে নিয়েছেন। পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু কিছু দাবি ছিল যেগুলো সংবিধানসম্মত নয় এবং নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার, সেগুলো মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বক্তব্যে হতাশার সুর থাকলেও বরফ গলতে শুরু করেছে। নির্বাচন নিয়ে ভিন্ন অবস্থান থেকে আলোচনার জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সংলাপের এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এত দিন আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে আসছিলেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। কিন্তু তিনি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত সংলাপে সম্মত হন। এটা অবশ্যই আগামী নির্বাচনের জন্য ইতিবাচক।

সংলাপে অংশ নেওয়া আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের নেতা শ ম রেজাউল করিম বলেন, আলোচনা খুবই ফলপ্রসূ হয়েছে। অন্তত সংবিধানের বাধ্যবাধকতা বুঝতে পেরেছেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। আশা করছি ভবিষ্যতে যারাই সংলাপে আসবেন, তারাও বিষয়টি বুঝবেন।

এই আইনজ্ঞ আরো বলেন, ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি বিচার বিভাগের বিষয়। আদালতের বাইরে এ বিষয়ে তার কিছু করার নেই। ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধানে যা আছে সে অনুযায়ীই নির্বাচন হবে। সংবিধানের বাইরে কোনো কিছুই হবে না।

নির্বাচন পেছানোর কথাও ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলেছিলেন জানিয়ে রেজাউল করিম বলেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচন করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এ ব্যাপারে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। তার সরকারের কিছুই করার নেই। সুতরাং সংবিধানের মধ্যেই আলোচনা হয়েছে। আলোচনা গঠনমূলক হয়েছে।

সংলাপকে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনী সংকট সমাধানের উপযুক্ত মাধ্যম হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, সংলাপ রাজনীতির ইতিবাচক দিক। আলোচনার বাইরে থাকলেও অনেক কিছুই স্পষ্ট হয় না। নানা ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। মনোমালিন্য থাকে। খোলামনে আলোচনা করলে এসব সংকটের সমাধান আসে। তবে সব দলেরই উচিত হবে সংবিধানকে কেন্দ্রে রেখে আলোচনা করা।

‘সংলাপকে অর্থবহ করতে অংশগ্রহণমূলক মতামতের ভিত্তিতে সবাইকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে’—উল্লেখ করে এই বিশ্লেষক বলেন, এই সংলাপ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মহলের মধ্যে নানা কারণে দেখা দেওয়া অবিশ্বাসের বরফ গলার বার্তা দেয়। আলোচনায় বসলে কিছু না কিছু অগ্রগতি আসবেই। আমরা সবাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই। সেই নির্বাচন অনুষ্ঠানে এই সংলাপ সহযোগিতা করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সংলাপের আমন্ত্রণ পেয়েছে জাতীয় পার্টিও। এইচ এম এরশাদ নেতৃত্বাধীন দলটিকে আগামী সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় গণভবনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর সংলাপে অংশ নিতে ২০ সদস্যের প্রতিনিধিদলও ঠিক করেছে জাতীয় পার্টি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপের আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। প্রধানমন্ত্রী তাদেরও ডেকেছেন গণভবনে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গেও সংলাপে বসতে সম্মত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: জাতীয়

Leave A Reply

Your email address will not be published.