বুধবার ২ শ্রাবণ, ১৪২৬ ১৭ জুলাই, ২০১৯ বুধবার

অস্তিত্ব সংকটে খালেদা-তারেক

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: দলীয় গঠনতন্ত্রের একটি ধারা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের আদেশের ফলে একাধিক মামলায় দণ্ডিত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের যথাক্রমে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে থাকার অনিশ্চিতা দেখা দিয়েছে। রিটের এই আদেশের ফলে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের পদে থাকা নিয়ে নিজ দলেই সংকট তৈরির সংকেত পাওয়া যাচ্ছে।

দণ্ডিত বা দুর্নীতিপরায়ণ কোনো ব্যক্তি বিএনপির কোনো পদে থাকতে পারবেন না— এমন বিধান বাতিল করে দলটি যে গঠনতন্ত্রের ৭ ধারা বাদ দিয়ে বিএনপি যে সংশোধনী প্রণয়ন করেছে, তা গ্রহণ না করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

দলটির সংশোধিত গঠনতন্ত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দাখিল করা এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে গত বুধবার হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ অন্তর্বর্তীকালীন এক আদেশ দিয়ে রিটটি ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির আদেশ দেন।

বিএনপির গঠনতন্ত্র সংশোধনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে মোজাম্মেল হোসেন নামে এক ব্যক্তি রিট আবেদন করেন। দণ্ডিত ব্যক্তিদের দলীয় কমিটিতে না রাখার যে বিধান বিএনপির গঠনতন্ত্রে ছিল, সংশোধনীতে তা বাদ দেওয়া কেন বেআইনি হবে না এবং সংবিধানের পরিপন্থি হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন আদালত। এই আদেশের ফলে, বিএনপির চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দলীয় নেতৃত্বে রাখা এবং দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন বিএনপির সংশোধনী গ্রহণ না করলে দলের গঠনতন্ত্র অনুসারে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান বিএনপির নেতৃত্বে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তবে, বিএনপির আইনজীবীরা বলছেন, কে কী বলল, তাতে কিছু আসে-যায় না। এ বিষয়ে আরো অনেক পথ দেখছে দলটি।

এদিকে, সরকারপন্থি আইনজীবীরা বলেছেন, হাইকোর্টের এ নির্দেশ মানতে বাধ্য ইসি। ফলে ইসি বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্র গ্রহণ না করলে বা বাতিল করে দিলে বিএনপির কোনো কমিটিতে দণ্ডিত কোনো ব্যক্তি থাকতে পারবেন না। এ কারণে কারাবন্দি খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলটির কোনো পদে থাকতে পারবেন না বলে অভিমত আইন বিশেষজ্ঞদের।

তারা বলেছেন, হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রয়েছে বিএনপির। বিএনপি যদি আপিল করে এবং আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেন, সে ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের দলের শীর্ষ পদে থাকতে কোনো সমস্যা হবে না। তবে যদি দলটি কোনো স্থগিতাদেশ না পায়, তবে তারা পদে থাকতে পারবেন না।

আইনজ্ঞরা বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের বেশি সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনের অযোগ্য। এ কারণেই দণ্ডিত কোনো ব্যক্তির বিএনপির পদে রাখার উদ্দেশে দলটির গঠনতন্ত্রে সংশোধনী আনা দেশের সংবিধানের পরিপন্থি।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের আগে এ বছরের ২৮ জানুয়ারি সাত ধারা বিলুপ্ত করে বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির কাউন্সিলে এই সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।

উল্লেখ্য, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার যথাক্রমে ১০ ও সাত বছর কারাদণ্ড হয়েছে। অন্যদিকে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও একটি অর্থ পাচার মামলায় তারেক রহমানের যথাক্রমে যাবজ্জীবন ও সাত বছরের কারাদন্ড হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭ নম্বর ধারায় ‘কমিটির সদস্য পদের অযোগ্যতা’ শিরোনামে বলা আছে, ‘নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যেকোনো পর্যায়ের যেকোনো নির্বাহী কমিটির সদস্য পদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী পদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ তারা হলেন- (ক) ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ৮-এর বলে দন্ডিত ব্যক্তি। (খ) দেউলিয়া, (গ) উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি, (ঘ) সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি।

খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার রায় ঘোষণার ১০ দিন আগে ৭ নম্বর ধারা বাদ দিয়ে বিএনপি সংশোধিত দলীয় গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়।

রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, খালেদা জিয়া ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ দুর্নীতি মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি দ-প্রাপ্ত হন। ওই রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে দন্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া হাইকোর্টে আপিল করেন, যেটি আংশিক শ্রুত অবস্থায় রয়েছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও দুর্নীতির মামলায় ১০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। এ ছাড়া ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। পলাতক থাকায় ওইসব দণ্ডের বিরুদ্ধে এখনো কোনো আপিল করেননি।

এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশটি যথাযথ হয়েছে বলে মনে করি। কারণ আমাদের সংবিধানের ৬৬ (২) ঘ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত কারণে যদি কারো দুই বছরের বেশি সাজা হয়, তাহলে সাজা ভোগ করার পর আরো পাঁচ বছর তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।’

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘দন্ডিত কেউ দলের পদে থাকতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। দুনিয়ার সব রাজনৈতিক দলের এটাই নৈতিক মানদণ্ড। বিএনপির গঠনতন্ত্রে সেটাই তো ছিল। এখন এটা যদি পরিবর্তন করা হয়, দণ্ডিত বা সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে রাখতে রাজনৈতিক দলের পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া খুবই অনভিপ্রেত।’

নির্বাচনী আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের পদে নায়ক বা জেলে বা কৃষককে নেবে কি না— সেটা সেই দলের গঠনতন্ত্রের ব্যাপার। এ রকম রাজনৈতিক বিষয় আদালতে টেনে আনা উচিত নয়।’ তবে, তিনি বলেন, ‘দেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু কোনো রাজনৈতিক দলে থাকতে পারে না। রাখাটাও উচিত নয়।’

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের আইন শাখা হাইকোর্টের নির্দেশের বিষয়টি সম্পর্কে করণীয় নির্ধারণের জন্য ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।’

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: রাজনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.